সিলেট সিটি নির্বাচনের পোস্টমর্টেম

পাঁচ কারণে এগিয়ে আরিফ কামরান পিছিয়ে ৬ কারণে

  মুসতাক আহমদ ও আজমল খান, সিলেট থেকে ০১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেট সিটি নির্বাচন

পাঁচ কারণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ভোটের ফলে এগিয়ে। অপরদিকে ছয়টি নেতিবাচক কারণে পিছিয়ে পড়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। ভোটার ও স্থানীয় রাজনীতিকদের সঙ্গে আলাপে এ তথ্য জানা গেছে।

নানা অনিয়ম ও অপ্রীতিকর ঘটনার জেরে সোমবার দুপুরে ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক। দিনশেষে ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে থাকার পর সুর পাল্টান তিনি।

অপরদিকে জয়ের জন্য মরিয়া ছিল আওয়ামী লীগ। দলটির মেয়র প্রার্থীসহ সিনিয়র নেতারা সকাল থেকেই ছিলেন ফুরফুরে মেজাজে। এমনকি জয়ী প্রার্থী হিসেবে কামরান গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও দেন। দিনশেষে পিছিয়ে পড়ার পর তিনিও সুর পাল্টান।

যে পাঁচ কারণে আরিফুল হক চৌধুরী এগিয়ে গেছেন তার মধ্যে প্রথমেই আছে ব্যক্তি ইমেজ ও নিজস্ব ভোটব্যাংক। ২০০৩ সালের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হিসেবে অভিষেক হয় আরিফুল হকের। ওই নির্বাচনে তিনি কাউন্সিলর হন। তার বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী কামরান তখন মেয়র নির্বাচিত হন। নানা রাজনৈতিক মেরুকরণে আরিফুল হক চৌধুরীকে তখন নগর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি করা হয়। তখন ক্ষমতায় বিএনপি। অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম সাইফুর রহমান।

নগর উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন তিনি। সিলেটবাসী আরিফুলের সেই ভূমিকা শুধু প্রত্যক্ষই করেননি, মনেও রেখেছেন। ২০০৮ সালে হয় সিটির দ্বিতীয় নির্বাচন। আরিফুল হক কারাগারে থাকায় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন। তবে কারাগারে থেকেও ভোট করে কামরান টানা দ্বিতীয়বার মেয়র হন।

কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনে দৃশ্যপটে ফিরে আসেন আরিফুল। বদরউদ্দিন কামরানকে হারিয়ে মেয়র হন আরিফুল হক। ৫ বছরের জন্য মেয়র নির্বাচিত হলেও আরিফুল মাত্র ২৭ মাস কাজ করতে পেরেছেন। বাকি সময় কাটে তার জেল ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বহিষ্কারাদেশের বৃত্তে। তবে এই ২৭ মাসেই নগরীর ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেন।

নগরের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা, দখল হওয়া ছড়া-খাল উদ্ধারের মাধ্যমে তিনি নগরবাসীর কাছে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন।

নগরবাসী জানান, আরও কিছু কারণে আরিফ ভোটারদের প্রিয়ভাজনে পরিণত হন। এর মধ্যে আছে, সন্ধ্যা বাজারের নানা অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া উচ্ছেদ, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা, ভাসমান হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগও সমাদৃত হয়েছে।

এসব কারণে আলেমসমাজ, ব্যবসায়ী, নতুন ও নারী ভোটারসহ সমাজের অধিকাংশ মানুষের প্রিয় পাত্রে পরিণত হন। নগরীর মাছিমপুরের মণিপুরী পাড়ায় মন্দির সংস্কার এবং মণিপুরীদের প্রিয়ভাজন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুর‌্যাল তৈরির মাধ্যমে আরিফ ওই সব সম্প্রদায়েরও প্রিয়পাত্রে পরিণত হন।

রংপুর থেকে সিলেটে ১৯৮৩ সাল থেকে বসবাস করছেন মামুন হোসেন। তিনি বলেন, আরিফ সিলেট শহরের মানুষের মনের কথা বোঝেন। ধর্মীয় আবেগ মাথায় রেখে তিনি জীবন পরিচালনা করেন। তার বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়ানো বা প্রশ্রয়ের অভিযোগ নেই। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সদা তৎপর ছিলেন। ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে তিনি নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

আরিফের প্রত্যাবর্তনে আরও তিনটি কারণ আছে। এগুলো হল- দলীয় প্রতীক ও বিএনপি তথা ধানের শীষের ভোট, সরকারের প্রতি জনগণের অসন্তোষ এবং দলীয় অপর প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিমের সমর্থন। মহানগরের এ আসন সংসদীয় সিলেট-১ আসন। ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬টি সংসদ নির্বাচন হয়। এর মধ্যে তিনবার আওয়ামী লীগ ও তিনবার বিএনপি জয়ী হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, নৌকার তুলনায় নগরবাসী ধানের শীষকে বেশি পছন্দ করে। অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতিক এবং নগরবাসী বলেন, সরকারে থাকার সুবাদে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ভোটারদের কমবেশি অসন্তোষ আছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়া জেলে থাকার বিষয়টি নারী ও নতুন ভোটারদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আরিফুল এ সুবিধা পেয়েছেন।

দলের মহানগর সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম সাংগঠনিকভাবে যেমন শক্তিশালী, তেমনি জনপ্রিয়ও। ছাত্রনেতা থাকার সময় ১৯৯৫ সালের পৌর নির্বাচনে কামরানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোট পেয়েছিলেন। সেলিমের সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি আরিফের জন্য ইতিবাচক হয়েছে।

অপরদিকে কামরানের পিছিয়ে পড়ার পেছনে মোটা দাগে ছয়টি কারণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অতীত কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত ইমেজ, দলীয় কোন্দল, বারবার নির্বাচিত হওয়ার পরও নগরীর সমস্যা নিরসনে আন্তরিকতার ঘাটতি, ভোট নিয়ে নেতিবাচক খেলা, সরকারবিরোধী মতামতের প্রতিফলন এবং পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা।

কামরান ১৯৭৭ সাল থেকে এই নগরের জনপ্রতিনিধি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি যথাক্রমে পৌর কমিশনার, পৌর চেয়ারম্যান ও মেয়র হন। এর মধ্যে টানা দু’বার মেয়র ছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে ৩৬ বছরের মধ্যে ১৮ বছরই ছিলেন নগরপিতার পদে। বারবার নির্বাচিত হওয়ার পরও নগরীর সমস্যা নিরসনে আন্তরিকতার ঘাটতি স্পষ্ট বলে মনে করেন নগরবাসী।

নগরের মৌলিক সমস্যা দূর না করে জিইয়ে রাখার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অথচ মাত্র ২৭ মাসে সেসব সমস্যা দূর করতে সক্ষম হন আরিফুল। উন্নয়নে এ দৃশ্যমান পার্থক্য কামরানের জনপ্রিয়তা রাতারাতি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। কামরানের ব্যক্তিগত ইমেজও মানুষের কাছে সন্তোষজনক নয়। নগরীর গুলশান হোটেলের আড্ডা নিয়ে তার ব্যাপারে জনমনে বিরূপ ধারণা আছে।

সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় এ ভবন নির্মাণের বিষয়টিও মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। লালদীঘিপাড়ে হকার মার্কেট নির্মাণ নিয়েও তার বিরুদ্ধে নয়ছয়ের অভিযোগ আছে ব্যবসায়ীদের। যদিও তার মৌখিক ব্যবহার নিয়ে কারও আপত্তি নেই।

এছাড়া তার ছেলে আরমান আহমেদ শিপলুকে নগরীর রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে চাকরি দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা আছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার স্ত্রীর ব্যবসা-বাণিজ্যও দলের লোকজন ভালো চোখে দেখছেন না। এসব কারণে দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি বিতর্কিতও।

দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকায় দলের ভেতরেও তার শক্ত প্রতিপক্ষও তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী নেতা চাননি তিনি মনোনয়ন পান। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব কারণে দলের একজন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগরের শীর্ষ এক নেতা শুরুতেই বিদেশ চলে যান।

দলীয় চাপের মুখে নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে ফেরেন। এছাড়া মহানগর ও জেলার আরও বেশকিছু নেতা কামরানকে পছন্দ করেন না। তারাও মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে কামরান অনেক কেন্দ্রে এজেন্টই দিতে পারেননি। দলীয় কোন্দলের সেটাই বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে এখনও জ্বলজ্বল করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আধ্যাত্মিক শহর সিলেটের নাগরিকরা শান্তিপ্রিয়। তারা প্রশাসনিক ও পুলিশি হয়রানি পছন্দ করেন না। কামরানের পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে নানা নেতিবাচক খেলা হয়। মাত্র ছয়দিনের মধ্যে চারটি মামলা করে সাড়ে ৪ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। ভোটের একদিন আগে বিএনপির জনপ্রিয় নেতা আবদুর রাজ্জাককে গ্রেফতার করা হয়।

রাজ্জাককে নির্বাচনী কাজ থেকে দূরে রাখতে তার ব্যবসায়ী ছেলেকে ধরে নেয় পুলিশ। এছাড়া আরিফুলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী জুরেজ আবদুল্লাহকে গ্রেফতারসহ দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, হয়রানি, বাসাবাড়িতে পুলিশি হানা, হুমকিধমকি ইত্যাদি নগরবাসীর মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে নগরবাসীর সামনে সদ্য অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে পুলিশ ও প্রশাসনের নেতিবাচক ভূমিকা সফলতার সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হন।

পাশাপাশি ভোটের দিন পুলিশের নেতিবাচক ভূমিকা এবং আগের রাতে পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এসবের জবাব নগরবাসী ব্যালটে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে সিলেটে দুটি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেয়া হয়। সেখানে কামরানের তুলনায় আরিফুল দ্বিগুণের বেশি ভোট পান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব কেন্দ্রে ইভিএমের মতো ভোটের ব্যবস্থা হলে ওটাই হতো প্রকৃত ফল। এছাড়া প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে কামরান ভোটযুদ্ধে নামেন। নির্বাচনে ভোটাররা সরকারবিরোধী মতামতের প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন বলে কেউ কেউ বলেন।

এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আসলে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ আমরা এখনও করিনি। তবে এটা ঠিক যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মানুষ ব্যক্তি দেখে ভোট দেয়। আর আমরা নির্বাচনে পরাজিত হইনি। ফলও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নয়। আমরা আশা করি, জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে।

বিএনপির জেলা সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিগত দিনের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক খেলা জনগণ পছন্দ করেনি। বিপরীতদিকে আমাদের প্রার্থী সবসময় জনগণের সঙ্গে আছেন।

অপরদিকে সরকার অবৈধভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রেখেছে। এসব দেশের জনগণ পছন্দ করে না। সিলেটের জনগণ সারা দেশের মানুষের পক্ষ হয়ে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জবাব দিয়েছে। আশা করি, সরকার এখান থেকে ইতিবাচক বার্তা নেবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter