অস্থিরতা ও আতঙ্কের সঙ্গে ছিল প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  রাশেদ রাব্বি ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের স্বাস্থ্য খাতে ২০১৭ সালটি ছিল বেশ আলোচিত। এ বছর স্বাস্থ্য খাতে যেমন ছিল অস্থিরতা-আতঙ্ক, তেমনি ছিল প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি। চিকিৎসক, রোগী থেকে শুরু করে এ খাতের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন এক ধরনের অস্থিরতায়। পাশাপাশি এ বছর স্বাস্থ্য খাতে প্রাপ্তিও কম নয়। দেশের স্বাস্থ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চমর্যাদায় স্থান করে নিয়েছে এ বছরই।

চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক : বছরের বেশিরভাগ সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। অনেকটা নতুন এ রোগে আক্রান্ত হন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও তার স্ত্রী, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিকল্প ধারার কেন্দ্রীয় নেতা নাজমুল করিম বাচ্চু, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, মডেল অভিনেত্রী মৌসুমি হামিদ, বিদ্যা সিনহা মিম, আইরিন, স্বর্ণজয়ী ভারোত্তলক মাবিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ। যদিও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, চিকুনগুনিয়া রোগে মৃত্যু ঝুঁকি নেই। তবুও এ আতঙ্ক তাড়া করেছে নগরবাসীকে।

কক্সবাজারে এইডস আতঙ্ক : পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এইচআইভি পজেটিভ এইডসের আতঙ্ক দেখা দেয়। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে একের পর এক এইডস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৯৭ জন এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ২৫শ’ থেকে ৪ হাজার এইডস রোগী থাকতে পারে।

মাতৃমৃত্যুর হার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেনি : মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১০ হাজারে ১৪৩ অর্জন করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে এক লাখ জীবিত জন্মে ১৭০ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যাটারনাল, নিওন্যাটাল, চাইল্ড ও এডোলসেন্ট হেলথের (এমএনসিএন্ডএএইচ) তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মা প্রসবজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছেন।

টিকা না পৌঁছানোয় সীতাকুণ্ডে হামে ৯ শিশুর মৃত্যু : সরকারিভাবে দেশে টিকাদানের হার ৯৯ শতাংশ হলেও প্রয়োজনীয় টিকা না পেয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু ঘটে। জানা গেছে, সীতাকুণ্ডসহ পাঁচ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার আটটি আদিবাসীপাড়ায় কোনোদিনও সরকারের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি।

অনিশ্চয়তা কাটেনি ১৪ হাজার সিএইচসিপির : দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকার সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প চালু করে। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও রাজস্ব খাতে আসেনি কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) চাকরি। জাতীয়করণ না হওয়াসহ অনিশ্চয়তা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে ইতিমধ্যে প্রায় শতাধিক কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অনেকে ছাড়ার পথে।

৩য়-৪র্থ শ্রেণীর নিয়োগ বন্ধ : পূর্বের নিয়োগ বিধির কার্যকারিতা না থাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন অনেক পদে লোকবলের প্রয়োজন হলেও বিধি না থাকায় তা নিয়োগ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট দফতরের তথ্যমতে, দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে মোট সৃষ্টপদের ৪০ ভাগই শূন্য। এতে দেশের বেশিরভাগ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট দেখা দিয়েছে।

থামছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল : পুলিশের হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এ সংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজার; তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দাবি, ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মরণব্যাধির চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। যার সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য বাজেট জড়িত।

বাস্তবায়ন হয়নি স্পষ্ট অক্ষরে ব্যবস্থাপত্র লেখার নির্দেশ : রোগীদের নিরাপত্তায় দুর্বোধ্য অক্ষরে ব্যবস্থাপত্র না লিখতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানছেন না দেশের কিছু কিছু চিকিৎসক। স্পষ্ট অক্ষরে রোগীর ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) লেখার জন্য চিকিৎসকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সার্কুলার জারির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

হাসপাতালে চিকিৎসক রোগী হাতাহাতি : বছরের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন হাসপাতালে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে চিকিৎসক রোগী হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বগুড়ায় ফ্যান বন্ধ করা নিয়ে রোগীর সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা ছিল খুবই আলোচিত। এছাড়া রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে একাধিকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তবে বছরজুড়ে এসব আলোচিত ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলেও স্বাস্থ্য খাতে অর্জনও কম নয়।

২শ’ বছর পর কলেরার জীবাণু নিয়ন্ত্রণের কৌশল রপ্ত : ২শ’ বছর আগে ১৮১৭ সালে পৃথিবীর বৃহৎ ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে এক মহামারি রোগের আবির্ভাব ঘটেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সে সময় সুন্দরবন এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিক পাঠায়। যাদের দায়িত্ব ছিল বিস্তীর্ণ বণভূমি পরিষ্কার করে চাষাবাদ উপযোগী করা। কিন্তু কে জানত এ লোনা জলে ভাইবারি ও কলেরা নামক ব্যাক্টিরিয়ার আবাসস্থল। তখনকার চিকিৎসকরা এ রোগের কূল-কিনারা করতে না পারলেও ২শ’ বছর পর আইসিডিডিআরবি এ রোগের সফল ও গ্রহণযোগ্য টিকা আবিষ্কার করে।

লিভার সিরোসিস ও ফেইলিউরে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অভাবনীয় উদ্ভাবন : লিভার সিরোসিস অথবা অন্য কোনো কারণে লিভার অকার্যকর (ফেইলিউর) হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত- এমন ধারণা বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের দুই বিজ্ঞানী। সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এসব রোগের চিকিৎসায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন তারা। লিভার (যকৃত) ফেইলিউর রোগীদের নতুন পদ্ধতির এ চিকিৎসা শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)। তাকে সব ধরনের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছেন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। ইতিমধ্যে এই দুই চিকিৎসকের আবিষ্কার ন্যাসভ্যাক ওষুধ এবং স্টেমসেল চিকিৎসা পদ্ধতি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় : গবেষণা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। স্পেনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের ফল অনুযায়ী ভারতীয় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে অনেক ধাপ ওপরে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাছাড়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শুরু হয়েছে দেশের প্রথম স্টেমসেল থেরাপির মাধ্যমে লিভার চিকিৎসা ব্যবস্থা।

হার্টের ভাল্ব, স্ট্যান্ট ও পেসমেকারের দাম নির্ধারণ : এ বছর দেশে প্রথমবারের মতো করোনারি স্ট্রান্ট বা হার্টের রিং, ভাল্ব এবং পেসমেকারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করেছে সরকার। বছরের মাঝামাঝি স্ট্রান্টের দাম কমানো হয় এবং ১৯ ডিসেম্বর ভাল্ব ও পেসমেকারের দাম নির্ধারণ করে অধিদফতর।

মুক্তামনি, তোফা ও তহুরার চিকিৎসায় সাফল্য : ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয় বিচ্ছিন্ন করার পর সুস্থ জোড়া শিশু তোফা ও তহুরাকে। ওদের আগে পৃথিবীতে এ ধরনের ১৩টি শিশু জন্মগ্রহণ করে। যাদের ৬০ ভাগই অস্ত্রোপচার পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। সেদিন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে জানান, তোফা ও তহুরা এবং মুক্তামনিকে নিয়ে চিকিৎসকদের সফলতার খবর জাতিসংঘে যাচ্ছে।

এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, টিকার অভাবে হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত। আর চিকুনগুনিয়ার বিষয়টি কারও প্রত্যাশিত নয়। তাছাড়া দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জন্য বছরটি একটি প্রাপ্তির বছর বলা যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter