ইউনিসেফের গবেষণা প্রতিবেদন

অনলাইনে পীড়নের শিকার ৩২ শতাংশ শিশু

সবচেয়ে বড় বিপদ পর্নোগ্রাফি -মোস্তাফা জব্বার

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশু

দেশের ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও উৎপীড়নের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তৈরি ‘বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শীর্ষক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এই জরিপের এ ফল প্রকাশ করা হয়।

৫ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)।

দশ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়–য়া ১ হাজার ২৮১ শিশুর ওপর এই জরিপটি চালানো হয়। এরা প্রত্যেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং ৯৪ শতাংশেরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সংস্থাটি দেশের ৮ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর এ গবেষণা চালিয়েছে। সেখানে শহর, উপ-শহর এবং গ্রামের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইউনিসেফের জরিপে অংশ নেয়া ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করে। শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩ শতাংশ) নিজের ঘরে বসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা ‘বেডরুম কালচার’ অর্থাৎ কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ছেলেরা (৬৩ শতাংশ) মেয়েদের (৪৮ শতাংশ) চেয়ে বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। শিশুরা ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করে তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডিও দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকি জরিপে অংশ নেয়া ১৪ শতাংশ ইন্টারনেটে পরিচয় হওয়া ‘বন্ধুদের’ সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি দেখা করেছে।

শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব কক্ষে ৬৩, কমনরুমে ৬৩, আত্মীয়দের বাসায় ২৩, বন্ধুর বাসায় ১৮, খোলা স্থানে ১০, স্কুলে ৭ এবং সাইবার ক্যাফেতে ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে ৪৯ শতাংশ, নিজের স্মার্টফোনে ৩৭ এবং অন্যান্য স্মার্টফোনে ১৭ শতাংশ। শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসআপ, ইনস্টাগ্রাম, ভাইভার, ইউচ্যাট, টুইটার, টিকটক, স্কাইপি, বিগোলাইভ, টিন্ডার, শেয়ার চ্যাট ব্যবহার করছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭০, গ্রামে ৪৩ এবং উপ-শহরে ৫৪ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এসব শিক্ষার্থীরা তাদের অনলাইন নিরাপত্তা হিসেবে শুধু মেসেজ ব্লক করতে পারে। এ ছাড়া গবেষণায়, শিক্ষার্থীরা যৌন উত্তেজক ভিডিও, ইমেজসহ বিভিন্ন বিষয় দেখে সময় কাটাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিক থেকে খুলনা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি যৌন উত্তেজক সাইটগুলোতে প্রবেশ করছে।

ইন্টারনেটে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় উসকানি দেয়ার বিষয়টিও এতে উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৯ শতাংশ শিশু ধর্মীয় উসকানিমূলক বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছে। কিশোর বয়সীরা (১৬ থেকে ১৭ বছর) অন্য বয়সী শিশুদের তুলনায় বেশি এ ধরনের উসকানিমূলক বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়।

অনুষ্ঠানে ইন্টারনেটে শিশুদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, মার্চ মাসের মধ্যে প্রযুক্তি এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারব, তাতে পর্নো সাইট বা এ ধরনের বিপজ্জনক সাইটগুলোকে এক জায়গা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। এ নিয়ন্ত্রণের জন্য কারও কাছে দৌড়াতে হবে না। এক হাতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। ইন্টারনেটে যত বড় বিপদ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ পর্নোগ্রাফি। এর থেকে শিশুদের রক্ষা করতে না পারলে বাকি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা যাবে না।

তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, গত দশ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ৯ কোটি হয়েছে। আমরা কী কনটেন্ট দিচ্ছি শিশুদের? দোষ আমাদের। কারণ শিশু উপযোগী কনটেন্ট ইন্টারনেটে আমরা রাখি না। শিশুর পছন্দ, দেশ-সমাজ সম্পৃক্ত এবং মাতৃভাষা সম্পর্কিত কনটেন্ট দরকার। আবার শিশুসহ নাগরিকদের খারাপ কনটেন্ট থেকে রক্ষা করার চেষ্টা আমরা করছি।

মোস্তাফা জব্বার আরও বলেন, রাষ্ট্র শিশুদের জন্য এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ ইন্টারনেট দেয়ার মতো ব্যবস্থা করে তুলতে পারেনি। এর প্রধান কারণ, যে খারাপ কনটেন্টগুলো শিশুদের কাছে পৌঁছায়, তার উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে না। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য।

অনুষ্ঠানে ইউনিসেফের বাংলাদেশি প্রতিনিধি অ্যাডওয়ার্ড বেগবেদার বলেন, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা আমরা শুনেছি। তারা যা বলছে তা পরিষ্কার- ইন্টারনেট একটি নির্দয় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট দিবসে ইউনিসেফ তরুণ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব অনুসরণ করছে এবং অনলাইনে তাদের প্রতি সদয় হতে সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সবার জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ।’ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক সাইমুম রেজা তালুকদার প্রমুখ।

সেমিনারে ‘ডেসিমিনেশন অব ফাইন্ডিংস অব দ্য বেজ লাইন স্টাডি অ্যান্ড পলিসি গ্যাপ ম্যাপিং’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘ইনেসপাইরা’ (ইউনিসেপের রিসার্চ পার্টনার) এর নির্বাহী পরিচালক মুনতাসির তাহমিদ চৌধুরী। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব আইসিটি উন্নয়ন (বিআইআইডি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিদ উদ্দিন আকবার, তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও রাজনীতিক সুফি ফারুক প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সামিরা জুবেরী হিমিকা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×