নিয়ন্ত্রণে ৪০ ‘গুরু’

‘নকল’ হিজড়ারা বেপরোয়া অতিষ্ঠ নগরবাসী

আসল হিজড়ারা অসহায়, আড়ালে অস্ত্র ও মাদকের কারবার

প্রকাশ : ২৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ইকবাল হাসান ফরিদ

বুধবার দুপুর সাড়ে ১১টা। রাজধানীর ইস্কাটন থেকে রিকশায় গ্রিনরোড যাচ্ছিলেন আফজাল হোসেন। বাংলামোটর সিগন্যালে তাকে ঘিরে ধরে তিন জন হিজড়া, ১৫০ টাকা দাবি করছিল। রাজি না হওয়ায় একজন তার রিকশায় চড়ে বসে। শুরু করে অশ্লীল সব অঙ্গভঙ্গি। পরে ১০০ টাকা দিয়ে কোনো মতে রেহাই পান আফজাল।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা, ফার্মগেটে ৬ নম্বর পরিবহনের বাস থামতেই উঠে পড়েন চার জন হিজড়া। উঠেই বলতে শুরু করেন, দে ভাই, ঈদ বকশিশ দে। একজন ১০ টাকা দিতে চাইলে মুখ ভেংচি দিয়ে ৫০-১০০ টাকা দাবি করে বসে। শুরু করে নানা অঙ্গভঙ্গি। শেষ পর্যন্ত কারও কাছ থেকে ৩০, কারও কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে ছাড়ে। বাসের পেছনের সিটে বসা ছিল এক তরুণ ও তরুণী। হিজড়াদের একজন গিয়ে বসে পড়ে তরুণের কোলে। ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে তরুণী। শেষ পর্যন্ত ১০০ টাকা দিয়ে পরিত্রাণ মেলে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিজয় সরণি সিগন্যালে প্রাইভেটকার থেকে চাঁদা আদায় করছিল একদল হিজড়া। ৫০-১০০ টাকা করে প্রতিটি গাড়ি থেকে আদায় করছিল। ওই সময় কথা হয় সাইফুর রহমান নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে হিজড়ারা ‘বাজে’ ব্যবহার করে। ৫০/১০০ টাকা দিলে নিতে চায় না। পারলে গাড়ি ভেঙে ফেলে।

বিশেষ করে রোজা শুরু হওয়ায় পর রাজধানীজুড়ে হিজড়াদের উৎপাত সীমা অতিক্রম করেছে। রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তারা। পুলিশের সামনেই রাস্তাঘাট, শপিংমল, গণপরিবহন, প্রাইভোট কার এমনকি বাসাবাড়িতেও জিম্মি করে টাকা আদায় চলছে। হিজড়াদের অনেকেই বলেছেন, যারা জবরদস্তি করছে তারা ভুয়া বা নকল হিজড়া। ‘গুরু’রা বেশি টাকা আয়ের লক্ষ্যে এদের মাঠে নামিয়েছে। কেবল ঢাকায়ই অন্তত ৪০ জন ‘গুরু’র ছত্রছায়ায় কয়েক হাজার ভুয়া হিজড়াকে নামানো হয়েছে। এরা শুধু চাঁদাবাজিই করছে না, কেউ কেউ অস্ত্র, মাদক ও পতিতাবৃত্তির সঙ্গেও জড়িত। এদের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে প্রকৃত হিজড়ারা।

রাজধানীর অভিজাত এলাকার বাসাবাড়ি তাদের অত্যাচারের বাইরে নয়। কোনো প্রতিকার মিলছে না। এ নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবিদা সুলতানা মিতুর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘নকল’ হিজড়াদের দমন এবং চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা আগেই সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি বলেন, নকলদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে প্রকৃত হিজড়ারা অসহায় হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে ৬৫ জন হিজড়া ‘গুরু’ রয়েছে। এদের পুনর্বাসিত করে ‘গুরু’ প্রথার বাইরে না নিতে পারলে অপরাধ বন্ধ হবে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কেউ-ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কেউ হয়রানির শিকার হয়ে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

হিজড়াদের টাকা তোলার রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সম্প্রতি মর্জিমতো টাকা না পেলে জবরদস্তি খাটানো হচ্ছে। নবজাতক নাচানোর নামে একেকটি পরিবারের কাছ থেকে জোর করে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। আর ঈদ সামনে রেখে তারা এখন বেসামাল।

আলাপ হয় পুরান ঢাকায় রুপালী নামের এক হিজড়ার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যারা জবরদস্তি করে তারা সবাই ভুয়া হিজড়া। প্রকৃত হিজড়ারা হাত পেতে টাকা নেয়। কারো সঙ্গে দুর্র্ব্যবহার করে না। একই কথা বললেন যাত্রাবাড়ী এলাকার সুমনা হিজড়া। তিনি বলেন, কতিপয় ‘গুরু’ দল ভারি করতে এদের ভাড়ায় খাটায়। এদের দিয়ে অস্ত্র, মাদক, পতিতা ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম করে। ফায়দাবাদের আপন হিজড়া যুগান্তরকে বলেন, আমরা হাত পাতি না। কর্ম করে খাই। মিনি গার্মেন্ট চালু করেছি। সেখানে হিজড়ারা কাজ করে।

রাজধানীর তুরাগ, উত্তরা, আশকোনা, মহাখালী, বনানী, ফার্মগেট, মিরপুর পল্লবী, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, গুলিস্তান এবং পুরান ঢাকায় কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে হিজড়াদের চাঁদা তুলতে দেখা যায়। না দিলেই নানাভাবে হেনস্থা করতে দেখা যাচ্ছে। উত্তরা, তুরাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বিমানবন্দর, আশকোনা এলাকায় এদের তৎপরতা বেশি। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কেয়ারটেকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্য সময় ৩-৪ জন করে আসত, ৫০-১০০ টাকা দিলেই চলে যেত। এখন দলবেঁধে আসছে। কম করে হলেও ১ থেকে দেড় হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, নইলে ঝামেলা করে। নবজাতক নাচানোর নামে ১০ হাজার থেকে শুরু ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবির নজিরও রয়েছে।

কথা হয় উত্তরার বাসিন্দা লতা পারভীনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার সন্তান হওয়ার পর উত্তরা ১১ নং সেক্টরের বাসা থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে নেয় ওরা। বাসাবদল করে ৫নং সেক্টরে গেলে সেখানেও হানা দেয় হিজড়ার দল। দ্বিতীয় বার টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তারা দলবেঁধে আমার স্বামী ও ভাইকে মারধর পর্যন্ত করে। কোনোভাবেই ওদের হাত থেকে নিস্তার মিলছে না। ওরা এলে দারোয়ানের কাছ থেকে বাসাবদলের খবর পেয়ে হানা দেন। হয়তো দারোয়ানরা তাদের কাছ থেকে কমিশন পায়।

নিয়ন্ত্রণে ৪০ ‘গুরু’: অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেবল রাজধানীতে হিজড়াদের ৬৫ ‘গুরু’ রয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন জবরদস্তিতে উৎসাহ দেন এবং এরা প্রত্যেকেই কোটিপতি। তারা পুরুষদের দলে টেনে হিজড়া বানিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে।

৪০ ‘গুরু’র মধ্যে রয়েছে মগবাজারে স্বপ্না, সজিব, মানিকনগরের আবুল, বাসাবোর অরুণা, ফকিরাপুলের সুইটি, শাহজাহানপুরের জয়নাল, উত্তর বাড্ডার পলি, মেরুল বাড্ডায় শামীমা, কুড়িলের পিংকী, রামপুরার রনি হাজী, উত্তরার কচি, সারিকা, পিংকী, রাহেলা, নাজমা, অঞ্জনা, কাকলী, আহ্লাদি, সোনিয়া, দয়াগঞ্জের কেচকি আনরি, মুচকি আনরি, শাঁখারী বাজারের মেজবাহ, মায়া, চঞ্চল, কাল্লু, লালবাগের কালা, হাকিম, রিমা, রায়ের বাজারের সুমী, পিকুলী, মিরপুরের আনরী, শাহজাদী, রাখি, মাস্টার রনি, মোহাম্মদপুরের হামিদা অন্যতম। এদের মধ্যে ভুয়া হিজড়াই বেশি।

এদের মধ্যে উত্তরার রাহেলা, বিশ্বরোডের পিংকি, মগবাজারের কচি ও স্বপ্না, মিরপুরের আনুরি ও শাহজাদি এবং পুরান ঢাকার মেজবা গ্র“পের বিরুদ্ধে অভিযোগে মাত্রা বেশি। এরা দিনে চাঁদাবাজি, রাতে পতিতাবৃত্তি ও ছিনতাইয়ের জড়িত। এসব অভিযোগ নিয়ে জানতে স্বপ্না, সজিব, পিংকীসহ অন্তত ১০ জন হিজড়া ‘গুরু’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সবাই জোরপূর্বক চাঁদাবাজি করানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।