গাজীপুরে শুধু সমস্যা আর সমস্যা

  মতিন আবদুল্লাহ ও শাহ সামসুল হক রিপন গাজীপুর থেকে ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জয়দেবপুর থেকে সালনা বাজার পর্যন্ত সড়কের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। পিচ ঢালাই, ইট, খোয়া উঠে ব্যস্ততম এই সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেখে চেনার উপায় নেই এটি পাকা সড়ক, না গ্রামের মেঠোপথ। সোমবার দুপুরে বৃষ্টির সময় ক্ষতবিক্ষত এই সড়কে বড় ধরনের জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী, গার্মেন্টকর্মী, হাসপাতালমুখী রোগী ও কর্মব্যস্ত মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি মাড়িয়ে সড়কটিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা যায়, বনমালা-জয়দেবপুর ১০ কিলোমিটার সড়ক, রাজেন্দ্রপুর থেকে বাংলাবাজার ৪ কিলোমিটার সড়ক, বাংলাবাজার থেকে ভীমবাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়কেও।

শুধু এ চারটি সড়ক নয়, ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ হাজার ৯৬৪ কিলোমিটার সড়কই বেহাল। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এখনও ৬১৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। এই সিটিতে দৈনিক ৯০০ টন আবর্জনা উৎপন্ন হলেও অর্ধেক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে রাস্তার আশপাশসহ বিভিন্ন স্থানে। এসব আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে শহরের ড্রেন, সরকারি-বেসরকারি জলাধার। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখায় জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে। শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য সাতটি খাল থাকলেও দখলদারদের কারণে সেগুলোর অস্তিত্বই হারিয়ে যেতে বসেছে। আর জয়দেবপুর বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে দৈনিক ৬৮-৭০ বার সিগনাল, সড়ক ও ফুটপাতে অবৈধ দখলের কারণে মূল শহরে যানজট মারাত্মক রূপ ধারণ করে। এ কারণে নষ্ট হচ্ছে মানুষের কর্মঘণ্টা। এখনও গড়ে ওঠেনি স্যুয়ারেজ সিস্টেম, সড়কবাতি আছে মাত্র ২০ ভাগ এলাকায়, শহরের সুপেয় পানির ব্যবস্থা আছে মাত্র ১০ ভাগ এলাকায়, যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সিটি কর্পোরেশনে যুক্ত হওয়া ৬টি ইউনিয়নে নাগরিক সুবিধা তো দূরের কথা, এখনও সেখানকার মানুষের গ্রামীণ সুবিধাও নিশ্চিত হয়নি। ওইসব এলাকায় চলাচলের সড়ক, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় গ্রামীণ সুবিধাও ঠিকঠাকভাবে নেই। এককথায়, এই নগরী দারুণভাবে উন্নয়নবঞ্চিত। গত পাঁচ বছরে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম।

নগরবাসী গত পাঁচ বছরে সিটি কর্পোরেশনের জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চেয়ে কোনো প্রতিকার পাননি। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রচারে সেবাবঞ্চিত নগরবাসীর সেবার কথার চেয়ে রাজনৈতিক গলাবাজিই বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স বাংলাদেশের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘বাস্তবতা বিবেচনা না করেই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে অবহেলিত গ্রামীণ জনপদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেসব এলকায় নাগরিক সুবিধা তো দূরের কথা, গ্রামীণ সুবিধাও নেই। সিটি কর্পোরেশনের কিছু এলাকা রাজউক আওতাভুক্ত হলেও সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ কারণে যে যেভাবে পারছে অপরিকল্পিতভাবে শিল্প-কলকারখানা গড়ে তুলছে। এসব বিষয়ে দৃষ্টি না দেয়া হলে গাজীপুর দেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হবে।’

গাজীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক বলেন, ‘একটি সিটি বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই নেই গাজীপুরে। এমন এলাকাকে সিটি কর্পোরেশনভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে নাগরিক সুবিধা তো দূরের কথা, গ্রামীণ সুবিধাও মিলছে না। বর্তমানে গাজীপুর শহরে যানজট, জলাবদ্ধতা, সড়ক ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জনগণের উচিত হবে এমন একজনকে মেয়র নির্বাচিত করা, যিনি এসব সমস্যার সমাধানে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।’

সরেজমিন দেখা গেছে, বনমালা-জয়দেবপুর সড়কের সুকন্দিবাগ, জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ড, শিমুলতলী সড়ক, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, বড়বাড়ী, হ্যারিকেন ফ্যাক্টরি এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে আবর্জনা ফেলে রাখা হয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের কড্ডা এলাকায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন আবর্জনা সংগ্রহ করে সড়ক ও জনপথের জায়গায় রাখছে। এতে করে আশপাশের এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ কারণে মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘গাজীপুরে দৈনিক অন্তত ৯০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। কিন্তু আমরা কোনো রকমে অর্ধেক সংগ্রহ করতে পারছি। সেটাও পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারছি না। এজন্য তিনটি ল্যান্ডফিল এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। নতুন মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করলে, তার কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরব। তিনি এগুলো সমাধানে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প অনুমোদন করতে পারলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, গাজীপুর মূল শহর ও টঙ্গী এলাকায় কিছু নাগরিক সুবিধা থাকলেও কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, গাছা, পুবাইল, কাউলতিয়া ও বাসন ইউনিয়নের সিংহভাগ এলাকা এখনও খালবিল আর কৃষিজমি। ওই এলাকাগুলোর সড়কও বেহাল। ওসব এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে বাড়িঘর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কেউ কোনো ধরনের অনুমোদনের ধার ধারছে না। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের একটি অংশ ড্যাপ আওতাভুক্ত হলেও সেখানে রাজউকের মনিটরিং নেই। এ কারণে ওইসব এলাকার মানুষও অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করছে। আর নতুন করে যুক্ত হওয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা এসব বিষয়ে একেবারে অসচেতন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অনেক সমস্যা রয়েছে। বলা চলে, নতুন করে সবকিছু করতে হচ্ছে। রাস্তাঘাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, যানজট প্রধান সমস্যা। এছাড়াও ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ সিটি কর্পোরেশনের অন্যান্য সেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘গাজীপুর শহরের সমস্যাগুলো এরই মধ্যে আমি চিহ্নিত করেছি। সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বিদেশি পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমাধানের রূপরেখাও তৈরি করেছি। জনগণ আমাকে মেয়র নির্বাচিত করলে গাজীপুর শহরের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করে গাজীপুরকে আধুনিক শহরে রূপান্তরিত করব।’

বিএনপির মেয়রপ্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমি ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত টঙ্গী পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলাম। সেই থেকে এই শহরের উন্নয়ন ও সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। সে কারণে এ শহরের সমস্যার কীভাবে সমাধান করা যায়, তা আমার ভালো জানা আছে। আমি মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে আধুনিক মাস্টারপ্লান তৈরি করে সমস্যার সমাধান করব।’

গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘গাজীপুর শহরের অনেক সমস্যা রয়েছে। সেসব সমস্যার সমাধান করতে দরকার একজন দক্ষ, নিবেদিত ও দুর্নীতিমুক্ত মেয়র। সেই দিক বিবেচনা করে ধানের শীষের মনোনীত মেয়র প্রার্থী অনেক এগিয়ে রয়েছেন। জনগণ তাকে মেয়র নির্বাচিত করলে তিনি গাজীপুর শহরের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করে গাজীপুরকে আধুনিক ও বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করতে সক্ষম হবেন।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘গাজীপুর শহরে যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্যব্যবস্থা, সড়ক সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে যোগ্য, কর্মঠ ও গতিশীল নেতৃত্ব দরকার। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে এ যোগ্যতা রয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে আশা করা যায় সমস্যার সমাধান হবে।’

২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠিত হয়। টঙ্গী ও গাজীপুর পৌরসভার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনভুক্ত করা হয়েছে গাছা, পুবাইল, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বাসন ও কাউলতিয়া ইউনিয়ন। সাবেক এই ৬ ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য গ্রামগুলো হল- লোহাকৈর, পাইনশাইল, বারেন্ডা, ভবানীপুর, সারদাগঞ্জ, গোবিন্দবাড়ী, শৈলডুবী, জরুন, মিরপুর, হরিনাচালা, বাইমাইল, প্রতাবপুর, কোনাবাড়ী, কুদ্দুসনগর, নীলনগর, খোলাপাড়া, জয়েরটেক, বাঘিয়া, আমবাগ, ভোগড়া, আধেপাশা, ইটাহাটা, কন্ডা নান্দুন, বাসন, বারবৈকা, চান্দনা, দিঘীরচালা, ইসলামপুর, বাড়িয়ালী, টেকনগপাড়া, সালনা-উত্তর, সালনা-দক্ষিণ, কাতোরা, মৈশানবাড়ী, বিপ্রবর্থা, কাউলতিয়া, জোলারপাড়, মাস্টারবাড়ী, তিলারগাতি, কলমেশ্বর, ভিটিপাড়া, তেলীপাড়া, দেশীপাড়া, চত্ত্বর, কলমেশ্বর, কামারজুরী, খাইলকুর, মেঘডুবি, বিন্দান, উলোখলা, কুদাব, কুনিয়াপাছর, গাছা, শরীফপুর, ছয়দানা, মালকের বাড়ী এবং সোন্ডা।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৭টি। ৩০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৮ হাজার। এই সিটিতে গত পাঁচ বছর ৩ মাসে ২৩২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ, ১৪৫ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ২০ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়ন, ৬০ কিলোমিটার ড্রেন, ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, ৩ হাজার ৬৩টি সোলার স্ট্রিট লাইন এবং ৪ হাজার ৫০০টি সড়কবাতি স্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য এ উন্নয়ন সিটি কর্পোরেশনের চেহারায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। নগরবাসীর অভিযোগ, যেসব উন্নয়ন কাজ হয়েছে, সেসবও মানসম্মত হয়নি, এ কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি কমেনি। শুধু খরচ হয়েছে সরকারি অর্থ।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.