গাজীপুরে দুই মেয়র প্রার্থীর গণসংযোগ

গ্রেফতার আতঙ্কে রাতে বাসায় থাকছেন না বিএনপি নেতারা

রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ * প্রার্থীদের এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইসি

  কাজী জেবেল ও শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর থেকে ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রেফতার আতঙ্কে রাতে বাসায় থাকছেন না বিএনপি নেতারা

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় যত ঘনিয়ে আসছে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান তত বাড়ছে।

শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এছাড়া কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটকের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

পৌর বিএনপির সভাপতিসহ কয়েক নেতার বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। এসব ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছে দলটি।

এদিকে মেয়র, সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলরদের প্রধান নির্বাচনী এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

এদিকে গ্রেফতার আতঙ্কের মধ্যেই শনিবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রচার চালিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারসহ দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা। অপরদিকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলমও দিনভর প্রচার চালিয়েছেন।

এ সময় তার সঙ্গে থাকা শত শত নেতাকর্মীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীরাও জমজমাট প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।

পুলিশের অভিযান বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৃথক দুটি অভিযোগ করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের নির্বাচনী এজেন্ট শিল্পপতি মো. সোহরাব উদ্দিন। তার স্বাক্ষরিত দুটি লিখিত অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ নেতার নাম উল্লেখ করে বলা হয়- গাজীপুর মহানগর ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুলিশ ঢালাওভাবে গ্রেফতার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, আমি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সোহরাব উদ্দিন জানান, গাজীপুর পৌর বিএনপির সভাপতি মীর হালিমুজ্জামান ননী, টঙ্গী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডার, টঙ্গী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস জিয়াউল করিম স্বপন, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন মরুসহ বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাসা-বাড়িতে শুক্রবার গভীর রাতে তল্লাশি ও হয়রানি চালায় পুলিশ।

গত দু’দিনে মহানগর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আফজাল হোসাইন, গাজীপুর জেলা জিয়া পরিষদের আহ্বায়ক টিভি নাট্য অভিনেতা আশরাফ হোসেন টুলু ও জেলা ছাত্রদল কর্মী উজ্জ্বল, টঙ্গী থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ধানের শীষ প্রতীকের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আকবর হোসেন ফারুক এবং গাজীপুর সদরের বিএনপির কানাইয়া গ্রাম কমিটির সভাপতি ও গ্রাম কেন্দ্রের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আবদুস সোবহানকে আটক করা হয়। এর মধ্যে আবদুস সোবহানকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. আমির হোসেন জানান, মামলা থাকায় টুলু ও ফারুককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের আটকের তথ্য তিনি জানেন না। অপরদিকে গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মো. মোমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মাদকসহ বিভিন্ন মামলার ১৩ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

জয়দেবপুর থানার এএসআই ললিতা জানান, গোয়েন্দা পুলিশ শুক্রবার রাতে মনির হোসেন, সাইফুল ইসলাম, আশরাফ হোসেন, বিল্লাল, আশ্রাফুল রফিক ও মোবাহ নামের ৬ জনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে।

এদিকে প্রচারে অংশ নিয়ে বিভিন্ন পথসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, দলের নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা, গ্রেফতার করে দমিয়ে রাখা যাবে না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমাকে থ্রেট করে লাভ নেই। জীবনে অনেককে মোকাবেলা করেছি। ভোটে আমাকে কেউ হারাতে পারবে তা আমি বিশ্বাস করি না। তিনি কোনাবাড়ির কাদের মার্কেট, কুদ্দুস নগর, কেয়া স্পিনিং, মেডিটেক্স, জেলখানা গেট, মাহবুব সুপার মার্কেট, কলেজ গেটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালান।

এ সময় তার সঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমত আজম খান, গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, গাজীপুর জেলা হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-সম্পাদক মুফতি নাসির উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে হাসান সরকারের পক্ষে প্রচার চালান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মো. নাছির উদ্দিন, সাবেক এমপি মো. হেলালুজ্জামান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কামরুজ্জামান লালু ও মো. সোহরাব উদ্দীন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- গাজীপুর সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুরুজ আহমদ ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ জানান, ২৭নং ওয়ার্ডে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন দেওয়ান, ৩০নং ওয়ার্ডে শাহাজাদা মিয়া, ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে শ্যামা ওয়াহেদ, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারওয়ার, ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুবুর শ্যামল, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট নুরুল কবির শরিফ, আসাদুজ্জামান সোহেল ও হারুনুর রশিদ তপন প্রচার চালান।

২৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলম, স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আলী, ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মুরতাজুল করিম বাদরু, নুরুল ইসলাম নয়ন, প্রভাষক বশির উদ্দিন, রাশেদুল ইসলাম কিরণ, ২৩নং ওয়ার্ডে অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক সাংসদ সেলিম রেজা হাবিব, কেন্দ্রীয় নেতা আনিসুর রহমান, জয়নাল আবদীন তালুকদার গণসংযোগ করেন।

এছাড়া ৫৬, ৫৭ ও ৪৪নং ওয়ার্ডে যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুরতাজুল করিম বাদরু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রচার চালিয়েছেন।

অপরদিকে শনিবার সকাল থেকে দিনভর প্রচার চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় তিনি বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে একটি স্বচ্ছল সমাজ গঠনের উদ্যোগ নেব। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে অগ্রাধিকার দেব।

এর আগে জাহাঙ্গীর নেতাকর্মীদের নিয়ে শুটিংপাড়া হিসাবে খ্যাত নগরীর সাবেক পুবাইল ইউনিয়ন এলাকার ৩৯, ৪০, ৪১ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রচার চালান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মহাজোট নেতারা ছাড়াও স্কুলশিক্ষক, মসজিদের ইমাম এবং স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

তিনি নগরীর ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের সুকুন্দিরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পথসভার মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। পরে হায়দরাবাদ, মেঘডুবি, তালুটিয়া, হারবাইদ মোড়, হারবাইদ নন্দিবাড়ি, মাজুখান, কুদাব, বিন্দান, পুবাইল উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, নওগাঁ, পুবাইল মাদ্রাসা মাঠে পথসভায় বক্তব্য রাখেন।

এ সময় গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মো. আখতারউজ্জামান কয়েকটি পথসভায় বক্তব্য রাখেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. রজব আলী, কাউন্সিলর মো. আজিজুর রহমান শিরিষ, কাউন্সিলর মো. বিল্লাল হোসেন, মহানগর আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো. জাহিদ আল মামুন, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কাশেম, সদস্য আলী হোসেন মাস্টার, মহানগর যুবলীগ যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম, পুবাইল আওয়ামী লীগ নেতা মো. মাসুদ, পুবাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ক্রিড়াবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মোজিবুর রহমান, বন বিভাগের জিপি রেজাউল করিম রেজা, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যাবিষয়ক যুগ্ম-সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন সরকার, পুবাইল ইউনিয়ন সভাপতি আশরাফ হোসেন, মহানগর যুব সংহতির সভাপতি জাকির হোসেন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র টঙ্গী আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামলাল দাস প্রমুখ।

প্রার্থীদের এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইসি : এদিকে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইসি। শনিবার গাজীপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে চারশ’ এজেন্টদের এ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

এ সময় তাদের নির্বাচনী বিধিবিধানের ম্যানুয়েল দেয়া হয়। ইসির নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুক জানান, মেয়র প্রার্থীর পক্ষের চারজন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষের দু’জন ও সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীদের একজন করে এজেন্টদের ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

যাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে তারা স্ব স্ব প্রার্থীর এজেন্টদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেবেন। এতে নির্বাচনী এজেন্টদের গোপনীয়তা রক্ষা হবে। তিনি বলেন, এ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টরা তাদের দায় ও দায়িত্ব বুঝতে সক্ষম হবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশে তাদের আইনানুগ দায়িত্ব কী তা জানতে পারবেন।

ঘটনাপ্রবাহ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×