ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধার করলেও মামলা নিচ্ছে না পুলিশ

পাকুন্দিয়া থানার ওসি বললেন সব অভিযোগে মামলা হয় না

  সিরাজুল ইসলাম ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা ছিনতাই হয় ৭ জানুয়ারি। ওই টাকা উদ্ধার হয় ২০ জানুয়ারি। ভুক্তভোগীকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা পুলিশ ২৭ জানুয়ারি ফেরত দেয়। কিন্তু অভিযোগ দেয়ার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানা পুলিশের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন নিকলী থানার ষাইটধার গ্রামের দ্বীন ইসলাম। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি। দ্বীন ইসলাম যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলেন তারা ভালো মানুষ। এজাহারভুক্ত একজনের আত্মীয় কয়েকজনের সহায়তায় জোরপূর্বক দ্বীন ইসলামের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়। পরে এজাহারভুক্তদের সহায়তায় ওই টাকা উদ্ধার করে ভিকটিমকে ফেতর দেয়া হয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে মামলা রেকর্ড করা হয়নি।

ভুক্তভোগী দ্বীন ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমার একমাত্র মেয়ের জামাই মোস্তফা কামাল লেবাননে থাকেন। সেখান থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য বিমান ভাড়া বাবদ আমার কাছে কিছু টাকা চায়। আমি ওই টাকা সংগ্রহ করে ঢাকায় গিয়ে তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিষয়টি ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা জানতে পারে। তাদের একজন (তার নাম সম্ভবত সালাম) আমাকে টেলিফোনে জানায়, তার (ছিনতাই চক্রের হোতা) এক ভাই লেবানন থেকে ইতালি যাচ্ছেন। ভাইয়ের জন্য তিনিও টাকা পাঠাবেন। তাই তিনি আমাকে তার সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। সরল বিশ্বাসে আমি তার প্রস্তাবে রাজি হই। কারণ সে যে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য তা আমার জানা ছিল না।

অভিযোগে দ্বীন ইসলাম বলেন, ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য পাকুন্দিয়া সদরের থানারঘাট গ্রামের তোতা মিয়া তার সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার জন্য আমাকে কিশোরগঞ্জের নিকলী থেকে পাকুন্দিয়ায় যেতে বলেন। আমি টাকার ব্যাগ নিয়ে ৭ জানুয়ারি সকালে সিএনজিযোগে পাকুন্দিয়ার থানারঘাট নামক স্থানে পৌঁছলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তোতা মিয়া, তার সহযোগী তাইজু, রইস উদ্দিন, শওকত এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আমাকে অস্ত্রের মুখে টাকার ব্যাগটি ছিনিয়ে নেয়। ব্যাগে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ছিল। এর মধ্যে এক হাজার টাকার ৩০০টি এবং ৫০০ টাকার ১২০টি নোট ছিল। পরে আমার চিৎকারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য কাশেম মেম্বারসহ অন্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাদের সহযোগিতায় ওইদিনই আমি বাড়ি (নিকলি) ফিরে আসি। বিষয়টি নিকলি উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক এবং নিকলি সদর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আল মামুনসহ অন্যদের জানাই।

দ্বীন ইসলাম বলেন, ৯ জানুয়ারি থানায় গিয়ে চারজনের (তোতা মিয়া তাইজু, রইস উদ্দিন ও শওকত) নাম উল্লেখ করে এবং কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি এজাহার দায়ের করি। এরপর অভিযান চালিয়ে পাকুন্দিয়া থানা পুলিশ ওইদিনই এজাহারভুক্ত আসামি তাইজু এবং শওকতকে গ্রেফতার করে। কিন্তু এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড না করে আসামিদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালায় পুলিশ। এক পর্যায়ে নিকলী থানার ওসি মফিজুর রহমান আমাকে জানান, ছিনতাই হওয়া টাকা আসামিদের কাছ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ২০ জানুয়ারি আপনি থানায় এসে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবেন। ২০ জানুয়ারি থানায় গিয়ে দেখি আসামিরা ওসির কক্ষে। আসামিরা ওসির হাতে ছিনতাই করা টাকা হস্তান্তর করে। কিন্তু ওইদিন ওসি আমাকে কোনো টাকা না দিয়ে বলেন, দুই-একদিন পরে আসেন। এভাবে এক সপ্তাহ ঘোরানোর পর ২৭ জানুয়ারি ওসি আমাকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। এখন তিনি মামলা রেকর্ড করছেন না।

নিকলী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, দ্বীন ইসলামের কোনো পুত্রসন্তান নেই। একমাত্র মেয়ের জামাইয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে বাড়ি বিক্রি করে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করেছিলেন। অভিনব কৌশলে পাকুন্দিয়ায় ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা ওই টাকা ছিনতাই করে। চক্রের মূল হোতা সালামের বাড়ি গফরগাঁওয়ে। অজ্ঞাত কারণে পুলিশ ওই নামটি প্রকাশ করছে না।

নিকলী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আল মামুন জানান, থানায় অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে পুলিশ বিষয়টি বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে ওসি বলেন, অভিযোগ রেখে যান। অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি এএসআই আনোয়ারুল হককে তদন্তের দায়িত্ব দেন। এএসআই আনোয়ারুল হক আমাদেরকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিশেষ কৌশলে পুলিশ তাইজু এবং শওকতকে আটক করে। আটককৃতরা ছিনতাইকারীদের মূল হোতার নাম পুলিশকে জানায়। এরপরই পুলিশ সমঝোতার প্রস্তাব দেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাকুন্দিয়া থানার ওসি মফিজুর রহমান এজাহারভুক্তদের বরাত দিয়ে যুগান্তরকে বলেন, তোতা মিয়ার এক আত্মীয়ের ভাই দ্বীন ইসলামের মেয়ের জামাইয়ের কাছে টাকা কিছু টাকা পাবে। ওই টাকা আদায়ের জন্য কৌশলে দ্বীন ইসলামকে পাকুন্দিয়ায় আনা হয়। পরে জোর করে দ্বীন ইসলামের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। এজাহারভুক্তদের মধ্য থেকে দু’জনকে থানায় হাজির করা হলে তারা দ্বীন ইসলামের মেয়ের জামাইয়ের কাছে টাকা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তাদের সহযোগিতায় টাকা উদ্ধার করে দ্বীন ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাদেরকে থানায় আনা হয়েছে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়নি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, টাকা উদ্ধারে তারা পুলিশকে সহযোগিতা করেছে। তাছাড়া টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের খুব-একটি ভূমিকা ছিল না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় কেন মামলা নেয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে অনেক অভিযোগ আসে। সব অভিযোগে মামলা নেয়া হয় না।’

তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই অনোয়ারুল হক বলেন, এজাহারে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের কথা বলা হলেও তদন্তে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের সত্যতা পাওয়া গেছে। শতভাগ টাকা রিকভার করে ভিকটিমকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। মামলা নেয়া বা না নেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত