আধিপত্য বিস্তারই মূল কারণ

২ নেতার বিরোধে রক্তাক্ত রূপগঞ্জ

  রাজু আহমেদ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুই নেতার আধিপত্য বিস্তারের ‘দ্বন্দ্বে’ রক্তাক্ত শিল্প মালিক ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপিকে ঠেকাতে গিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এ দুই নেতার কর্মী-সমর্থকরা, যাতে গুলিতে প্রাণ গেছে একজনের। গত বছরের ২৯ অক্টোবর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে মারা যান উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক। এর বাইরে গত এক বছরে দুই নেতার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-১ তথা রূপগঞ্জ আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক ও রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মধ্যে বিরোধের নেপথ্যে শুধুই আধিপত্য বিস্তার। আর এর জেরেই ঘটছে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানি।

২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদ আলী মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। বরং রংধনু গ্র“পের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দিয়েছিলেন গোলাম দস্তগীর এমপি। রফিকুল ইসলাম কখনও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। স্থানীয়রা জানান, রফিকুল ইসলাম ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কর্মসূচিতে পৃথকভাবে একাধিক শোডাউন করেন। এ নিয়ে দস্তগীর গাজীর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে ১৪নং ওয়ার্ডে মেম্বার পদে প্রার্থী হন রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই মিজানুর রহমান। অন্যদিকে এ পদে এমপি দস্তগীর গাজী সমর্থন দেন কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদ আলীকে। কিন্তু নির্বাচনে রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই জয়ী হলে দু’জনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এরপরই পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। এমপিবিরোধী নেতাকর্মীদের বেশিরভাগ ভিড়তে থাকেন ইউপি চেয়ারম্যান রফিকের বলয়ে।

২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি রূপগঞ্জের পূর্বাচলের ১ নম্বর সেক্টরের ভোলানাথপুরে একটি মার্কেটের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এমপি গাজীর সমর্থক ও কায়েতপাড়ার চেয়ারম্যান রফিক সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওইদিন রফিকের সমর্থকরা এমপি গাজীর সমর্থক মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের বেধড়ক মারধর করে। ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চরচনপাড়া ও পূর্বগ্রামে সিটি গ্র“পের প্রজেক্ট এলাকায় বালুভরাট ও সরকারি অধিভুক্ত জমি দখল করে সীমানা নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। পরদিন ১৮ জানুয়ারি রূপগঞ্জে কৃষকদের ফসলি জমি, বসতভিটা ও সরকারি রাস্তা দখল এবং সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে এমপি গাজীর সমর্থকরা। যার নেতৃত্ব দেন কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদ আলী। ১৯ জানুয়ারি রূপগঞ্জে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন এমপি দস্তগীর গাজী। এছাড়া গত বছরের ২৯ অক্টোবর রাতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চনপাড়ায় দুই গ্র“পের সংঘর্ষে রূপগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য এমএ হাসান ওরফে হাসান মুহুরি মারা যান।

সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপির নাশকতা ঠেকাতে দুই গ্র“প একই স্থানে অবস্থান নেয় এবং একাপর্যায়ে দুই গ্র“পের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৬০০ রাউন্ড গুলি ও অর্ধশত রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, রফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের কেউ নন, তার দলে সদস্যপদও নেই। ভালো মানুষ ভেবে নৌকা দিয়েছিলাম। কিন্তু নৌকা পেয়ে সে উল্টে গেছে। তিনি রফিকুল ইসলামকে ভূমিদস্যু দাবি করে বলেন, রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের শত শত বিঘা জমি সে মামলা-হামলা করে দখল করছে। হাজার মানুষ তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু টাকার জোরে সে পার পেয়ে যাচ্ছে। গাজী এমপি বলেন, সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে, সব ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন আমার সঙ্গে আছে। ৮ ফেব্রুয়ারি সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রফিক চেয়ারম্যানের ৮ জন গানম্যান সেখানে উপস্থিত ছিল। পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের পর আমার কর্মী সুমনকে কাছ থেকে গানম্যানের বন্দুক দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, এমপি গাজীর সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। কিন্তু উনি এলাকায় থাকলে বিএনপির প্রয়োজন হয় না। কারণ উনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ২৫শ’ মামলা দিয়েছেন। আমরা রূপগঞ্জের উপজেলা ও সব ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা এক হয়েছি এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে। উনার সঙ্গে স্ত্রী, ছেলে আর গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ছাড়া কেউই নেই।

এমন অবস্থায় রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এখনই না থামালে এমপি গাজী ও রফিক চেয়ারম্যানের এই বিরোধের কারণে রক্তাক্ত রূপগঞ্জে আরও সহিংস ঘটনা ঘটবে, আরও প্রাণ যাবে।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.