কৃষি অধিদপ্তরের কর্মচারীর দখলে ৪০ কোটি টাকার সম্পদ
jugantor
কোচিং সেন্টার খুলে জালিয়াতি
কৃষি অধিদপ্তরের কর্মচারীর দখলে ৪০ কোটি টাকার সম্পদ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ির অফিস সহকারী আবদুল মালেকের জালিয়াতি আর প্রতারণার শিকার হয়ে শত শত যুবক পথে বসেছে। চাকরি দেওয়ার নামে তাদের কাছ থেকে নানা কৌশলে মালেক কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। চাকরি দেওয়ার বন্দোবস্ত করবেন বলে ‘এমভিশন’ নামে কোচিং সেন্টারও খোলেন। চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে তিনি ভুয়া চুক্তিনামাও করেন। সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত তিনি নিয়েছেন। চাকরি না পেলে কেউ যাতে অভিযোগ করতে পারে সেজন্য ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করা হয়।

র‌্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবদুল মালেকের অন্তত ৪০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে বহু চেষ্টার পর মালেককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে মালেককে গ্রেফতার করে র‌্যাবের একটি দল। এ সময় চাকরির দেওয়ার নামে জাল সনদ-সিলসহ বেশ কিছু আইটি সামগ্রী জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-৪ এর সিইও মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে বলেন, প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র। জঙ্গিবাদ, খুন, ধর্ষণ, নাশকতা এবং অন্য সব অপরাধের পাশাপাশি এসব প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধীদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য র‌্যাব সদা তৎপর।

সূত্র জানায়, গোপন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তেজগাঁও মনিপুরীপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মালেক জালিয়াতির সব ঘটনা স্বীকার করেছেন। তার প্রচারণার কাজ সহায়তাকারী আব্দুর রাজ্জাক, আল-আমিন ও অবিনাশসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ কারণে মালেককে র‌্যাব হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মালেক ১৯৯৩ সালে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় পাশ করেন। স্থানীয় কলেজ থেকে বিকম ও এমকম ডিগ্রি অর্জন শেষে তিনি চাকরিতে ঢোকেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ীতে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে তিনি চাকরি পান। চাকরি পাওয়ার পর থেকে ওই দপ্তরে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন। ২০১০ সালে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২০১৫ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর।

প্রতারণার জগতে প্রবেশ : চাকরি পাওয়ার পর থেকে মালেক নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এজেন্ট নিয়োগ করে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং অধিক সংখ্যক চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি ২০১৬ সালে ‘এমভিশন’ নামে কোচিং সেন্টার চালু করেন। চাকরিপ্রার্থীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কোটা যেমন জেলা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, এতিম কোটা, আনসার কোটা প্রভৃতি তিনি শ্রেণিকরণ করেন। তালিকা করে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে।

স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে টাকা অথবা জমির দলিল জমা রাখার শর্তে চাকরীপ্রার্থীদের সঙ্গে মালেক চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি শেষে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন- লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীর ছবি পরিবর্তন, প্রশ্নফাঁসসহ প্রার্থীকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পাশ করানো হয়। নাগরিক সনদপত্র পরিবর্তন, জন্মসনদ পরিবর্তন, চারিত্রিক সনদপত্র, এতিমখানার সনদপত্র, প্রতিবন্ধী সনদপত্র, চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র পরিবর্তনসহ যেসব জেলায় বেশি সংখ্যক জনবল নিয়োগে উল্লেখ থাকে সে জেলাকে টার্গেট করেন তিনি। জাতীয় পরিচয়পত্রে অনেক জেলার প্রার্থীর ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হতো। কোনো চাকরিপ্রার্থী চুক্তিবদ্ধ টাকা দিতে না পারলে জমা-জমির দলিলের মাধ্যমে প্রার্থীর জমি দখল করে নিতেন তিনি। যারা এ প্রক্রিয়ায় চাকরি পেত জিম্মি করার উদ্দেশ্যে তাদের সব ধরনের কাগজপত্র জমা রাখতেন তিনি। যাতে পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ ঝামেলা করলেই তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি খাওয়ার জন্যও অভিযোগ দিতে পারেন।

স্থাবর অস্থাবর সম্পদ : মালেকের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। এছাড়া ঢাকার ধামরাই থানার ফোর্ডনগর এলাকায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর মনিপুরী পাড়া এবং মিরপুরে ৬০ ফুট এলাকায় তার তিনটি ফ্লাট রয়েছে। এগুলোর আনুমানিক দাম ৩ কোটি টাকা। কুষ্টিয়া সদর থানার বড়িয়া এলাকার জাহান সুপার মার্কেট তার। এছাড়া নিজ গ্রামে তার ২৫ বিঘা জমি ও একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজুমার প্রোডাক্ট কারখানা রয়েছে। কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও চারটি ট্রাক রয়েছে। র‌্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে।

কোচিং সেন্টার খুলে জালিয়াতি

কৃষি অধিদপ্তরের কর্মচারীর দখলে ৪০ কোটি টাকার সম্পদ

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ির অফিস সহকারী আবদুল মালেকের জালিয়াতি আর প্রতারণার শিকার হয়ে শত শত যুবক পথে বসেছে। চাকরি দেওয়ার নামে তাদের কাছ থেকে নানা কৌশলে মালেক কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। চাকরি দেওয়ার বন্দোবস্ত করবেন বলে ‘এমভিশন’ নামে কোচিং সেন্টারও খোলেন। চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে তিনি ভুয়া চুক্তিনামাও করেন। সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত তিনি নিয়েছেন। চাকরি না পেলে কেউ যাতে অভিযোগ করতে পারে সেজন্য ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করা হয়।

র‌্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবদুল মালেকের অন্তত ৪০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে বহু চেষ্টার পর মালেককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে মালেককে গ্রেফতার করে র‌্যাবের একটি দল। এ সময় চাকরির দেওয়ার নামে জাল সনদ-সিলসহ বেশ কিছু আইটি সামগ্রী জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-৪ এর সিইও মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে বলেন, প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র। জঙ্গিবাদ, খুন, ধর্ষণ, নাশকতা এবং অন্য সব অপরাধের পাশাপাশি এসব প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধীদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য র‌্যাব সদা তৎপর।

সূত্র জানায়, গোপন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তেজগাঁও মনিপুরীপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মালেক জালিয়াতির সব ঘটনা স্বীকার করেছেন। তার প্রচারণার কাজ সহায়তাকারী আব্দুর রাজ্জাক, আল-আমিন ও অবিনাশসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ কারণে মালেককে র‌্যাব হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মালেক ১৯৯৩ সালে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় পাশ করেন। স্থানীয় কলেজ থেকে বিকম ও এমকম ডিগ্রি অর্জন শেষে তিনি চাকরিতে ঢোকেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ীতে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে তিনি চাকরি পান। চাকরি পাওয়ার পর থেকে ওই দপ্তরে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন। ২০১০ সালে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২০১৫ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর।

প্রতারণার জগতে প্রবেশ : চাকরি পাওয়ার পর থেকে মালেক নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এজেন্ট নিয়োগ করে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং অধিক সংখ্যক চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি ২০১৬ সালে ‘এমভিশন’ নামে কোচিং সেন্টার চালু করেন। চাকরিপ্রার্থীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কোটা যেমন জেলা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, এতিম কোটা, আনসার কোটা প্রভৃতি তিনি শ্রেণিকরণ করেন। তালিকা করে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে।

স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে টাকা অথবা জমির দলিল জমা রাখার শর্তে চাকরীপ্রার্থীদের সঙ্গে মালেক চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি শেষে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন- লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীর ছবি পরিবর্তন, প্রশ্নফাঁসসহ প্রার্থীকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পাশ করানো হয়। নাগরিক সনদপত্র পরিবর্তন, জন্মসনদ পরিবর্তন, চারিত্রিক সনদপত্র, এতিমখানার সনদপত্র, প্রতিবন্ধী সনদপত্র, চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র পরিবর্তনসহ যেসব জেলায় বেশি সংখ্যক জনবল নিয়োগে উল্লেখ থাকে সে জেলাকে টার্গেট করেন তিনি। জাতীয় পরিচয়পত্রে অনেক জেলার প্রার্থীর ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হতো। কোনো চাকরিপ্রার্থী চুক্তিবদ্ধ টাকা দিতে না পারলে জমা-জমির দলিলের মাধ্যমে প্রার্থীর জমি দখল করে নিতেন তিনি। যারা এ প্রক্রিয়ায় চাকরি পেত জিম্মি করার উদ্দেশ্যে তাদের সব ধরনের কাগজপত্র জমা রাখতেন তিনি। যাতে পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ ঝামেলা করলেই তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি খাওয়ার জন্যও অভিযোগ দিতে পারেন।

স্থাবর অস্থাবর সম্পদ : মালেকের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। এছাড়া ঢাকার ধামরাই থানার ফোর্ডনগর এলাকায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর মনিপুরী পাড়া এবং মিরপুরে ৬০ ফুট এলাকায় তার তিনটি ফ্লাট রয়েছে। এগুলোর আনুমানিক দাম ৩ কোটি টাকা। কুষ্টিয়া সদর থানার বড়িয়া এলাকার জাহান সুপার মার্কেট তার। এছাড়া নিজ গ্রামে তার ২৫ বিঘা জমি ও একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজুমার প্রোডাক্ট কারখানা রয়েছে। কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও চারটি ট্রাক রয়েছে। র‌্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন