আরও ৩০ দালালের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
jugantor
চট্টগ্রামে পাসপোর্ট প্রতারণা
আরও ৩০ দালালের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
১১ জনের রিমান্ড শুনানি কাল

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম  

১২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে পাসপোর্ট অফিসের আরও ৩০ দালালের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। এর আগে বুধবার পাঁচলাইশ আঞ্চলিক অফিসের সামনে থেকে ১১ দালালকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের রিমান্ড শুনানি রোববার অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা তাদের সহযোগী দালালদের সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল কবির যুগান্তরকে বলেন, বুধবার দুপুরে পাঁচলাইশ আঞ্চলিক অফিসের সামনে থেকে ১১ দালালকে গ্রেফতার করা হয়। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তারা আরও কয়েকজন দালালের নাম প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ১১ জনকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করেছি। রোববার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

গ্রেফতার দালালরা জানান, পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় তারা দ্রুত পাসপোর্ট করিয়ে নেন। এছাড়া মাসের পর মাস আটকে থাকা পাসপোর্টও তারা ছাড় করিয়ে আনেন।

কক্সবাজার উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, বুধবার বড়ভাই আলী আকবরকে নিয়ে আমি পাসপোর্ট অফিসের সামনে দাঁড়াই। সেখানে দাঁড়ানো মাত্র ২০-২২ জন আমাদের ঘিরে ধরেন। তারা জানতে চান আমরা কি কারণে এসেছি। বড়ভাইয়ের পাসপোর্ট নবায়নের কথা শুনে তারা ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। বড়ভাইয়ের পকেটে থাকা পাঁচ হাজার টাকা তারা কেড়ে নেন। বিষয়টি আমি পাঁচলাইশ থানার ওসিকে ফোনে অবগত করি। পুলিশ এসে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। বাদী হয়ে ১১ দালালের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেছি। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। জানা গেছে, চট্টগ্রামে দুটি পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। এর মধ্যে ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদে বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এবং নগরীর পাঁচলাইশ থানা সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে মহানগরীর চান্দগাঁও, কর্ণফুলী, কোতোয়ালি, পাঁচলাইশ এবং বাকলিয়া থানা এবং পটিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলার লোকজন পাসপোর্ট পেতে আবেদন করেন। বাকি উপজেলা ও নগরীর বাসিন্দারা আবেদন করেন বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে।

পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন জাতিসংঘ পার্কের উত্তর পাশে বরইতলা টিনশেড কক্ষে রয়েছে আরও একটি ‘ছায়া পাসপোর্ট অফিস!’ এক ছাদের নিচে যেন অনেক দালাল। এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকেলোকারণ্য থাকে। পাসপোর্টের আবেদন লেখা থেকে শুরু করে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া সবই তারা করেন। এখান থেকেই সেবা প্রার্থীরা শুধু আবেদন ফরম নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের নির্ধারিত কক্ষে জমা দিয়ে আসেন। এ জন্য প্রতি পাসপোর্ট বাবদ ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। দালালদের নিয়োগ করা কমিশনভিত্তিক কিছু লোক ঘুর ঘুর করে পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে-বাইরে। যারা অল্প সময়ে পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে আসে বরই তলার কক্ষে। সেখানে ভেরিফিকেশন ছাড়া তাদের মাধ্যমে একটি সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করতে হলে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। আর পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ করতে হলে ৭ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়। জরুরিভিত্তিতে কোনো পাসপোর্ট করতে হলে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পাসপোর্ট হাতে পেয়ে যাবেন আবেদনকারীরা- এমন আশ্বাস দেন তারা।

বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রতি পাসপোর্টে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দালালদের দিতে হয়। তা না হলে পাসপোর্টের আবেদনে নানা ভুল-ভ্রান্তির কথা বলে আবেদন ফিরিয়ে দেন অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আবেদন জমা নিলেও মাসের পর মাস ঘোরাঘুরি করেও পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। এ কারণে সঠিক সময়ে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য দালালের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন লোকজন। দালালদের মাধ্যমে দেওয়া প্রতিটি পাসপোর্টের আবেদন ফরমে বিশেষ চিহ্ন থাকে। এ সম্পর্কে অফিসের কর্মকর্তারা অবগত থাকেন। পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার অভিযান চালায়। এতে বেশ কয়েকজন দালাল আটক হন। এ ঘটনায় কিছুদিন পাসপোর্ট অফিস এলাকা দালালমুক্ত থাকলেও এখন আবারও পুরোনো চেহারায় ফিরে এসেছে।

চট্টগ্রামে পাসপোর্ট প্রতারণা

আরও ৩০ দালালের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

১১ জনের রিমান্ড শুনানি কাল
 নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম 
১২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে পাসপোর্ট অফিসের আরও ৩০ দালালের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। এর আগে বুধবার পাঁচলাইশ আঞ্চলিক অফিসের সামনে থেকে ১১ দালালকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের রিমান্ড শুনানি রোববার অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা তাদের সহযোগী দালালদের সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল কবির যুগান্তরকে বলেন, বুধবার দুপুরে পাঁচলাইশ আঞ্চলিক অফিসের সামনে থেকে ১১ দালালকে গ্রেফতার করা হয়। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তারা আরও কয়েকজন দালালের নাম প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ১১ জনকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করেছি। রোববার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

গ্রেফতার দালালরা জানান, পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় তারা দ্রুত পাসপোর্ট করিয়ে নেন। এছাড়া মাসের পর মাস আটকে থাকা পাসপোর্টও তারা ছাড় করিয়ে আনেন।

কক্সবাজার উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, বুধবার বড়ভাই আলী আকবরকে নিয়ে আমি পাসপোর্ট অফিসের সামনে দাঁড়াই। সেখানে দাঁড়ানো মাত্র ২০-২২ জন আমাদের ঘিরে ধরেন। তারা জানতে চান আমরা কি কারণে এসেছি। বড়ভাইয়ের পাসপোর্ট নবায়নের কথা শুনে তারা ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। বড়ভাইয়ের পকেটে থাকা পাঁচ হাজার টাকা তারা কেড়ে নেন। বিষয়টি আমি পাঁচলাইশ থানার ওসিকে ফোনে অবগত করি। পুলিশ এসে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। বাদী হয়ে ১১ দালালের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেছি। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। জানা গেছে, চট্টগ্রামে দুটি পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। এর মধ্যে ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদে বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এবং নগরীর পাঁচলাইশ থানা সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে মহানগরীর চান্দগাঁও, কর্ণফুলী, কোতোয়ালি, পাঁচলাইশ এবং বাকলিয়া থানা এবং পটিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলার লোকজন পাসপোর্ট পেতে আবেদন করেন। বাকি উপজেলা ও নগরীর বাসিন্দারা আবেদন করেন বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে।

পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন জাতিসংঘ পার্কের উত্তর পাশে বরইতলা টিনশেড কক্ষে রয়েছে আরও একটি ‘ছায়া পাসপোর্ট অফিস!’ এক ছাদের নিচে যেন অনেক দালাল। এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকেলোকারণ্য থাকে। পাসপোর্টের আবেদন লেখা থেকে শুরু করে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া সবই তারা করেন। এখান থেকেই সেবা প্রার্থীরা শুধু আবেদন ফরম নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের নির্ধারিত কক্ষে জমা দিয়ে আসেন। এ জন্য প্রতি পাসপোর্ট বাবদ ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। দালালদের নিয়োগ করা কমিশনভিত্তিক কিছু লোক ঘুর ঘুর করে পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে-বাইরে। যারা অল্প সময়ে পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে আসে বরই তলার কক্ষে। সেখানে ভেরিফিকেশন ছাড়া তাদের মাধ্যমে একটি সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করতে হলে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। আর পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ করতে হলে ৭ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়। জরুরিভিত্তিতে কোনো পাসপোর্ট করতে হলে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পাসপোর্ট হাতে পেয়ে যাবেন আবেদনকারীরা- এমন আশ্বাস দেন তারা।

বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রতি পাসপোর্টে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দালালদের দিতে হয়। তা না হলে পাসপোর্টের আবেদনে নানা ভুল-ভ্রান্তির কথা বলে আবেদন ফিরিয়ে দেন অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আবেদন জমা নিলেও মাসের পর মাস ঘোরাঘুরি করেও পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। এ কারণে সঠিক সময়ে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য দালালের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন লোকজন। দালালদের মাধ্যমে দেওয়া প্রতিটি পাসপোর্টের আবেদন ফরমে বিশেষ চিহ্ন থাকে। এ সম্পর্কে অফিসের কর্মকর্তারা অবগত থাকেন। পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার অভিযান চালায়। এতে বেশ কয়েকজন দালাল আটক হন। এ ঘটনায় কিছুদিন পাসপোর্ট অফিস এলাকা দালালমুক্ত থাকলেও এখন আবারও পুরোনো চেহারায় ফিরে এসেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন