স্বজনের আহাজারিতে ভারি ঢামেকের বার্ন ইউনিট
jugantor
কেরানীগঞ্জে কারখানায় আগুন
স্বজনের আহাজারিতে ভারি ঢামেকের বার্ন ইউনিট

  ইকবাল হাসান ফরিদ  

১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দগ্ধদের গোঙানি আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বাতাস। দগ্ধদের ঝলসানো মুখ দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা। মানুষগুলোকে বাঁচাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দগ্ধ মানুষগুলো হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। পাশে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে কোনো কোনো স্বজনকে।

বার্ন ইউনিটের ৫ তলার একটি বেডে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন শ্রমিক জাকির হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কেরানীগঞ্জের চুননকুটিয়ায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বুধবার বিকালে কারখানার একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বুস্টারে (সিলিন্ডারের মাথায়) আগুন জ্বলতে দেখেন তিনি। জাকির হোসেন বলেন, আগুন দেখে আমি চিৎকার দিয়ে বলি সিলিন্ডারে আগুন ধরে গেছে। আমি নিজেও নেভানোর চেষ্টা করি। ২-৩ মিনিটের মাথায় সিলিন্ডারটি বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়। এ কারখানায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর অনেকেই কারখানা থেকে বের হয়ে যান। আর আমরা যারা ভেতরে ছিলাম তারা ঝলসে গেছি।

এ কারখানায় কাজ করতেন আলমগীর ও আবদুর রাজ্জাক নামে দুই ভাই। দু’জনেই ঝলসে গেছেন। ঢামেক বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগে তাদের ড্রেসিং চলছিল। আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আহাজারি করছিলেন আলমগীরের বোন মোরশেদা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তারা ৪ ভাই, ৩ বোন। দুই ভাই কাজ করতেন এ প্লাস্টিক কারখানায়। তাদের আয়ে সংসার চলে। তিনি হাউমাউ করে বলেন, আমার ভাই বাঁচবে তো। ড্রেসিং শেষে দগ্ধদের প্রথমে সারি সারি করে রাখা হয় বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগের সামনের মেঝেতে পাতা বিচানায়। পরে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ওয়ার্ডে।

সন্ধ্যার পর ৫ তলার ওয়ার্ডে দেখা যায়, দগ্ধ আলমগীরের মাথার কাছে বসে কাঁদছেন তার স্ত্রী রুমা আক্তার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কারখানার কাছেই তাদের বাসা। দুপুরে আলমগীর ডিউটি থেকে এসে বাসায় খাবার খান। ডিউটিতে যাওয়ার এক ঘণ্টার মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, আরও বেশ কয়েকবার এ কারখানায় আগুন লেগেছে। বার্ন ইউনিটের অবজারভেশনে রাখা হয়েছে দগ্ধ দুর্জয় দাসকে। তিনি, কারখানার মালামাল ডেলিভারি শাখায় কাজ করেন। তার বোন নয়নতারা যুগান্তরকে বলেন, ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করত দুর্জয়। তার আয়েই চলে সংসার। ভাইয়ের দুর্ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। বার্ন ইউনিটে দগ্ধদের আর্তনাদে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি আগতরা। এদিকে বার্ন ইউনিটে একসঙ্গে এত রোগী আসায় প্রশাসনের নির্দেশক্রমে তাদের সেবায় হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগ থেকেও ছুটে আসছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সহায়তা করছেন ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারাও। রোগীদের চিকিৎসায় যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য তৎপর ছিলেন কর্তব্যরতরা।

বার্ন ইউনিটের এক কর্মচারী জানান, সন্ধ্যার দিকে একসঙ্গে ৩-৪ জন দগ্ধ ব্যক্তি আসেন। এরপরই একে একে আসতে থাকেন দগ্ধ রোগীরা। এদিকে খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন ছুটে আসেন বার্ন ইউনিটে। তার নির্দেশনাতেই বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়রা একযোগে দগ্ধদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আসেন শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. আবুল কালাম। তিনি বলেন, রোগীদের খোঁজ নিতে এসেছি। অধিকাংশ রোগীরই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। প্রত্যেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

এ ছাড়া খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, কারখানাটি অননুমোদিত ছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় ৩২ জন বার্ন ইউনিটে ভর্তি। আর ঘটনাস্থলে মারা গেছেন একজন।

এদিকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে নিহত ওই ব্যক্তির লাশ ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়েছে। লাশটি মর্গে রাখা হয়েছে। তবে তার পরিচয় পাওয়া যায়নি।

কেরানীগঞ্জে কারখানায় আগুন

স্বজনের আহাজারিতে ভারি ঢামেকের বার্ন ইউনিট

 ইকবাল হাসান ফরিদ 
১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দগ্ধদের গোঙানি আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বাতাস। দগ্ধদের ঝলসানো মুখ দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা। মানুষগুলোকে বাঁচাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দগ্ধ মানুষগুলো হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। পাশে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে কোনো কোনো স্বজনকে।

বার্ন ইউনিটের ৫ তলার একটি বেডে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন শ্রমিক জাকির হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কেরানীগঞ্জের চুননকুটিয়ায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বুধবার বিকালে কারখানার একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বুস্টারে (সিলিন্ডারের মাথায়) আগুন জ্বলতে দেখেন তিনি। জাকির হোসেন বলেন, আগুন দেখে আমি চিৎকার দিয়ে বলি সিলিন্ডারে আগুন ধরে গেছে। আমি নিজেও নেভানোর চেষ্টা করি। ২-৩ মিনিটের মাথায় সিলিন্ডারটি বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়। এ কারখানায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর অনেকেই কারখানা থেকে বের হয়ে যান। আর আমরা যারা ভেতরে ছিলাম তারা ঝলসে গেছি।

এ কারখানায় কাজ করতেন আলমগীর ও আবদুর রাজ্জাক নামে দুই ভাই। দু’জনেই ঝলসে গেছেন। ঢামেক বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগে তাদের ড্রেসিং চলছিল। আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আহাজারি করছিলেন আলমগীরের বোন মোরশেদা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তারা ৪ ভাই, ৩ বোন। দুই ভাই কাজ করতেন এ প্লাস্টিক কারখানায়। তাদের আয়ে সংসার চলে। তিনি হাউমাউ করে বলেন, আমার ভাই বাঁচবে তো। ড্রেসিং শেষে দগ্ধদের প্রথমে সারি সারি করে রাখা হয় বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগের সামনের মেঝেতে পাতা বিচানায়। পরে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ওয়ার্ডে।

সন্ধ্যার পর ৫ তলার ওয়ার্ডে দেখা যায়, দগ্ধ আলমগীরের মাথার কাছে বসে কাঁদছেন তার স্ত্রী রুমা আক্তার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কারখানার কাছেই তাদের বাসা। দুপুরে আলমগীর ডিউটি থেকে এসে বাসায় খাবার খান। ডিউটিতে যাওয়ার এক ঘণ্টার মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, আরও বেশ কয়েকবার এ কারখানায় আগুন লেগেছে। বার্ন ইউনিটের অবজারভেশনে রাখা হয়েছে দগ্ধ দুর্জয় দাসকে। তিনি, কারখানার মালামাল ডেলিভারি শাখায় কাজ করেন। তার বোন নয়নতারা যুগান্তরকে বলেন, ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করত দুর্জয়। তার আয়েই চলে সংসার। ভাইয়ের দুর্ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। বার্ন ইউনিটে দগ্ধদের আর্তনাদে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি আগতরা। এদিকে বার্ন ইউনিটে একসঙ্গে এত রোগী আসায় প্রশাসনের নির্দেশক্রমে তাদের সেবায় হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগ থেকেও ছুটে আসছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সহায়তা করছেন ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারাও। রোগীদের চিকিৎসায় যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য তৎপর ছিলেন কর্তব্যরতরা।

বার্ন ইউনিটের এক কর্মচারী জানান, সন্ধ্যার দিকে একসঙ্গে ৩-৪ জন দগ্ধ ব্যক্তি আসেন। এরপরই একে একে আসতে থাকেন দগ্ধ রোগীরা। এদিকে খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন ছুটে আসেন বার্ন ইউনিটে। তার নির্দেশনাতেই বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়রা একযোগে দগ্ধদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আসেন শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. আবুল কালাম। তিনি বলেন, রোগীদের খোঁজ নিতে এসেছি। অধিকাংশ রোগীরই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। প্রত্যেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

এ ছাড়া খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, কারখানাটি অননুমোদিত ছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় ৩২ জন বার্ন ইউনিটে ভর্তি। আর ঘটনাস্থলে মারা গেছেন একজন।

এদিকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে নিহত ওই ব্যক্তির লাশ ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়েছে। লাশটি মর্গে রাখা হয়েছে। তবে তার পরিচয় পাওয়া যায়নি।