রাতের আতঙ্ক বাইক ও কার পার্টি

পেশাদার অপরাধীর পাশাপাশি ধনীর মদ্যপ দুলালদের উৎপাত

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাইক

রাতের ঢাকার আতঙ্ক বাইক ও কার পার্টি। রাত যত গভীর হয় রাজপথে এদের উৎপাত ততই বাড়ে। এরা দুই ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপ বিভিন্ন সড়কে বিলাসবহুল গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এরা ধনীর মদ্যপ দুলাল। এরা রাস্তায় ঘটায় দুর্ঘটনাসহ নানা অঘটন। আরেক গ্রুপ পেশাদার অপরাধী।

এরা মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার নিয়ে ছিনতাইয়ে নামে। কোলাহলমুক্ত মধ্যরাত ও ভোরকে ভয়ঙ্কর করে তুলছে এ দুই গ্রুপ। তারা পিচঢালা পথকে করে তুলছে রক্তাক্ত। যেন রাস্তা থেকে বাসায় নির্বিঘ্নে ফেরার নিশ্চয়তা নেই কারও।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ধনীর মদ্যপ দুলালদের সঙ্গে থাকে দামি প্রাইভেটকার। নিজেরাই স্টিয়ারিং ধরেন। মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান তারা। কখনও কখনও বন্ধুরা মিলে ভয়ঙ্কর রেসিং প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। মাদকাসক্ত এসব কিশোর-তরুণদের বেপরোয়া গাড়ি চালনার ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা, অকালে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।

রাজধানীর ধানমণ্ডি, উত্তরা, গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলে এমন মরণখেলা। তাদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন পথচারী এবং রিকশা ও সিএনজি অটোসহ নগর পরিবহনের চালকরা।

জানা গেছে, রাতের রাজধানীতে মাতাল হয়ে যারা গাড়ি চালান তারা প্রভাবশালী পরিবারের কিশোর-তরুণ। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় পুলিশকেও। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এদের দেখেও না দেখার ভান করেন।

২ ফেব্রুয়ারি রাতে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর সড়কের হোয়াইট হল কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এর সামনের রাস্তায় উল্টোপথে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে কয়েকজন পথচারীকে আহত করেন এক মদ্যপ ধনীর দুলাল।

উপস্থিত জনতা গাড়ি আটকে প্রতিবাদ করলে নাজমুল হুদা নামের ওই ধনীর দুলালের কয়েকজন বন্ধু গাড়ি থেকে নেমে একজনকে মারধর করেন। এর জের ধরে নাজমুল দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে উপস্থিত লোকজনের ওপর তুলে দেন তার বিএমডব্লিউ গাড়ি। এতে ইতালি প্রবাসী আবদুল মোত্তালেব নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন।

এর আগে গত বছরের ২০ এপ্রিল রাতে ধানমণ্ডি ৭ নম্বর রোডে শিল্পপতি আবুল হাসনাতের ছেলে সাদ্দাম শাহনেওয়াজ মদ্যপ হয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে চাপা দেন রিকশাচালক রজব আলীকে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান রজব আলী। একই বছরের ৯ জানুয়ারি মধ্যরাতে পান্থপথে বসুন্ধরা সিটির সামনে অভিনেতা কল্যাণ কোরাইয়ার কারচাপায় গুরুতর আহত হন প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক জিয়া ইসলাম। কল্যাণ কোরাইয়া মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন এমন প্রমাণ পায় পুলিশ।

২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর রাত ২টায় হাইকোর্ট সংলগ্ন এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে ওঠে প্রাণ কেড়ে নেয় সেখানে ঘুমন্ত হাসিনা ও শাহেরা নামে দুই ছিন্নমূল নারীর। গাড়ি থেকে শাওন নামের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে আটক করে পুলিশ। গাড়ি যে চালাচ্ছিল সে পালিয়ে যায়। এর আগে ২০১৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভোরে শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে হাজী আশরাফ আলী মার্কেটের সামনে প্রাইভেট কারচাপায় নিহত হন বৃদ্ধ দম্পতি আতাউর রহমান ও তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম। ওই গাড়ি থেকে মদের বোতলসহ কিছু আলামতও জব্দ করে পুলিশ। এরপরও গাড়িচালক ও মালিককে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়নিÑ এমনটাই দাবি করছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।

ধনির মদ্যপ দুলাল ছাড়াও রাতের রাজধানীতে সক্রিয় একটি পেশাদার অপরাধী চক্র। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে চড়ে বেড়ায় ছিনতাইকারীরা। ওরা ছোঁ মেরে সাধারণ মানুষের জিনিসপত্র নিয়ে কেটে পড়ে। কোথাও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনিয়ে নেয় জিনিসপত্র। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রাত ও ভোরে ঢিলেঢালা নিরাপত্তার সুযোগে রাজধানী দাপিয়ে বেড়ায় এসব অপরাধীরা। জানুয়ারি মাসে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ গেছে দু’জনের।

এছাড়া গত বছর ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫ জন। তাদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নারী, শিশু ও ছাত্র রয়েছেন। ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার ভোরে গেণ্ডারিয়া থানা এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন খুলনার ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুর রহমান ইব্রাহিম। একই দিন ভোরে ধানমণ্ডিতে টানাহেঁচড়ায় ছিনতাইকারীদের গাড়িচাপায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন হেলেনা বেগম নামে এক নারী।

এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ভোরে দয়াগঞ্জে রেলব্রিজের ঢালে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ হারায় এক শিশু। ৫ ডিসেম্বর ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা যান জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ফরহাদ আলম। এছাড়া ৮ অক্টোবর ভোরে ওয়ারীর কেএম দাস লেনে ছিনতাইকারীরা কুপিয়ে হত্যা করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার আবু তালহাকে। ২১ জুন ভোরে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন এএসপি মিজানুর রহমান তালুকদার।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, রাতের রাজধানীতে টহল পুলিশের পাশাপাশি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। টানাপার্টি বা ছিনতাইকারী যেসব এলাকায় বেশি সক্রিয় সেসব স্পটে অভিযান চলছে।

মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত কঠোর। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়।

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, র‌্যাব বড় বড় ছিনতাই চক্রের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালায়। সীমিত জনবলের কারণে টানাপার্টি কিংবা ছিঁচকে ছিনতাইকারী ধরতে সেভাবে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে রাতে ও ভোরে। এ সময়টাতে একটু সতর্ক অবস্থায় চলাফেরা করা উচিত।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.