অনুদানের চেক গ্রহণকালে প্রধানমন্ত্রী

বাঙালিরা কখনও হারেনি আমরা হারব না

পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে

  বাসস ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ভয় না পেয়ে জনগণকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এ দুর্যোগকালে দিনমজুর এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেয়া জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যারা খেটে খাওয়া মানুষ, দিন এনে দিন খান, দিনমজুর শ্রেণি, তাদের কাছে আমাদের খাদ্য পৌঁছে দেয়া একান্ত জরুরি। তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলব ঘাবড়ালে চলবে না। এ অবস্থার মোকাবেলা করতে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সেভাবেই সবাইকে চলতে হবে, যাতে আমরা দেশের জনগণকে সুরক্ষিত করতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘অনেক বন্ধুপ্রতিম দেশ আমাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চাচ্ছে এবং আমরা সেই সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত।’

শেখ হাসিনা রোববার বিকালে তার তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে (পিএমও) প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুদানের চেক গ্রহণকালে ভাষণে একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন প্রান্ত থেকে ওই অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। তার মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পিএমওতে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। যে কোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার মতো শক্তি ও সাহস আমাদের রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই এখন গ্রামে চলে গেছেন। তারা এখন বসে না থেকে যার যেখানে যতটুকু জমি আছে সেই জমি যাতে অনাবাদি না থাকে। তাতে ফসল ফলান। তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘এ করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের একটি সন্তুষ্টির বিষয় হচ্ছে- আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর, মানুষগুলো কর্মঠ, আমাদের খাদ্যের কোনো সমস্যা হবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাটি ও মানুষ মিলে যদি আমরা কাজ করি তাহলে নিজেদের খাদ্য নিজেরাই জোগাড় করতে এবং অন্যকেও আমরা সহযোগিতা করতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ যারা সহযোগিতা চেয়েছে তাদেরও সহযোগিতা করতে পারব। সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে এবং মানবিক কারণেই আমরা তা করব। শুধু নিজেদের দেশ নয়, অন্য দেশেরও যদি কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে সেদিকে আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি দেব।’ শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালিরা কখনও হারেনি, আমরা হারব না, এ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সবাইকে চলতে হবে। সেজন্য নিজেকে যেমন সুরক্ষিত রাখতে হবে, তেমনি অপরকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।

তিনি বলেন, অন্যের প্রতিও আমাদের দায়িত্ববোধ রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ নিয়ে চললে ইনশাআল্লাহ আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আর কোনো করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। গতকালও আমরা সেটা দেখেছি। এটা ভালো লক্ষণ- এ অবস্থা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই দোয়া করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের এ মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করেন। শুধু আমরাই নই, বিশ্বব্যাপী যে অবস্থা- সবাইকে যেন তিনি সুরক্ষিত করেন।’

প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস সম্পর্কে বলেন, ‘বিশ্বজুড়েই এটি ঘাতকের মতো আবির্ভূত হয়েছে। অবশ্য সুস্থ হয়ে যাচ্ছে মানুষ, তবে অতীতে কখনও এরকম হয়নি। আর এ ধরনের পরিস্থিতি শত বছরে একবার করে আসে। যা অতীতেও দেখা গেছে।’ ১৭২০ সালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্লেগ, ১৮২০ এবং ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ছড়িয়ে পড়া মহামারীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কারণে সারা বিশ্বই যেন আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে, থেমে গেছে।’ নিজে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চেক গ্রহণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিয়ম করলে (সবাইকে ঘরে থাকার) নিজেকেও তো তা মানতে হয়। নিজেই যদি না মানি তাহলে সবাইকে মানতে বলব কীভাবে?’

নিজের জন্য না হলেও পারিপার্শ্বিক লোকজন এবং নিরাপত্তা কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই এদিন বিশেষ ব্যবস্থায় চেক গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার পক্ষে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস চেক গ্রহণ করছেন।

তিনি বলেন, অতীতে যদিও এরকম কখনও করিনি, নিজেকে একজন বন্দির মতোই মনে হচ্ছে। যদি আমি অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থাকতে পারতাম তাহলে ভালো হতো। কারণ যারা আজকে এসেছেন অতীতে দেশের যে কোনো দুর্যোগে তারা সব সময়ই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আমি নিজে উপস্থিত থেকেই গ্রহণ (অনুদান) করেছি।

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবেলায় সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার যে আহ্বান জানান তাতে সাড়া দিয়ে আজ যে সব প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার বিস্তার যাতে না হয় সেজন্যই আমরা বাংলাদেশে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবং সেটা অব্যাহত রাখছি। তিনি বলেন, তার সরকার এ রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাসহ একটার পর একটা পদক্ষেপ নিয়েছে এবং দেশের উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় ও দেশের মানুষ যাতে আর্থিকভাবে কষ্ট না পায় সে ব্যবস্থাও করেছে। তিনি সরকারি ছুটি ঘোষণার প্রসঙ্গে বলেন, সবাই ঘরে থাকবে এবং কোনো কাজ থাকলে ঘরে বসে করবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে একটু দূরত্ব বজায় রাখবে, যাতে মানুষে মানুষে সংক্রামিত হতে না পারে।

কিছু প্রবাসীরা হঠাৎ দেশে চলে আসায় যেসব জায়গায় এই রোগের লক্ষণ দেখা গেছে তার বিস্তার রোধে তার সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটার বিস্তার যাতে না হয় সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা বাংলাদেশে নিতে সক্ষম হয়েছি এবং প্রথমে সচেতনতা সৃষ্টির পর ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বলতে গেলে সেই জানুয়ারি থেকেই আমাদের এ পদক্ষেপগুলো চলছে।’ তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় মালিক-শ্রমিক একযোগে বসে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা চালাতে (শিল্প কারখানা) পারবেন, তবে তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী নিুবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষদের খাদ্যভাবের আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, অনেকেই আছেন যারা দিন এনে দিন খেয়ে চলতে পারেন। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা এতো ভালো নয় যে, তারা জিনিসপত্র জমা করে রাখবেন এবং দিনের পর দিন চলতে পারবেন। কাজ না করে বসে থাকলে তারা তো চলতে পারবেন না। কাজেই দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলার ফলে তারা ইতিমধ্যেই খুব কষ্টে আছেন। এসব দুর্গত মানুষদের সহযোগিতার জন্য তার সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই খাদ্য সাহায্য পাঠিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভিজিডি, ভিজিএফ, সরকারের বৃত্তি এবং উপবৃত্তি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকবে। এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে দিন মজুর ও খেটে খাওয়া শ্রেণির জনগণের একটি তালিকা প্রণয়নেরও নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘দিন মজুরদেরও একটি তালিকা করতে হবে এবং তাদের মাঝেও আমাদের খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে।’

সরকার প্রধান বলেন, ‘কারণ মানুষকে শুধু ঘরে আটকে রাখলে হবে না তাদের খাদ্য এবং জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কাজেই সেদিকে আপনাদের বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার।’ এদিন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থা তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদিনের বেতন এবং বৈশাখী উৎসব ভাতার অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়েছে।

এরমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব পদবির সদস্যদের একদিনের বেতনের পাশাপাশি সেনা কল্যাণ সংস্থা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট ও ট্রাস্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় সব নৌ সদস্যদের এক দিনের বেতন ও নৌবাহিনী পরিচালিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হতে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সব বিমান সেনাদের একদিনের বেতন বাবদ এক কোটি ২০ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বেতনের টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপ অব কোম্পানি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ সহায়তাসহ পিপিই সামগ্রী দিয়েছে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত