অভিভাবকের বিদায়

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিদায় করোনা আক্রান্ত এই সময়ে আমাদের মর্মাহত করেছে, স্তব্ধ করেছে, শোকে কাতর করেছে। এই সময়টা দেশের জন্য বড় বিপর্যয়ের এবং বিপর্যয়ের এ রকম সময়ে যে ক’জন মানুষের কাছে আমরা যেতাম- একটা সমাধান, অন্ততপক্ষে কোন পথে এগোলে সমাধান, তার একটা দিকনির্দেশনা পেতে- তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। জাতির বিবেক বলে পরিচিতি পাওয়া এই শিক্ষক, জ্ঞানসাধক এবং সক্রিয় চিন্তাবিদ সব সংকটকালে দেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিয়ে মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন। করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশকে মানবিক করতে, বৈষম্য ও সামাজিক-সাম্প্রদায়িক বিভেদমুক্ত করতে তার দিকনির্দেশনার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকেই তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনগুলোতে যুক্ত ছিলেন এবং একটি সুন্দর সমাজ ও দেশ গড়ার লক্ষ্যে নিজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন।

নিজের ক্ষেত্র বলতে প্রধান যেটি সেটি ছিল শিক্ষা ও গবেষণা। পাশাপাশি ছিল সংস্কৃতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ার আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী নানা মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণসচেতনতা তৈরি। এসব ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। পাকিস্তানি উপনিবেশের বিরুদ্ধে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির শক্তিকে একত্র করে সংগ্রাম করেছেন- একাত্তরের পর নেমেছেন মনের উপনিবেশ মুক্তির কর্মযোগে। এ কাজটি তিনি করেছেন তরুণদের নিয়ে, বিবেকবান মানুষদের নিয়ে। অনেক সময় প্রতিকূলতা বাড়লে সহকর্মীরা হতাশ হয়েছেন। কিন্তু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কখনও হতাশ হননি। তিনি ইতিহাসের শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। মানুষের ভেতর যে শুভবোধ আছে- যা চারদিকের রূঢ় বাস্তবতা আর অশুভের চাপে মাঝে মধ্যে হারিয়ে যায়- তাতে বিশ্বাস করতেন। এক অসম্ভব প্রত্যয়ী মানুষ ছিলেন তিনি। তার সান্নিধ্যে যারাই গিয়েছেন, তারাই উদ্দীপ্ত আর অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মানুষের মধ্যে শুভচিন্তা জাগাতে তার জুড়ি কমই ছিল।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, যাকে আমি স্যার বলেই সম্বোধন করতাম, ছিলেন একজন আধুনিক মানুষ। এই আধুনিকতাটা পশ্চিম থেকে ধার করা নয়, বরং এ ছিল একই সঙ্গে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক। তিনি বাঙালিয়ানার উদার দৃষ্টি, সংস্কৃতিচিন্তা, স্থানীয় প্রজ্ঞা ও মনীষার পাশাপাশি পশ্চিমের বিজ্ঞানচিন্তা এবং দর্শনের সূত্রগুলো রেখে একটি সমন্বয় সাধন করেছিলেন। এই আধুনিকতা প্রাগ্রসরতা এবং সৃজনশীলতার আরেক নাম। তার মধ্যে কোনো বিভেদবোধ, অসূয়া অথবা রুচির প্রশ্নে কোনো নমনীয়তা কখনও দেখিনি। এক প্রসন্নতা, অসাধারণ রসবোধ, স্বাভাবিক সৌজন্য তাকে সবার কাছে প্রিয় করত।

স্যারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আমার পরিচয়, তাকে তার অসংখ্য গুণগ্রাহীর মতো আমিও শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছি তার ব্যক্তিত্বের কারণে। তার সঙ্গে সময় কাটানোটা ছিল বিরল এক অভিজ্ঞতা। স্যার চলে গেছেন এবং এই শোকের সময়ে তাকে নিয়ে কিছু গুছিয়ে লেখাটা কষ্টকর। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, শেষ সময়ে তার কাছে যাওয়া হল না।

একবার এক ভারতীয় গবেষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলেন আবার কখন দেখা হবে? স্যার বলেছিলেন, এক টেলিফোন দূরত্বে আছি, যখন চাইবেন তখনই। এ কথা মনে পড়ায় বিষণ্নতা আরও বাড়ল। এখন স্যার সব যোগাযোগের বাইরে চলে গেলেন।

তবে তিনি চলে গেলেও তার কাজ তার স্মৃতি তো থেকেই যাবে। সেগুলো থেকেই অনুপ্রেরণা নিতে হবে, সেগুলো থেকেই সামনের পথ খুঁজে নিতে হবে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত