দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান

বিএসটিআই’র ভূমিকায় হাইকোর্টের অসন্তোষ

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন কোম্পানির পাস্তুরিত দুধ, দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য ও পশুর খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) প্রতিবেদন নিয়ে বিএসটিআই প্রশ্ন তোলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। বিএসটিআই’র আইনজীবীকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, ‘আপনারা (বিএসটিআই) কাজ করার দায়িত্ব নিয়েছেন; কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন না। আপনাদের পরীক্ষায় সত্য উদ্ঘাটন হচ্ছে না কেন? শুধু এসি রুমে বসে থাকবেন, তা হবে না। আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু আপনারা পারছেন না কেন?’

মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। বিএসটিআই’র পক্ষে ব্যারিস্টার সরকার এমআর হাসান (মামুন), দুদকের পক্ষে সৈয়দ মামুন মাহবুব, আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হেলেনা বেগম চায়না।

জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রধান অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী এদিন আদালতের তলবে হাজির হন। তিনি তাদের পরীক্ষার প্রতিবেদন হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গোখাদ্য, দুধ, দই ও বাজারে থাকা প্যাকেটের পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগার (এনএফএসএল) একটি জরিপ চালায়। জরিপের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গরুর দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করে এনএফএসএল। ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। গরুর দুধ ও গোখাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে দই সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয় বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটে থাকা তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেট দুধ। গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে কীটনাশক (দুটি নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (চারটি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনএফএসএল। পরীক্ষায় গরুর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ৯৬ শতাংশ দুধে পাওয়া যায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। প্যাকেটে থাকা দুধের ৩১টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে টেট্রাসাইক্লিন পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার যায়। দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়ার কথা জানায় এনএফএসএল। ৫১ শতাংশ নমুনায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।

শাহনীলা ফেরদৌসী প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর বিএসটিআই’র আইনজীবী বলেন, এই প্রতিবেদন যে সত্য, তা প্রমাণ করার সুযোগ কোথায়। তারা তো অন্য কোনো ল্যাবে যাচাই করেনি। তারা নমুনা সংগ্রহ করেছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার থেকে। কিন্তু পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও যশোরে সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদিত হয়। সেখান থেকে তারা কোনো নমুনা সংগ্রহ না করে ঢালাওভাবে বলে দিল দুধে এসব রয়েছে। আদালত তখন বলেন, অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী অভিযুক্ত নন, তাকে আদালতে ডাকা হয়েছে সহযোগিতার জন্য।

এনএফএল’র জরিপ ও পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিএসটিআই’র ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত বলেন, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ল্যাব আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত। এ প্রতিষ্ঠান তার পদ্ধতিতে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য ও পশুখাদ্য পরীক্ষা করেছে। এরপর আদালত শাহনীলা ফেরদৌসীর বক্তব্য শুনতে চাইলে তিনি জানান, ২০১৫ সাল থেকে তারা এই গবেষণা করে আসছেন। গবেষণার ফল ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগানাইজেশন আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ল্যাবের মান অনেক দেশের চেয়েই উন্নত। আমাদের পরীক্ষার ফল ঠিক আছে কি না, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাচাই করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশ করা হয়। এই পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সেটা করা হয়েছে। এখানে শুধুই তিনটি জেলা নয়, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পণ্য রয়েছে। যেমন মিল্কভিটা, প্রাণ, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, স্বপ্ন অর্গানিক, আফতাব ডেইরি মিল্ক, ঈগলু ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের পণ্য সারা দেশেই পাওয়া যায়। সুতরাং বিএসটিআইয়ের দাবি যথাযথ নয়।’

শাহনীলা ফেরদৌসী আরও বলেন, ‘খাদ্যে রাসায়নিক, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসার উপস্থিতি নিয়ে আইসিডিডিআরবি ও সায়েন্স ল্যাবরেটরির প্রতিবেদন ২০১৭ সালেও প্রকাশিত হয়েছে। তা ইন্টারনেটেই রয়েছে। তাই শুধু জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রতিবেদনে ওইসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, এটা ঠিক নয়। আদালত তখন শাহনীলা ফেরদৌসীকে নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) প্রতিবেদন ও তার বক্তব্য হলফনামা আকারে এক মাসের মধ্যে জমা দিতে বলেন। এ পর্যায়ে বিএসটিআইয়ের আইনজীবী যৌথ টিম গঠন করে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার নির্দেশনা চান। আদালত তখন ঢাকাসহ সারা দেশের বাজারে কোন কোন কোম্পানির দুধ ও দুধজাত খাদ্যপণ্যে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক ও সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে, তা জরিপ ও নিরূপণ করে একটি তালিকা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সে প্রতিবেদন দাখিল করেতে নির্দেশ দেন। ২৩ জুনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর দেখে ১১ ফেব্রুয়ারি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×