কিশোরগঞ্জে মৃত্যু যন্ত্রণায় গৃহকর্মী শিশু মণি আক্তার
jugantor
গৃহকর্ত্রীর মধ্যযুগীয় নির্যাতন
কিশোরগঞ্জে মৃত্যু যন্ত্রণায় গৃহকর্মী শিশু মণি আক্তার

  কিশোরগঞ্জ ব্যুরো  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার উত্তরায় গৃহকর্ত্রীর মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ১২ বছরের শিশু গৃহকর্মী মণি আক্তার এখন হাসপাতাল শয্যায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শরীরজুড়ে উত্তপ্ত খুন্তির ছ্যাঁকা, লাঠির আঘাত আর মাথায় বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে চুল পুড়িয়ে দেয়ার দগদগে ক্ষত নিয়ে সে এখন পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। ৫ দিন চিকিৎসা চললেও সে এখনও আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। পাকুন্দিয়া থানার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ হাসান ও মণি আক্তারের মা-বাবা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। মণি আক্তারের বাড়ি উপজেলার এগারসিন্ধুর ইউনিয়নের খামা গ্রামে।

সোমবার রাতে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, পুলিশের একটি দল পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মণি আক্তার ও তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে। এ ঘটনায় মণি আক্তারের বাবা আবদুল মোতালিব মামলা করেছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে গৃহকর্ত্রী জবা বেগমকে।

অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে।

জানা গেছে, গ্রামের স্কুলে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর অভাবের তাড়নায় তা বন্ধ হয়ে যায় মণি আক্তারের। অনাহার-অর্ধাহারে বাড়িতে দিন কাটছিল তার। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালো পারিশ্রমিক, খাবার ও পোশাকের লোভ দেখিয়ে পাশের তালদর্শী গ্রামের কাঠুরিয়া ইন্নছ আলীর মেয়ে মরিয়ম বেগম প্রলুব্ধ করে মণি আক্তারকে। একদিন দরিদ্র মা-বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মণি আক্তারকে রাজধানীর উত্তরা ১১নং সেক্টরের ১৯নং রোডের (আজমপুর) বাসিন্দা জবা বেগমের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ দেয়। কাজে যোগদানের পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে এ বিভীষিকাময় নিষ্ঠুর অধ্যায়। কারণে-অকারণে গৃহকর্ত্রী জবা বেগম ও ছেলেমেয়ে মিলে তার হাত-পা, পিঠ, উরু, মাথাসহ শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষিসহ লাঠির আঘাত করে। এমনকি মাথায় বিষাক্ত রাসায়নিক ঢেলে চুল পুড়িয়ে দেয়। যন্ত্রণার আহাজারি আড়াল করতে বাথরুমে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় তাকে। উচ্ছিষ্ট, পচা ও দুর্গন্ধ খাবার জোটে তার ভাগ্যে। এসব কথা কাউকে বললে জানে মেরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা রাখার হুমকিও দেন গৃহকর্ত্রী জবা বেগম।

শিশুকন্যা মণির খবর জানতে ২১ সেপ্টেম্বর তার মা নীলুফা আক্তার হাজির হন ওই বাসায়। মেয়ের করুণ অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি। এমন নারকীয় পরিস্থিতি ও বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন মেয়েকে। ধূর্ত গৃহকর্ত্রী জবা বেগম এ সময় মেয়ে ও মায়ের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে টিপ-দস্তখত রেখে এবং নির্যাতনের ঘটনা কাউকে না বলার শর্তে মণি আক্তারকে মুক্তি দেন।

হাসপাতালে এ প্রতিবেদকের কাছে মণি আক্তার তার ওপর চলা এসব নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আরও জানায়, ওই বাড়িতে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ছোট ছোট লাল-নীল কী সব ট্যাবলেট নিতে আসেন। জবা বেগমকেও নিয়মিত এসব খেতে দেখেছে সে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন মণি আক্তারের সজল চোখে এখন শুধু বেঁচে থাকার আকুতি। টাকা-পয়সার অভাবে দরিদ্র মা-বাবা তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পেরে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন।

গৃহকর্ত্রীর মধ্যযুগীয় নির্যাতন

কিশোরগঞ্জে মৃত্যু যন্ত্রণায় গৃহকর্মী শিশু মণি আক্তার

 কিশোরগঞ্জ ব্যুরো 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার উত্তরায় গৃহকর্ত্রীর মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ১২ বছরের শিশু গৃহকর্মী মণি আক্তার এখন হাসপাতাল শয্যায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শরীরজুড়ে উত্তপ্ত খুন্তির ছ্যাঁকা, লাঠির আঘাত আর মাথায় বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে চুল পুড়িয়ে দেয়ার দগদগে ক্ষত নিয়ে সে এখন পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। ৫ দিন চিকিৎসা চললেও সে এখনও আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। পাকুন্দিয়া থানার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ হাসান ও মণি আক্তারের মা-বাবা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। মণি আক্তারের বাড়ি উপজেলার এগারসিন্ধুর ইউনিয়নের খামা গ্রামে।

সোমবার রাতে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, পুলিশের একটি দল পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মণি আক্তার ও তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে। এ ঘটনায় মণি আক্তারের বাবা আবদুল মোতালিব মামলা করেছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে গৃহকর্ত্রী জবা বেগমকে।

অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে।

জানা গেছে, গ্রামের স্কুলে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর অভাবের তাড়নায় তা বন্ধ হয়ে যায় মণি আক্তারের। অনাহার-অর্ধাহারে বাড়িতে দিন কাটছিল তার। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালো পারিশ্রমিক, খাবার ও পোশাকের লোভ দেখিয়ে পাশের তালদর্শী গ্রামের কাঠুরিয়া ইন্নছ আলীর মেয়ে মরিয়ম বেগম প্রলুব্ধ করে মণি আক্তারকে। একদিন দরিদ্র মা-বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মণি আক্তারকে রাজধানীর উত্তরা ১১নং সেক্টরের ১৯নং রোডের (আজমপুর) বাসিন্দা জবা বেগমের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ দেয়। কাজে যোগদানের পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে এ বিভীষিকাময় নিষ্ঠুর অধ্যায়। কারণে-অকারণে গৃহকর্ত্রী জবা বেগম ও ছেলেমেয়ে মিলে তার হাত-পা, পিঠ, উরু, মাথাসহ শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষিসহ লাঠির আঘাত করে। এমনকি মাথায় বিষাক্ত রাসায়নিক ঢেলে চুল পুড়িয়ে দেয়। যন্ত্রণার আহাজারি আড়াল করতে বাথরুমে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় তাকে। উচ্ছিষ্ট, পচা ও দুর্গন্ধ খাবার জোটে তার ভাগ্যে। এসব কথা কাউকে বললে জানে মেরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা রাখার হুমকিও দেন গৃহকর্ত্রী জবা বেগম।

শিশুকন্যা মণির খবর জানতে ২১ সেপ্টেম্বর তার মা নীলুফা আক্তার হাজির হন ওই বাসায়। মেয়ের করুণ অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি। এমন নারকীয় পরিস্থিতি ও বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন মেয়েকে। ধূর্ত গৃহকর্ত্রী জবা বেগম এ সময় মেয়ে ও মায়ের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে টিপ-দস্তখত রেখে এবং নির্যাতনের ঘটনা কাউকে না বলার শর্তে মণি আক্তারকে মুক্তি দেন।

হাসপাতালে এ প্রতিবেদকের কাছে মণি আক্তার তার ওপর চলা এসব নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আরও জানায়, ওই বাড়িতে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ছোট ছোট লাল-নীল কী সব ট্যাবলেট নিতে আসেন। জবা বেগমকেও নিয়মিত এসব খেতে দেখেছে সে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন মণি আক্তারের সজল চোখে এখন শুধু বেঁচে থাকার আকুতি। টাকা-পয়সার অভাবে দরিদ্র মা-বাবা তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পেরে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন।