জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতি ক্রমে প্রস্তাব গৃহীত
jugantor
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতি ক্রমে প্রস্তাব গৃহীত

  সংসদ প্রতিবেদক  

২৬ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার ১৪৭ বিধিতে উত্থাপিত প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এর আগে এর ওপর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দুদিনব্যাপী বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন। বুধবার জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। পরে তিনি নিজেই এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান।

এর আগে ওইদিন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদে স্মারক বক্তৃতা দেন। এতে ৫৯ জন সংসদ সদস্য ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদে ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জন স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্জন তুলে ধরেন। এ সময় বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের সংসদ সদস্যরা বর্তমান সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। আলোচনায় তারা জাতীয় ঐকমত্যের কথাও বলেন। বাংলাদেশের অগ্রগতি কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না : কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে ভিত্তি স্থাপন হয়েছে আগামী প্রজন্মকে সেটাকে অনুসরণ করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের অগ্রগতিকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর আমরা অতিক্রম করছি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। বাংলাদেশ আজ খাদ্য ঘাটতি নয়, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। স্বাধীনতার সময় ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষ, এখন বাংলাদেশে মানুষ সাড়ে ১৬ কোটি। এই সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ খাদ্যের চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণ করতে পারছি এটাই বড় সাফল্য। আমেরিকা বলেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে টিকে থাকবে না। আন্তর্জাতিক সব অনুমানকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।

ইউরোপীয় অনুকরণে বাংলাদেশের উন্নয়ন নয় : ইউরোপীয় অনুকরণে সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন ‘চায় না’ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, আমরা কেবল উন্নত রাষ্ট্র নয়, ২০৪১ সালের মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্র রচনা করতে চাই, যে রাষ্ট্র হবে মানবিকতা ও সামাজিক উন্নয়নের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রে বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিকতার উন্নয়ন হবে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা ইউরোপের অন্ধ অনুকরণে এমন বস্তুগত উন্নয়ন চাই না, যেখানে এক দুর্ঘটনা ঘটলে শত শত গাড়ি পাশ দিয়ে চলে যায়, কেউ খবর রাখে না। ইউরোপের মতো তেমন উন্নয়ন চাই না, যেখানে বাবা-মা বৃদ্ধ হলে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ে হবে আবার ৫০ শতাংশ বিয়ে ভেঙে যাবে- সেই উন্নয়ন চাই না।

খালেদার জন্য বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে বলা হলেও, আনছে না বিএনপি : আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে আমরা বলেছি। কিন্তু তারা সেটা নিয়ে চিন্তা করছে না। কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না। বিএনপির দলীয় সংসদ হারুনুর রশিদ তার বক্তব্যে বলেন, আমি একাধিকবার সংসদ নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বলেছি, আজ ওনার (খালেদা জিয়া) শারীরিক যে অবস্থা ওনাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার অনুমতি দিতে অসুবিধা কোথায়? আপনি তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগটি দিন। এতে আপনি সম্মানিত হবেন।

জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সবাই বলে আমাদের নেত্রীকে এখনই বিদেশে পাঠাতে হবে। ওনার চিকিৎসা করাতে হবে বিদেশে। আমাদের দেশের চিকিৎসা খুব খারাপ। খালেদা জিয়া তিন-তিনবার হাসপাতালে গেছেন। সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। আমরা বলেছি বিদেশ থেকে যদি চিকিৎসক আনতে চান, আনতে পারেন। সেই কথা চিন্তাও করবে না, পদক্ষেপও নিবে না। শুধু বলবে বিদেশ পাঠিয়ে দেন।

বঙ্গবন্ধুর ৬ দফায় ছিল স্বাধীনতার গন্ধ : বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফায় স্বাধীনতার গন্ধ পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পাকিস্তানি হানাদারদের দোসররা তাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর সূর্যের আলো হয়ে আমাদের মাঝে হাজির হলেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি আমাদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ শুরু করেছেন।

আওয়ামী লীগের কাছে ১৪ দলের গুরুত্ব আছে কিনা জানি না : বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধর্ম থাকবে না। কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে অসাম্প্রদায়িক শক্তির কোনো বিকল্প নেই। রাশেদ খান মেনন বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর কথাই বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, রাষ্ট্র বিশেষ কোনো ধর্মের ভিত্তিতে হবে না। রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়, সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধর্ম থাকবে না।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে : জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুবর্ণজয়ন্তীর অলোচনার দিনে অনুরোধ থাকবে আমরা ধর্মকে ইস্যু করব না। এটাকে ইস্যু করে এই সমাজকে অস্থিতিশীল করবেন না। ধর্মকে যারা ইস্যু করছেন, তারা দেশের জন্য কাজ করছেন না। দেশকে অস্থিতিশীল করছেন। এটা অমঙ্গল বয়ে আনবে। দেশের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা ঠিক, ৫০ বছরে দেশ এগিয়ে গেছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শেখ হাসিনা আশ্চর্য প্রদীপ : জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেছেন, আমরা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ পেয়েছি। সেই প্রদীপ হলো শেখ হাসিনা। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, সেগুলো হলো লোহার হাতে দুর্নীতির লাগাম ধরতে হবে। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমানো, বেকারত্ব সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।

এক যুগ ধরে চলছে আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র : বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গণতন্ত্রকে মূলমন্ত্র ধরে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছে। সেই দেশে গত এক যুগে চালু হয়েছে- আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র, সীমিত গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্র। উন্নয়নের গণতন্ত্র নামক উদ্ভূত সব স্লোগান। ঠিক যেমন আইয়ুবের বুনিয়াদি গণতন্ত্র। সামরিক স্বৈরশাসক তার ক্ষমতায় থাকার বয়ান হিসাবে উন্নয়নকে বেছে নিয়েছিল। বর্তমান সরকারও একদমই তাই।

তিনি বলেন, যেকোনো প্রসঙ্গে সত্তরের নির্বাচনের কথা উঠে আসে। আজকেও ভাবতে অবাক লাগে ইয়াহিয়ার মতো একজন সামরিক শাসকের অধীনেও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। যেখানে বঞ্চিত, শোষিত পূর্ব পাকিস্তানের কোনো দল ১৬৭টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটাধিকার প্রয়োগ, নিজের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন, বিনা প্রতিবাদে সেই জয়কে মেনে নেওয়া ছিল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যেটা না হলে একটা দেশ ভেঙে নতুন আরেকটা দেশের জন্ম হতে পারে। মার্কিন একটি সংস্থার প্রতিবেদন তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, আমি দেখি উন্নয়নের বিষে লাল বাংলাদেশ। মার্কিন সংস্থা মিলোনিয়ান চ্যালেঞ্জ করপোরেশন দরিদ্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে চেষ্টা করতে চাওয়া দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন অংকে অনুদান দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ এ ফান্ড পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের ১৬টি ক্ষেত্রে রেড জোনে আছে বাংলাদেশ। আগের বছরগুলোতে ছিল আরো কম। এখন পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।

মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে : মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে স্বাধীন হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট দেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার অঙ্গীকার নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই : কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, তখন কলেজের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হলো। ঘাতকেরা সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করল বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

‘বেহুদারা’ পাকিস্তানকে খেলতে নিয়ে এসেছে : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় দেশের মাটিতে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে এনে খেলার ব্যবস্থা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। তিনি বলেছেন, আমাদের মধ্য কিছু বেহুদা লোক আছে। আমি তাদের বেহুদাই বলব। স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন হচ্ছে, আর পাকিস্তান দলকে এনেছে এখানে ক্রিকেট খেলতে। এগুলো দেখতে হবে। মোতাহার হোসেন বলেন, যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের যে দেশ পছন্দ, সেখানে পাঠিয়ে দিন।

অন্যদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান, মৃণাল কান্তি দাস, শবনম জাহান, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, নাহিদ ইজহার খান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, তানভীর শাকিল জয়, জাতীয় পার্টির ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী, গণফোরামের মোকাব্বির খান, জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান, বিকল্পধারার আব্দুল মান্নান দিনের প্রথম ভাগের আলোচনায় অংশ নেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতি ক্রমে প্রস্তাব গৃহীত

 সংসদ প্রতিবেদক 
২৬ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার ১৪৭ বিধিতে উত্থাপিত প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এর আগে এর ওপর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দুদিনব্যাপী বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন। বুধবার জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। পরে তিনি নিজেই এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান।

এর আগে ওইদিন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদে স্মারক বক্তৃতা দেন। এতে ৫৯ জন সংসদ সদস্য ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদে ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জন স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্জন তুলে ধরেন। এ সময় বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের সংসদ সদস্যরা বর্তমান সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। আলোচনায় তারা জাতীয় ঐকমত্যের কথাও বলেন। বাংলাদেশের অগ্রগতি কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না : কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে ভিত্তি স্থাপন হয়েছে আগামী প্রজন্মকে সেটাকে অনুসরণ করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের অগ্রগতিকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর আমরা অতিক্রম করছি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। বাংলাদেশ আজ খাদ্য ঘাটতি নয়, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। স্বাধীনতার সময় ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষ, এখন বাংলাদেশে মানুষ সাড়ে ১৬ কোটি। এই সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ খাদ্যের চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণ করতে পারছি এটাই বড় সাফল্য। আমেরিকা বলেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে টিকে থাকবে না। আন্তর্জাতিক সব অনুমানকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।

ইউরোপীয় অনুকরণে বাংলাদেশের উন্নয়ন নয় : ইউরোপীয় অনুকরণে সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন ‘চায় না’ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, আমরা কেবল উন্নত রাষ্ট্র নয়, ২০৪১ সালের মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্র রচনা করতে চাই, যে রাষ্ট্র হবে মানবিকতা ও সামাজিক উন্নয়নের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রে বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিকতার উন্নয়ন হবে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা ইউরোপের অন্ধ অনুকরণে এমন বস্তুগত উন্নয়ন চাই না, যেখানে এক দুর্ঘটনা ঘটলে শত শত গাড়ি পাশ দিয়ে চলে যায়, কেউ খবর রাখে না। ইউরোপের মতো তেমন উন্নয়ন চাই না, যেখানে বাবা-মা বৃদ্ধ হলে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ে হবে আবার ৫০ শতাংশ বিয়ে ভেঙে যাবে- সেই উন্নয়ন চাই না।

খালেদার জন্য বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে বলা হলেও, আনছে না বিএনপি : আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে আমরা বলেছি। কিন্তু তারা সেটা নিয়ে চিন্তা করছে না। কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না। বিএনপির দলীয় সংসদ হারুনুর রশিদ তার বক্তব্যে বলেন, আমি একাধিকবার সংসদ নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বলেছি, আজ ওনার (খালেদা জিয়া) শারীরিক যে অবস্থা ওনাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার অনুমতি দিতে অসুবিধা কোথায়? আপনি তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগটি দিন। এতে আপনি সম্মানিত হবেন।

জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সবাই বলে আমাদের নেত্রীকে এখনই বিদেশে পাঠাতে হবে। ওনার চিকিৎসা করাতে হবে বিদেশে। আমাদের দেশের চিকিৎসা খুব খারাপ। খালেদা জিয়া তিন-তিনবার হাসপাতালে গেছেন। সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। আমরা বলেছি বিদেশ থেকে যদি চিকিৎসক আনতে চান, আনতে পারেন। সেই কথা চিন্তাও করবে না, পদক্ষেপও নিবে না। শুধু বলবে বিদেশ পাঠিয়ে দেন।

বঙ্গবন্ধুর ৬ দফায় ছিল স্বাধীনতার গন্ধ : বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফায় স্বাধীনতার গন্ধ পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পাকিস্তানি হানাদারদের দোসররা তাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর সূর্যের আলো হয়ে আমাদের মাঝে হাজির হলেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি আমাদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ শুরু করেছেন।

আওয়ামী লীগের কাছে ১৪ দলের গুরুত্ব আছে কিনা জানি না : বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধর্ম থাকবে না। কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে অসাম্প্রদায়িক শক্তির কোনো বিকল্প নেই। রাশেদ খান মেনন বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর কথাই বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, রাষ্ট্র বিশেষ কোনো ধর্মের ভিত্তিতে হবে না। রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়, সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধর্ম থাকবে না।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে : জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুবর্ণজয়ন্তীর অলোচনার দিনে অনুরোধ থাকবে আমরা ধর্মকে ইস্যু করব না। এটাকে ইস্যু করে এই সমাজকে অস্থিতিশীল করবেন না। ধর্মকে যারা ইস্যু করছেন, তারা দেশের জন্য কাজ করছেন না। দেশকে অস্থিতিশীল করছেন। এটা অমঙ্গল বয়ে আনবে। দেশের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা ঠিক, ৫০ বছরে দেশ এগিয়ে গেছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শেখ হাসিনা আশ্চর্য প্রদীপ : জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেছেন, আমরা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ পেয়েছি। সেই প্রদীপ হলো শেখ হাসিনা। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, সেগুলো হলো লোহার হাতে দুর্নীতির লাগাম ধরতে হবে। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমানো, বেকারত্ব সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।

এক যুগ ধরে চলছে আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র : বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গণতন্ত্রকে মূলমন্ত্র ধরে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছে। সেই দেশে গত এক যুগে চালু হয়েছে- আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র, সীমিত গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্র। উন্নয়নের গণতন্ত্র নামক উদ্ভূত সব স্লোগান। ঠিক যেমন আইয়ুবের বুনিয়াদি গণতন্ত্র। সামরিক স্বৈরশাসক তার ক্ষমতায় থাকার বয়ান হিসাবে উন্নয়নকে বেছে নিয়েছিল। বর্তমান সরকারও একদমই তাই।

তিনি বলেন, যেকোনো প্রসঙ্গে সত্তরের নির্বাচনের কথা উঠে আসে। আজকেও ভাবতে অবাক লাগে ইয়াহিয়ার মতো একজন সামরিক শাসকের অধীনেও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। যেখানে বঞ্চিত, শোষিত পূর্ব পাকিস্তানের কোনো দল ১৬৭টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটাধিকার প্রয়োগ, নিজের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন, বিনা প্রতিবাদে সেই জয়কে মেনে নেওয়া ছিল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যেটা না হলে একটা দেশ ভেঙে নতুন আরেকটা দেশের জন্ম হতে পারে। মার্কিন একটি সংস্থার প্রতিবেদন তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, আমি দেখি উন্নয়নের বিষে লাল বাংলাদেশ। মার্কিন সংস্থা মিলোনিয়ান চ্যালেঞ্জ করপোরেশন দরিদ্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে চেষ্টা করতে চাওয়া দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন অংকে অনুদান দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ এ ফান্ড পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের ১৬টি ক্ষেত্রে রেড জোনে আছে বাংলাদেশ। আগের বছরগুলোতে ছিল আরো কম। এখন পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।

মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে : মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে স্বাধীন হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট দেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার অঙ্গীকার নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই : কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, তখন কলেজের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হলো। ঘাতকেরা সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করল বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

‘বেহুদারা’ পাকিস্তানকে খেলতে নিয়ে এসেছে : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় দেশের মাটিতে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে এনে খেলার ব্যবস্থা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। তিনি বলেছেন, আমাদের মধ্য কিছু বেহুদা লোক আছে। আমি তাদের বেহুদাই বলব। স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন হচ্ছে, আর পাকিস্তান দলকে এনেছে এখানে ক্রিকেট খেলতে। এগুলো দেখতে হবে। মোতাহার হোসেন বলেন, যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের যে দেশ পছন্দ, সেখানে পাঠিয়ে দিন।

অন্যদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান, মৃণাল কান্তি দাস, শবনম জাহান, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, নাহিদ ইজহার খান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, তানভীর শাকিল জয়, জাতীয় পার্টির ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী, গণফোরামের মোকাব্বির খান, জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান, বিকল্পধারার আব্দুল মান্নান দিনের প্রথম ভাগের আলোচনায় অংশ নেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন