কলেজছাত্রী আঁখি হত্যা

ধর্ষণের পর খুন করে মামাতো ভাই

আদালতে জবানবন্দি

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শিপন হাবীব

কলেজছাত্রী আঁখি আক্তার আপন মামাতো ভাই তরিকুল ইসলাম ওরফে রায়হানের (২৭) হাতে খুন হয়েছেন। ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে রায়হান। শনিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে রায়হান। ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশের পার্কিং এলাকা থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে আঁখির লাশ উদ্ধার করা হয়।

বাবা-মা বিদেশে থাকায় আঁখি রাজধানীর পল্লবীতে মামা রোকন খানের পরিবারের সঙ্গে থেকে কলেজে পড়াশোনা করতেন। একই বাসায় মামাতো ভাই রায়হানও স্ত্রী হাসনা হেনাকে নিয়ে থাকত। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন ফারুক যুগান্তরকে জানান, আঁখিকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে রায়হান আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। রাজধানীতে তেলের ডিস্টিবিউটারের কাজ করে রায়হান। তাকে মাদারীপুরের কালকনি এলাকা থেকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়।

জবানবন্দিতে রায়হান বলে, তাদের বাসায় থেকে পল্লবী মহিলা ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করে আসছিল আঁখি। ঘটনার দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালের দিকে তার চাচি (রোকন খানের স্ত্রী) গার্মেন্টে চলে যান। চাচা রোকন খান ও ফুফাতো ভাই মিন্টুও বাসার বাইরে চলে যান। তিনদিন আগে রাজধানীর ভাসানটেকে বাবার বাড়িতে তার স্ত্রী হেনাও বেড়াতে যাওয়ায় সেই সময় বাসায় সে ও আঁখি ছাড়া কেউ ছিল না। রুমে আঁখিকে একা পেয়ে সে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের সময় আঁখি চিৎকার করে এবং এ ঘটনা সবার কাছে বলে দেয়ার হুমকি দেয়। তখন আঁখিকে সে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। রায়হান জানায়, আঁখির গলা থেকে সোনার চেইন ও কানের দুল খুলে নেই। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধও করে দেই। ঘরে লাশ রেখে কালশী বস্তিতে গিয়ে বন্ধু আকাশের কাছে ৬ হাজার টাকায় চেইন ও দুল বিক্রি করি। এরপর মিরপুর-১১ নম্বর থেকে একটি কালো ট্রাভেলিং ব্যাগ ও একটি ছোট তালা কিনে বেলা ১১টার দিকে বাসায় যাই। কাঁথা ও বস্তা দিয়ে পেচিয়ে আঁখির লাশ ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলি। ব্যাগে চেইন লাগিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেই। দুপুর দেড়টার দিকে ব্যাগটি নিয়ে একটি রিকশা করে ইসিবি চত্বরে যাই। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে পার্কিং এলাকায় দুপুর আড়াইটার দিকে যাই। সিএনজি থেকে নামাতে গিয়ে ব্যাগ নিচে পড়ে যায়। এতে লাশের পায়ের অংশ কিছুটা বের হয়ে যায়। তখন সেটি সেখানে রেখে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পল্লবীর বাসায় চলে আসি।

রায়হান জানায়, এর আগে ওই দিন সকালের দিকে কালশী চত্বরে আঁখির বন্ধু সাব্বির তার খবর জানতে চান। আঁখির মোবাইল ফোন বন্ধ কেন তাও তিনি জানতে চান। ওই সময় আঁখির মোবাইল ফোনটি আমার পকেটেই ছিল। বিকালের পরপরই তার স্ত্রী হেনা, বাবা মো. নুরুল ইসলাম, বড় ভাই মিন্টু ও চাচা রোকন আঁখিকে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তাদের সঙ্গে আমিও আঁখিকে খোঁজা শুরু করি। রাত ১টার দিকে বাবা ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে পল্লবী থানায়

যাই। নিখোঁজের জিডি করেন চাচা রোকন খান।

রায়হান বলে, ‘পরের দিন সকালে পুনরায় বাবাকে নিয়ে পল্লবী থানায় গিয়ে আঁখির একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে আসি। ওসিকে বলি, তার বোন আঁখিকে যেন খুঁজে বের করে দেন। ওই দিন দুপুরে খবর পাই আঁখির লাশ ঢাকা রেলওয়ে থানা উদ্ধার করেছে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আঁখির লাশ শনাক্ত করি। ওই দিন রাত ৮টার দিকে আঁখির মোবাইল ফোন অনলাইনে এক ক্রেতার কাছে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেই। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে মাদারীপুর কালকিনি থানার আণ্ডারচর গ্রামে দাদার কবরের পাশে আঁখির লাশ দাফন করা হয়। কবর দেয়ার সময় আমি সেখানে ছিলাম।’

রায়হান বলে, ‘আঁখির বাবা আরিফ হোসেন বিদেশ থেকে এলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে বাসায় নিয়ে যাই এবং তাকে সান্ত্বনা দেই। ১ মার্চ আঁখির বাবাকে নিয়ে তার কবর জিয়ারত করাই। পুলিশ ও আঁখির পরিবার যাতে সন্দেহ না করে সেই কারণে অত্যন্ত সচতুরভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য এসব করি।’

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ ইয়াসিন ফারুক যুগান্তরকে জানান, ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটায় আঁখির লাশ বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে জিডি অ্যান্ট্রি ও সন্দেহজনকদের আটকের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হয়। আঁখির বন্ধু সাব্বিরের জবানবন্দি অনুযায়ী রায়হানকে মাদারীপুর জেলা থেকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, খুনি রায়হান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পুরো ঘটনাটি পাশ কাটিয়ে যেতে চাচ্ছিল।