শ্যামপুরে পাভেল হত্যা: চার ঘাতক গ্রেফতার

বয় সেজে কাজ নিয়েছিল চট্টগ্রামের এক হোটেলে * একজনের প্রশ্ন- স্যার আমার কি ফাঁসি হবে? * নিহতের খোঁজ নিতে হাসপাতালেও যায় খুনিরা

  সিরাজুল ইসলাম ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্যামপুরে পাভেল হত্যা: চার ঘাতক গ্রেফতার

মা-বাবার একমাত্র ছেলে ২২ বছরের তরুণ শেখ ইসলাম পাভেল। ছোট বোন তামান্নাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত রাজধানীর শ্যামপুর এলাকার কয়েক কিশোর-যুবক।

উত্ত্যক্ত করত পাভেলের বান্ধবী মারিয়াকেও। এর প্রতিবাদ করায় ৩ নভেম্বর রাতে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় পাভেলকে। হত্যাকাণ্ডের পর ৪ খুনি চট্টগ্রামে গিয়ে খাবার হোটেলে কাজ নেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

পুলিশ ধরে ফেলে তাদের। রোববার ৪ জনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। আজ তাদের আদালতে হাজির করা হবে। এরই মধ্যে তারা আদালতে গিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে। রোববার বিশেষ ব্যবস্থায় তারা যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছে।

এ সময় ঘাতকরা অবলীলায় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। কিভাবে, কেন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার সবই বলেছে তারা। হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের খোঁজ নিতে হাসপাতালেও গিয়েছিল তারা। যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলার সময় একপর্যায়ে রাব্বি নামের একজন (স্কুলছাত্র) বলে উঠে, ‘স্যার আমার কি ফাঁসি হবে?’

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪ নভেম্বর পাভেলের বাবা মনির হোসেন ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। ছয়জনের মধ্যে কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয়া চারজন এখন পুলিশ হেফাজতে। তারা হল- তুহিন, এরফান, মাসুম এবং রাব্বি ওরফে বেজি রাব্বি। এরা সবাই শ্যামপুর এলাকায় থাকে। এদের মধ্যে রাব্বি কদমতলীর মুরাদনগর হাই স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার্থী ছিল (হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক থাকায় পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি)। এরফান একই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। মাসুম এবং তুহিন এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত। মাসুমের নেতৃত্বে শ্যামপুর কদমতলী এলাকায় গড়ে উঠেছে বখাটেদের একটি গ্র“প।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাভেল তার বান্ধবী মারিয়াকে নিয়ে শ্যামপুরের জুরাইন খাদ্য গুদামের কাছে গল্প করছিল। এ সময় তুহিন উত্ত্যক্ত করে।

তাদের সামনে গিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। তুহিনের কাছে এর কারণ জানতে চায় পাভেল। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তুহিনকে একটি থাপ্পড় দেয় পাভেল।

পরে পাভেলকে হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তুহিন। তুহিন ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পরও পাভেল সেখানে তার বান্ধবীকে নিয়ে গল্প করছিল। এর কিছুক্ষণ পর তুহিন, এরফান, মাসুম, রাব্বি, নাজিম ও শাহিন দুটি ছুরি নিয়ে আসে।

গ্রেফতারকৃত স্কুলছাত্র রাব্বি যুগান্তরকে বলে, আমরা ঘটনাস্থলে ছুরি নিয়ে যাওয়ার পর পাভেলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পাভেলের পেটে ছুরিকাঘাত করে তুহিন। এতে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে যায়। এরপর মাসুমের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। পাভেলের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে আমরা পালিয়ে যাই। রাব্বি আরও বলে, ‘স্যার আমি আদালতে গিয়ে সব স্বীকার করব। রাজসাক্ষী হলে কি বাঁচতে পারব? আদালত থেকে বেঁচে এলেও এলাকাবাসী আমাকে পিটিয়ে মারবে।’

গ্রেফতারকৃত অপর স্কুলছাত্র এরফান যুগান্তরকে বলে, ঘটনার পর ছুরি এবং রক্তমাখা কাপড় নিয়ে কবরস্থান গলি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করি। বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে একটি বরই গাছের নিচে ছুরি ও রক্তমাখা কাপড় ফেলে দেই। পরে প্রত্যেকের বাড়ি থেকে লোক মারফত কাপড় এনে সেখানে পরিধান করি।

এরপর সদরঘাট হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে যাই পাভেলের খবর নিতে। পাভেলের কাছে না গিয়ে আশপাশে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মেডিকেল থেকে চলে যাই কমলাপুরে। সেখান থেকে ট্রেনে রাতেই চলে যাই চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার চৌমুহনী এলাকার একটি মেসে উঠি। আমি এবং তুহিন খাবার দোকানে কাজ নেই। মাসুম এবং তুহিনও কাজ খুঁজছিল।

কিন্তু তারা কাজ পাওয়ার আগেই পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। জানতে চাইলে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, একটি হত্যা মামলার চারজন গুরুত্বপূর্ণ আসামিকে একসঙ্গে গ্রেফতার করা খুবই কঠিন। পর্যাপ্ত সোর্স এবং প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার অপর দুই আসামি নাজিম ও শাহিনকে গ্রেফতারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে।

শ্যামপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। তারা আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়েছে। সোমবার (আজ) তাদের আদলতে হাজির করা হবে।

পলাতক দুই আসামিকে ধরতে গ্রেফতারকৃতদের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে মামলার বাদী মনির হোসেন বলেন, ঘাতকরা শুধু মারিয়াকেই ইভটিজিং করেনি। তারা আমার মেয়ে তামান্নাকেও ইভটিজিং করত। দ্রুত সময়ের মধ্যে ৪ আসামি গ্রেফতার হওয়ায় আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। আরও দুই আসামির গ্রেফতারের পাশাপাশি দ্রুত বিচারের মাধ্যমে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×