জাপানের করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব অবাক

বয়স্ক মানুষ বেশি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর সংখ্যা কম

  সালমান রিয়াজ ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের বাইরে থাইল্যান্ডের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে জাপানে করোনাভাইরাস থাবা বসায়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং বিপুলসংখ্যক বয়স্ক নাগরিকের দেশ হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে ছিল জাপান। দেশটিতে করোনায় বহু মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু সব অনুমানকে উল্টে দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সফল হয়েছে জাপান। অবাক করে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া বন্ধ করতে জাপানকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়নি। বিশেষজ্ঞদের উপদেশ উপেক্ষা করে ভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত হওয়ার আগেই স্কুল-কলেজ বন্ধ, গণজমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। এছাড়া করোনার লক্ষণ দেখা দিলেই অতিরিক্ত মাত্রায় পরীক্ষার কারণে দেশটি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।

জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৪ জানুয়ারি চীনের উহান শহর থেকে ফেরা এক জাপানি নাগরিকের প্রথম করোনা সংক্রমণের খবর দিয়েছিল। এরপর থেকে জাপানে রোগের সংক্রমণ এড়াতে কী করা যায়, তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন সংগঠন ও কার্যালয় পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করে টোকিওর পাশের ইয়োকোহামা বন্দরে নোঙর করা প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাপানের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে পর্যটক আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। তার আগে উহান ও আশপাশের কয়েকটি শহরে অবস্থানরত জাপানি নাগরিকদের বিশেষ বিমানে করে দেশে ফিরিয়ে আনে। দেশে ফিরে আসা জাপানিদের কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থাও নিয়মানুযায়ী করা হয়। এসবই ছিল প্রথম দিকে নেয়া সঠিক এবং সময়োচিত পদক্ষেপ। তবে ডায়মন্ড প্রিন্সেসের অনাহূত ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপ ছিল বিভ্রান্তিকর ও অগোছাল। ৩ হাজার ৭১১ যাত্রী ও ক্রুর মধ্যে ৭১২ জন করোনায় আক্রান্ত হন। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জাপানে বাড়তে শুরু করে এবং সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা। এরপর থেকে সরকারের বিভিন্ন মহল নড়েচড়ে বসে। স্কুল বন্ধ থেকে শুরু করে গণজমায়েত নিষিদ্ধ করার মতো তড়িঘড়ি কিছু পদক্ষেপ কাজে আসে। তারপরও এ মহামারীর হাত থেকে জাপান শুরুতে নিজেকে সেভাবে রক্ষা করতে পারেনি।

পরে নেয়া নানা রকম পদক্ষেপের আলোকে অবশ্য অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় জাপানের সাফল্য এখন একেবারে অবজ্ঞা করার মতো নয়। জাপানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু ডায়মন্ড প্রিন্সেসেরই ৭০০ জনের বেশি। রোববার পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫২ জন। জাপানের মতো বয়স্ক মানুষের সংখ্যাধিক্যের দেশে এ মৃতের সংখ্যা তুলনামূলক যথেষ্ট কম। কারণ, করোনাভাইরাসে বয়স্কদের জীবন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। জাপানের ১২ কোটি ৬৮ লাখ জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরই বয়স ৬০ বছর বা তার চেয়েও বেশি। এ হিসেবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ৭৫ বা তার চেয়ে বেশি। ৩৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপর এবং ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ নাগরিকের বয়স ৬৫ বা তার বেশি। আর পুরো বিশ্বে ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ৭০ থেকে ৭৯ বয়সীদের মৃত্যুহার ৮ শতাংশ। আর ইতালিতে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের গড় বয়স ৬৩ বছর, মারা যাওয়ার হার ১০ শতাংশ। সেই হিসাবে জাপানের বয়স্ক মানুষ বেশি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর সংখ্যা অনেকাংশে কম।

জাপান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হল- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট পেশার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্যানেলের নানা রকম সুপারিশ ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে। প্রথমে পশ্চিম জাপানের ওসাকায় ব্যাপকভাবে করোনা সংক্রমণ দেখা যায়। মূলত ওসাকা ও আশপাশের এলাকায় সংক্রমণের উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানতে পারেন, যেসব কনসার্ট হলে গায়ক এবং দর্শকরা কাছাকাছি অবস্থান করে গান-বাজনার তালে নাচে অংশ নিচ্ছেন, সেখান থেকে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কনসার্টের আয়োজন বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি বিনোদনের জনবহুল জায়গাগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া ওইসব স্থানে যারা গিয়েছেন, তাদের অবিলম্বে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষা করেও সফল হয়েছে জাপান। প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার সন্দেহভাজন নাগরিকের পরীক্ষা করা হয়েছে, যা প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও ২০ গুণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কৈচি নাকানো বলেন, প্রধানমন্ত্রী আবে তার দেশকে রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজক দেশ হওয়ার কারণেও জাপানের এ তৎপরতা একটু বেশিই ছিল।’ যদিও বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী রূপ নেয়ায় অলিম্পিক স্থগিত হয়ে গেছে।

এছাড়া অভিবাদনের ক্ষেত্রে চুমু বা করমর্দনের পরিবর্তে মাথা নোয়ানোর রীতি জন্ম থেকেই শিখে আসেন জাপানিরা। তারা হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার ব্যাপারেও বেশ সচেতন। জাপানে প্রতি বছর ৫৫০ কোটি মাস্ক ব্যবহার করা হয়, যা প্রতি নাগরিকের জন্য বরাদ্দ ৪৩টি। ফলে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরিতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। তবুও নাগরিকদের জন্য নিজেকে জীবাণুমুক্ত রাখার সহজ উপায় সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। এ কাজে সম্প্রচার মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো প্রচলিত প্রচারণার বাইরে অন্যদেরও জড়িত করা হয়।

এ রকম বহুমুখী পদক্ষেপ এবং সেই সঙ্গে নাগরিকদের সহযোগিতামূলক আচরণের কল্যাণে করোনাভাইরাসের বিস্তার সীমিত পর্যায়ে ধরে রাখতে পেরেছে জাপান। এখন পর্যন্ত ভাইরাসের বিস্তার নতুন করে বিপজ্জনক মাত্রায় উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা সরকারের বিশেষজ্ঞ প্যানেল উড়িয়ে দিচ্ছে না। ফলে নজরদারি ব্যবস্থা বহাল রাখা এবং উপদেশ মেনে চলায় নাগরিক সহায়তার আহ্বান জানানো অব্যাহত রেখেছে প্যানেল।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত