নরসিংদীতে আগুনে দগ্ধ তিন শিশু

‘ও স্যার বাঁচান’

  শিপন হাবীব ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশু

‘ও স্যার (চিকিৎসক) বাঁচান। শরীর জ্বলতেছে, জ্বালায় মরে যাচ্ছি। একটু পানি দেন, খাব।’ ক্ষতের জ্বালায় অতিষ্ঠ তিন শিশু অস্পষ্ট স্বরে জানাচ্ছিল এমন আকুতি-মিনতি।

সারা শরীর ব্যান্ডেজে মোড়া শিশুরা একটু উপশম, একটু স্বস্তির আশায় বারবার হাত-পা নাড়াচ্ছিল। নরসিংদীর রায়পুরায় মঙ্গলবার রাতে আগুনে দগ্ধ তিন বোন- প্রীতি আক্তার (১০), সুইটি আক্তার (১৩) ও মুক্তামণি (১৫) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তাদের অসহায় আকুতিতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন চিকিৎসক, নার্সরা।

স্বজনদের অভিযোগ, ঘুমন্ত তিন বোনসহ তাদের ফুপু খাতুন নেসাকে (৬৮) পুড়িয়ে মারতেই তাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীদের আগুনে তাদের শরীরের ২৫ ভাগ পুড়ে গেছে। প্রত্যেকের শ্বাসনালিও দগ্ধ হয়েছে।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের অধ্যাপক ডা. মুহম্মদ নওয়াজেস খান যুগান্তরকে জানান, চারজনের শরীর ২৫ শতাংশের নিচে পুড়লেও সবার শ্বাসনালি দগ্ধ হয়েছে। শ্বাসনালি দগ্ধ হওয়ায় কেউই শঙ্কামুক্ত নয়। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট ক্ষতের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছে না শিশুরা।

সুইটিকে মঙ্গলবার ভোরে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। প্রীতি, মুক্তামণি ও খাতুন নেসাকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছি। শ্বাসনালি পোড়া রোগীর অবস্থা যে কোনো সময় খারাপের দিকে যেতে পারে।

আইসিইউতে সুইটি শুধুই গোঙাচ্ছিল। তার শরীরের নানা স্থান ব্যান্ডেজ করা। মুখমণ্ডল খোলা থাকলেও ক্ষত। যন্ত্রণায় তার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। অসহ্য যন্ত্রণায় সে কাঁদছিল। সুইটি বলছিল, ‘সে বাঁচতে চায়। ডাক্তার, নার্সদের উদ্দেশ করে সে বলছিল, আগুনে পোড়া দুই বোন ও ফুপু কোথায়। তাদের কাছে যাব।’ তাকে নার্সরা কিছুতেই বোঝাতে পারছিলেন না। তারা বলেন, তুমি কান্না করো না, জোরে কথা বলো না। কান্না করলে তোমার আরও কষ্ট হবে।

বার্ন ইউনিটের এইচডিইউতে পাশাপাশি বেডে কাতরাচ্ছিল দুই বোন প্রীতি ও মুক্তামণি। তাদের গোঙানিতে চারপাশ ভারি হয়ে ওঠে। অস্ফুট স্বরে তারা আর্তনাদ করছিল। মুক্তামণি বলছিল, তাকে যেন একটু পানি খেতে দেয়া হয়। পাশের বেড থেকে চিৎকার করছিল সবার ছোট প্রীতি।

বড় দুই বোনকে সে বারবার দেখতে চাচ্ছিল। খানিকটা দূরে অগ্নিদগ্ধ শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে ফুপু বিলাপ করছিলেন।

রায়পুরা উত্তর বাখর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিন বোন মুক্তামণি, সুইটি ও প্রীতি একসঙ্গে খেলাধুলা করত, খেত ও ঘুমাত। কিন্তু সন্ত্রাসীদের আগুন তাদের আজ আলাদা করে রেখেছে। প্রীতি ষষ্ঠ ও সুইটি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। মুক্তামণি এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। মুক্তামণির বড় বোন রত্না আক্তার যুগান্তরকে জানান, গত বছর ১৯ ডিসেম্বর তাদের বাবা শামসুল মিয়া মারা গেছেন।

এরপর তাদের মা আনোয়ারা বেগম খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবাকে হারিয়ে তারা এতিম হয়ে পড়েছে। ছোট তিন বোনের সঙ্গে তার ফুপুও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে রত্নার অনুরোধ, তিন বোন ও ফুপুর চিকিৎসার ভার যেন তিনি নেন।

রত্না বলেন, বোনদের কিছু হলে তার মা বাঁচবেন না। তিনি বলেন, জায়গা-জমির বিরোধ নিয়ে এলাকার শিপন, কাজল, রবিন, লোকমানসহ সন্ত্রাসীরা তাদের ঘরে আগুন দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই আগুনে পুড়িয়ে তাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে সন্ত্রাসীরা। কাতর কণ্ঠে তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা, চিকিৎসকদের কাছ থেকে যেন কোনো খারাপ খবর না আসে।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম যুগান্তরকে জানান, রায়পুরায় আগুনে পোড়া চারজনের মধ্যে এক শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদের অবস্থাও শঙ্কামুক্ত নয়। তিনি আরও বলেন, আগুনে পোড়া রোগীতে ঢামেক বার্ন ইউনিট ভরে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×