দূষণ-দখলে বিপর্যস্ত রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী

  এ হাই মিলন, রূপগঞ্জ ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীতলক্ষ্যা নদী

শীতলক্ষ্যা নদী রূপগঞ্জকে পূর্ব-পশ্চিমে দুইভাগে বিভক্ত করেছে। আর রূপগঞ্জের একেবারে পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে রয়েছে বালুনদী। এ দু’নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ও কৃষি।

শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলেও পশ্চিম তীর অর্থাৎ বালু নদীর পূর্ব অঞ্চলে কৃষিই প্রধান। মূলত বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানিকে অবলম্বন করেই এখানকার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়।

একটা সময় ছিল শীতলক্ষ্যার ডালিমের রসের মতো টলটল পানি অনেকে রোগ নিরাময়ের জন্যও ক্ষেত। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। খাওয়াতো দূরের কথা বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি স্পর্শও করা যায় না। নদী পথে চলাচলের সময় নাকে রোমাল চেপে রাখতে হয়- দুঃখ করে কথাগুলো বলছিলেন উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বাঘবাড়ি এলাকার নূরুল হক মিয়া।

এ ক্ষোভ শুধু নূরুল হকের নয়। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীরবর্তী গ্রামগুলোর কয়েক লাখ মানুষের। এলাকাবাসীর দুঃখ নদীর পচা পানি। রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ ও রূপগঞ্জের কোলঘেঁষে প্রবাহমান শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ এখন দূষণ-দখলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নদে এখন মাছ নেই। বেড়েছে মশার উপদ্রব্য। কমে গেছে ফসলের উৎপাদন। সংকট দেখা দিয়েছে খাবার পানির। বেড়েছে রোগ-বালাই। পচা পানির কটূ গন্ধে তীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে। বিপণ্ণ হয়ে গেছে পরিবেশ। বিপর্যস্ত মানুষের জীবন। দূষণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে নদ দখলের প্রতিযোগিতাও চলছে।

এক সময় ভোরে আর বিকালে হাওয়া বিলাসীরা তার দুই পাড়ে হাঁটত। তাতে প্রফুল্ল হতো দেহ-মন। নদীপাড়ের হাওয়া, লাখ টাকার দাওয়া। এখন এ প্রবাদ ফিকে হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার পয়ঃবর্জ্য ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য পড়ে নদীর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। স্থানীয়রা একে ‘পচা’ পানি বলে চেনে।

সরেজমিন বালু নদের তীরবর্তী বালুরপাড়, নগরপাড়া, দাসেরকান্দি, বাবুরজায়গা, ফকিরখালী, বেড়াইদ, নাগদারপাড়, গৌড়নগর, ত্রিমহনীসহ বিভিন্ন গ্রামগুলোর মানুষের সঙ্গে কথা বলে পচা পানির কারণে তাদের নানা সমস্যার চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আজও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। নারকীয় পরিবেশের সঙ্গে বোধকরি এর তুলনা করা চলে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও যেন তাদের নেই। এ পচা পানিতেই বৌ-ঝিয়েরা থালাবাসন পরিষ্কার করছে। কৃষক গরু-ছাগল গোসল করাচ্ছে। এমনকি পানির অভাবে লোকজন এ পচা পানিতেই গোসল করছে।

নদের উভয় তীরজুড়ে কৃষি জমি। এখানে বিভিন্ন রকমের ফসলের চাষ করেন স্থানীয় কৃষকরা। পচা পানির কারণে এখন ফসলের উৎপাদন কমে গেছে বলে জানান তারা। বর্গাচাষী মারতুজা বলেন, আগে জমিনে বিঘায় ধান পাইতাম ৪০ মণ। অহন অয় ১৮-২০ মণ। পচা পানি ক্ষেতে দেওনে আলীর ( চারার ) গোড়া মোডা অইয়া যায়। ফলন অয় না। কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, আগে এই বিশাল এলাকার দুই-তিন ফসলি জমিন এহন এক ফসলি অইয়া গেছে। কারণ অন্য ফসল পচা পানিতে নষ্ট অইয়া যায়। রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাইজুল ইসলাম কৃষকদের বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, পচা পানির কারণে এসব এলাকার কৃষিতে বিরাট ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। পানিতে প্রচুর কার্বনডাইঅক্সাইড থাকার কারণে চারাগাছের গোড়া পচে যায়।

দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে দখলের প্রতিযোগিতাও। দখলদাররা বালু নদ দখলে নিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। নদীপাড়ে বাঁশের খুঁটি পুঁতে, গাছের ডালপালা ফেলে ঘের ফেলা হয়। মূলত বুঝানো হয় এখানে মাছ আটকানো হবে। পরে ধীরে ধীরে ওই ঘেরের জায়গায় বালু ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়। বালু নদের ডেমরা থেকে তুরাগের মোহনা পর্যন্ত দু’তীরে প্রায় ১৬০টির মতো ঘের রয়েছে বলে স্থানীয় জেলেরা জানান। এসব ঘের নদীপাড়ের প্রভাবশালীদের দখলেই রয়েছে। একই চিত্র শীতলক্ষ্যা নদীতেও দেখা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. মো. মামুন মিয়া বলেন, এ পানি ব্যবহারের কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগসহ নানা অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×