ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি

বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ জনকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে * হামলার বিচার দাবি ও হানিফের বক্তব্যের সমালোচনা পদবঞ্চিতদের

  ঢাবি প্রতিনিধি ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে ডেকে এ নির্দেশ দেন। গণভবন সূত্র যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, এ সময় ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, উপ-দফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া এবং দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ তালিকায় থাকা ১২-১৫ বিতর্কিত নেতার নাম কালি দিয়ে চিহ্নিত করে তাদের বাদ দেয়ার নির্দেশ দেন। তালিকায় যদি আরও কোনো বিতর্কিত নেতা থাকেন খোঁজখবর নিয়ে তাদেরও বাদ দিতে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে গণভবনে উপস্থিত সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের ব্যাপারে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদেরও অব্যাহতি দেয়ার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে যাদের নামে খুনের মামলা, বিবাহ, মাদক ব্যবসার সংশ্লিষ্টতা, জামায়াত-বিএনপি পরিবার তথা মানবতাবিরোধী পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে তাদেরও চিহ্নিত করে অব্যাহতি দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

এ নির্দেশের পর বুধবার রাত ১২টায় রাজধানীর ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তারা জানান, সদ্যঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদপ্রাপ্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই বাছাই করতে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে, অন্যথায় তাদের পদ শূন্য হবে।

এদিকে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বিতর্কিতদের স্থান দেয়া নিয়ে ক্ষোভ জানাতে গিয়ে নারী নেত্রীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। এ ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বক্তব্যের সমালোচনাও করেছেন তারা। পাশাপাশি মধুর ক্যান্টিনে ডাকসু নেতা ও নারী নেত্রীসহ কয়েকজনের ওপর ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সমর্থকদের হামলার ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে বলেও জানান আন্দোলনকারীরা।

বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এসব দাবি ও সমালোচনা করেন তারা। সোমবার মধুর ক্যান্টিনে নারী নেত্রীদের ওপর হামলা ও শারীরিক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।

অন্যদিকে কমিটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে ছাত্রলীগের নবগঠিত কমিটি ধানমণ্ডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতে পারেনি। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে বুধবার দুপুর ১২টায় এ শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের কথা ছিল। এ বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার কল করা হলেও তারা তা রিসিভ করেননি। পরে সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি ও মধুর ক্যান্টিনে হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান আল নাহিয়ান খান জয় যুগান্তরকে জানান, অনিবার্য কারণবশত জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি জানান, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে মধুর ক্যান্টিনের সোমবারের ঘটনাকে মঙ্গলবার ‘ছোট সাধারণ ঘটনা’ হিসেবে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। তার বক্তব্যের সমালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসুর সদস্য (ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক উপসম্পাদক) নিপু ইসলাম তন্বী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই প্রশ্ন রাখতে চাই, মধুর ক্যান্টিনের ঘটনাটি কোন পর্যায়ে গেলে তাদের মনে হতো এটি একটি বিশাল আকারের ঘটনা? আমাদের আর কতটুকু লাঞ্ছিত করলে তাদের মনে হতো ছাত্রলীগের নারীদের ওপর নির্যাতন হয়েছে?

প্রধানমন্ত্রীর ডাক পেতে পারেন পদবঞ্চিতরা : এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। এ বিষয়ে ডাকসুর সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক অর্থ বিষয়ক উপ-সম্পাদক এবং সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা সিকদার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের একমাত্র অভিভাবক জননেত্রী শেখ হাসিনা। আশা করছি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমরা পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারব। সাক্ষাতের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিতর্কিতদের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা : ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে যারা বিতর্কিত তাদের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন পদবঞ্চিতরা। তারা বলছেন, ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যেসব অপরাধী, বিতর্কিত ও বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুতই তালিকা প্রকাশ করা হবে।

পদপ্রাপ্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে ছাত্রলীগ : সদ্যঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদপ্রাপ্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই-বাছাই করতে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। বুধবার রাতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এ তথ্য জানান।

গোলাম রাব্বানী বলেন, আমাদের গঠনতন্ত্রের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে আমরা তা মানার চেষ্টা করেছি। তারপরও যদি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে (যেমন- বিবাহিত, অছাত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীসহ গঠনতন্ত্রবিরোধী) তাকে আমরা অব্যাহতি দেব। তারা কেউ আমাদের কমিটিতে থাকতে পারবে না। কমিটি ঘোষণার পরে আমরা পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যাদের নামে অভিযোগ পেয়েছি তাদের ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে। এর মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে তাদের অব্যাহতি দেয়া হবে। তাদের জায়গায় যারা ক্লিন ইমেজের রয়েছে, যারা বঞ্চিত হয়েছে তাদের স্থান দেয়া হবে।

এ সময় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ পাওয়া নামগুলো ঘোষণা করেন। তারা হলেন- সহসভাপতি তানজীব ভূঁইয়া তানভীর (বয়স উত্তীর্ণের অভিযোগ), সুরঞ্জন ঘোষ (বয়স উত্তীর্ণ), আরেফীন সিদ্দিকী সুজন (মাদকের অভিযোগ), আতিক রহমান খান (মাদকের অভিযোগ), বরকত হোসেন হাওলাদার (শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ), শাহরিয়ার কবির বিদ্যুৎ (সংগঠনবিরোধী কর্র্মকাণ্ড), মাহমুদুল হাসান তুষার (মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী আদর্শ ধারণ), মাহমুদুল হাসান (সংগঠনবিরোধী কর্র্মকাণ্ড), আমিনুল ইসলাম বুলবুল (মামলা), আহসান হাবীব (চাকরিজীবী), সাদিক খান (বিবাহিত), তৌফিকুল হাসান সাগর (মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরিবার), সোহানী হাসান তিথি (বিবাহিত), রিশি চৌধুরী (বিবাহিত), আফরীন লাবনী (বিবাহিত), মুনমুন নাহার বৈশাখী (বিবাহিত)।

গোলাম রাব্বানী আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা ১৭ জনের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের এ নামগুলো পেয়েছি। ছাত্রলীগের শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজ যারা করেছেন তাদের বহিষ্কার করা হবে জানিয়ে সভাপতি শোভন বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার পর একটি মহল বিভিন্ন মাধ্যমে যে আক্রমণাত্মক ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তা সংগঠনের শৃঙ্খলাপরিপন্থী। ক্ষোভ প্রকাশের জন্য দলীয় ফোরাম রয়েছে। যারা শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদেরও খুঁজে বের করে বহিষ্কার করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ মহানগর ও কেন্দ্রীয় নেতারা। এর আগে বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×