যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন দগ্ধরা বাঁচানোর আকুতি স্বজনের

  শিপন হাবীব ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দগ্ধ

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ৯ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। এদের দু’জন অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছেন আইসিইউর বিছানায়। বাকিরা কাতরাচ্ছেন অসহনীয় যন্ত্রণায়।

আর স্বজনরা চিকিৎসকদের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন প্রিয়জনকে বাঁচিয়ে তোলার। আল্লাহর কাছে আরজি জানাচ্ছেন প্রয়োজনে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও প্রিয় মানুষকে ফিরিয়ে দেয়ার।

বুধবার রাত থেকেই বার্ন ইউনিটে দগ্ধ ব্যক্তিদের স্বজনরা ভিড় করতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভিড় আরও বাড়ে- যারা প্রিয় মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছেন, এক নজর দেখার জন্য ছোটাছুটি করেছেন, ছুটেছেন চিকিৎসকদের কাছে। বারান্দায় আকুল হয়েছেন কেঁদেছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, দগ্ধদের কেউই শঙ্কামুক্ত নয়। তবে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বার্ন ইউনিটের দ্বিতীয়তলায় যুবক হৃদয় একবার আইসিইউতে আরেকবার চিকিৎসকদের কাছে দৌড়াচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘স্যার আফনেরা আমার বাবারে বাঁচান। আমার বাবা বাঁচব কিনা?’ কাঁদতে কাঁদতে বারান্দায় শুয়ে পড়েন তিনি। সেই অবস্থায় যুগান্তরকে জানান, তার বাবা আনোয়ার হোসেন, বয়স ৫৫ বছর। পুরান ঢাকায় রিকশা চালান। বেঁচে থাকার জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত রিকশা চালান তিনি। ওই এলাকা হয়ে রিকশা নিয়ে কামরাঙ্গীরচর যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণে দগ্ধ হন তিনি। হৃদয় জানান, তিনি দিনমজুর। বাবা-ছেলে মিলে সংসার চালান। অসুস্থ মা হাজেরা বেগম, দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে কামরাঙ্গীরচরের একটি বস্তিতে থাকেন তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, আনোয়ার হোসেনের শরীরের ৬৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি শঙ্কামুক্ত নন। তার শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এমন দগ্ধ ব্যক্তিদের দিন যত যায়, ততই অবস্থার অবনতি হয়।

মোজাফফর হোসেন (৩৩), রেজাউল (২১) ও সোহাগ (২৫) আগুন লাগা ভবনের দ্বিতীয়তলায় একটি কসমেটিক গুদামে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্বিতীয়তলা থেকে রেজাউল ও মোজাফফর নামতে পারলেও নিচতলায় বের হওয়ার লোহার গেটে তালা থাকায় শেষপর্যন্ত তারা বের হতে পারেননি। সোহাগ দ্বিতীয়তলায় আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তাদের উদ্ধার করে।

সোহাগের শরীরের ৭৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। উদ্ধারের পর থেকেই অজ্ঞান তিনি। বুধবার রাতেই আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। বৃহস্পতিবার সকালে তার মা বেদেনা বেগমের সঙ্গে কথা হয় যুগান্তরের। তিনি বলেন, ‘সোহাগই আমার জীবন। ওর রোজগারেই বেঁচে আছি। ওর বাবা আবু তাহের অসুস্থ। ছেলের কিছু হয়ে গেলে আমরা বাঁচব না।’ কথা বলার ফাঁকে দু’হাত তুলে তিনি আরজি জানাচ্ছিলেন আল্লাহর কাছে। বলছিলেন- ‘আল্লাহ, তুমি আমার ছেলেরে সজাক (জ্ঞান) করে দাও। আমি কথা কমু, আমার ছেলেরে বাঁচাও।’ এই মায়ের আর্তনাদে সেখানে থাকা চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বজনদের চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ছিল পানি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রেজাউলকেও নেয়া হয় আইসিইউতে। দগ্ধ ছেলের পাশে কাঁদছিলেন বৃদ্ধা মা হোসেনে আরা বেগম। পাশে কেঁদেই যাচ্ছিল ভাই রাসেল। ৭ হাজার টাকা বেতনে রেজাউল চাকরি করেন। ১৫শ’ টাকা ভাড়ায় মা আর ভাইকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে এক বস্তিতে থাকেন। রেজাউলের ৬২ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। পুড়ে গেছে শ্বাসনালীও। বাবা বিল্লাল হোসেন প্রতিবন্ধী। রেজাউল না বাঁচলে সংসার কে চালাবে- উৎকণ্ঠায় কেঁদে আকুল মা হোসনে আরা বেগম।

মোজাফফর হোসেনের শ্বাসনালীসহ শরীরের ৫৩ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। আইসিইউতে বেড স্বল্পতা থাকায় এইচডিইউতে তার চিকিৎসা চলছে। মা রোকসানা বেগম ছেলের মাথায় মুখ লাগিয়ে দোয়া পড়ছিলেন। ক্ষণে ক্ষণে প্রার্থনা করছিলেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। তার বাবা ওয়ারেছ আলী ১৭ বছর আগে মারা গেছেন। মা ও স্ত্রীকে নিয়ে লালবাগ এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকেন মোজাফফর।

জাকির হোসেনের পাশে বসে থেমে থেমে কাঁদছিলেন স্ত্রী খাদেজা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী বাবুবাজার এলাকায় দোকানে কাজ করেন। পুরো মুখসহ শরীরের ৪৯ শতাংশ পুড়ে গেছে তার। জাকির হোসেন জানান, তিনি রিকশায় বাসায় যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারান। বৃহস্পতিবার সকালে তার জ্ঞান ফিরে।

সেলিম মিয়া আয়নার দোকানে কাজ করেন। হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। বিস্ফোরণে দগ্ধ হন। তার স্ত্রী আঁখি আক্তার জানান, ডাক্তার বলেছেন, তার শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। পুড়ে গেছে চোখের অংশও। হাতে তসবিহ নিয়ে ছেলের পাশে প্রার্থনা করছিলেন মা তাসলিমা বেগম। তিনি জানালেন, সেলিম এখন তার একমাত্র ছেলে। ৫ মাস আগে বড় ছেলে সিদ্দিকুর রহমান মারা গেছে। তাদের বাবা মারা গেছে প্রায় ১৫ বছর আগে। নিজের হায়াত নিয়েও যেন ছেলের জীবন বাঁচিয়ে দেন আল্লাহ- এমনটা প্রার্থনা করছেন অসহায় এই মা।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী হাজী মো. সালাহ উদ্দিন। তিনিও বিস্ফোরণে দগ্ধ হন। স্ত্রী সুবর্ণা আক্তার জানান, স্বামীর কিছু হয়ে গেলে দুই শিশুসন্তান নিয়ে কী করে বাঁচবেন। বিস্ফোরণে দগ্ধ হন শেখ মাহমুদ নামের আরেক ব্যবসায়ীও। চকবাজার এলাকায় পলিথিন ব্যবসা করতেন তিনি। স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, তার স্বামী হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলেন।

হেলাল শিকদারের মাথায় মারাত্মক জখম। তার একমাত্র ছোট ভাই রাশেদুল কান্না করছিলেন। তিনি জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাপুর এলাকায়। বাবা খলিল শিকদার মারা গেছেন। মা পিয়ারা বেগম অসুস্থ। দুই ভাই অনার্স পাস। এক মাস আগে চাকরির সন্ধানে দু’জন ঢাকায় আসেন। চাকরি না পেয়ে চকবাজার এলাকায় দুই ভাই একটি প্লাস্টিক কারখানায় চাকরি নেন। বিস্ফোরণের সময় হেলাল একটি ট্রলিতে প্লাস্টিকের দানা দিতে আসছিলেন অন্য একটি দোকানে।

রাশেদ জানান, না খেয়ে দিন যাচ্ছিল তাদের। মালিক বলেছেন মাস শেষে তাদের বেতন ধরবে। কত বেতন তাও বলা হয়নি। উৎকণ্ঠা নিয়েই বললেন, তার ভাইকে যেন বাঁচিয়ে তোলা হয়। তিনবার লাইনে দাঁড়িয়েও তার পুলিশের চাকরি হয়নি। তার যেন একটা চাকরির ব্যবস্থা করা হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×