কর্মী নিয়োগে আগের পদ্ধতিতে ফিরছে মালয়েশিয়া!

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া

বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী এম কুলাসেগারা সেখানকার জাতীয় দৈনিক ‘দ্য স্টার’কে এমনটি জানিয়েছেন।

দৈনিকটির অনলাইনে শুক্রবার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মন্ত্রী বলেছেন, ‘চলমান প্রক্রিয়াকে স্থগিত ঘোষণা করছি। আবার পুরনো প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে। সরকার এর ব্যবস্থাপনায় থাকবে।’

কুলাসেগারা আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে আগের পদ্ধতিতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আবেদন প্রক্রিয়া সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অভিবাসী কর্মীদের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ ওঠায় এ স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

তবে মালয়েশিয়ার সরকার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানায়নি বলে নিশ্চিত করেছে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশের শ্রম কাউন্সিলর মো. সাইয়েদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়নি।

আমরা প্রতিবেদনটি দেখেছি। সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পেলে বিস্তারিত বলতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে এককভাবে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। কারণ এটি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং এর যেকোনো সমস্যা দুই পক্ষকে বসে ঠিক করতে হবে।’

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি যতদূর জানি তারা আসছে। আর স্থগিতাদেশ দেয়া হলেও বর্তমানে যারা প্রক্রিয়াধীন আছেন (প্রায় ১ লাখ) তাদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না।’

দূতাবাসের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং এটি স্বাভাবিক তারা আগের নিয়মগুলো বুঝবে, জানতে চাইবে এবং গোটা বিষয়টি নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইবে।’ তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশের একজন বন্ধু এবং তার আগের মেয়াদে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

২০১২ সালে দুই দেশ শুধু সরকারি মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে চুক্তি সই করে। ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর সেটিকে পরিমার্জন করে ১০টি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নাজিব রাজাক (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী দ্য স্টারকে বলেন, পূর্ববর্তী প্রশাসন নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপকারের লক্ষ্যে এবং ব্যবসা হিসেবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছিল। এটি জগাখিচুড়ি পদ্ধতি।

এই পদ্ধতি ও দুর্নীতির কারণে অভিবাসী কর্মীদের মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের কিছু লোককে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতো। দশটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় অভিবাসী কর্মী নিয়োগে দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে।

তদন্ত করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করছি। আশা করি খুব দ্রুত এ সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে পেয়ে সমাধান সম্ভব হবে।

দ্য স্টারের মতে, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের আশ্রয় এবং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগে বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা এসেছে। পত্রিকাটির অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের তথ্য জানানো হয়।

তাতে বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি মানব পাচারচক্র মালয়েশিয়ায় শ্রমিকদের কাজ দিয়ে দুই বছরে অন্তত ২০০ কোটি মালয়েশীয় রিঙ্গিত হাতিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে স্থানীয় এজেন্টকে ২০ হাজার করে মালয়েশীয় রিঙ্গিত দিচ্ছে শ্রমিকরা। স্থানীয় এজেন্টরা এর মধ্যে অর্ধেক অর্থ, অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার রিঙ্গিত দিচ্ছে সরকারিভাবে নিবন্ধিত এজেন্টদের হাতে। অথচ একজন শ্রমিক পাঠানোর নথিভুক্তি ও পরিবহনে খরচ হয় ২ হাজার রিঙ্গিতের চেয়েও কম।

২০১৬ সালের শেষের দিক থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১ লাখের বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়া গেছেন কাজের জন্য। এছাড়া আরও লক্ষাধিক শ্রমিক দেশটিতে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ইত্যাদি দেশ থেকে একই ধরনের শ্রমিক পাঠাতে ৫০ হাজার টাকা করে নেয়া হয়।