হঠাৎ অস্থির মিয়ানমারের রাজনীতি

অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

  শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি ২৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

হঠাৎ করে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন এনএলডির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অপসারণ, পদত্যাগে বাধ্য করাসহ নানা কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এ নিয়ে এনএলডি=র উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছে। এসব কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

বৃহস্পতিবার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমারে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে করে রোহিঙ্গারা জেনে দেশটিতে ফেরত যেতে না চায়।

১৯৯১ সালে মিয়ানমারের মংডু থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন জাফর আলম (৫০)। মংডু থাকাকালে তিনি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। অল্প শিক্ষিত এ রোহিঙ্গা নেতা কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়ে অনুমোদিত ফার্মেসিতে ছোটখাটো চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রোহিঙ্গা নেতা জাফর আলমের সঙ্গে সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ হয়। তিনি জানান, মিয়ানমার সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের কোনোদিন মেনে নেবে না। রোহিঙ্গাদের পক্ষে যারা কথা বলছেন তাদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ২১ মার্চ মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট টিন চ’র পদত্যাগ, একইদিনে সংসদের স্পিকার উ উইন মিন্তের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কারণ রোহিঙ্গা ইস্যু।’

রোহিঙ্গা নেতা ডা. ফয়সাল আনোয়ার (৪৯) একজন চিকিৎসক। তিনিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের পক্ষে সামান্যতম কথা বলার লোক রয়েছেন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিতে (এনএলডি)। এই দলটির কিছু নেতা আছেন তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সোচ্চার। সংসদে এনএলডির কর্তৃত্ব থাকলেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গিয়ে তারা কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মুখ খুলছেন তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এ নিয়ে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। যে কোনো সময়ে সেখানে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রায় অনিশ্চিতই বলা চলে।’

কুতুপালংয়ের বনভূমিতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নেতা আবু ছিদ্দিক (৫৫) জানান, রোহিঙ্গারা যেসব গ্রামে বসবাস করত, সে গ্রামগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে রাখাইনদের নিয়ে এসে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। তাই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার ফিরিয়ে নেবে এ কথা বিশ্বাস করা যায় না। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন উগ্রবাদীরা যে হিংসাত্মক আচরণ করছে তা বিশ্বের কোনো দেশে নেই। যে কারণে তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি ফেলে এখানে চলে আসতে হয়েছে। তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে যারা কথা বলছেন, মিয়ানমার সেনারা তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। তাই প্রত্যাবাসন সম্পর্কে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমার প্রথমে বলেছিল, শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে তারা। কিন্তু ওই শূন্যরেখায়ই অতিরিক্ত সেনা সমাবেশ করে সীমান্ত এলাকায় অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার। কিছুদিন আগে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিন থু জানান, ৮০৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাই করেছেন তারা। সেখান থেকে ৩৭৪ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরে নেয়ার কথা বলেন তিনি। কিন্তু কিভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করবেন তা জানাননি।’ তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সামরিক জান্তার একগুঁয়েমি মনোভাব দেখে মনে হয়, রোহিঙ্গাদের তারা ফিরিয়ে নেবে না। গত ২ দিন ধরে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। তাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু নিয়ে। পরিস্থিতি যা তাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো পথ দেখছি না।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter