দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য

এসপি মিজানের সম্পদের পাহাড় দুই মামলা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সার কারখানা, জমি, নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, আলিশান বাড়িসহ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে তার অঢেল সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দুটি মামলা করেছে দুদক। বুধবার দুদকের সহকারী পরিচালক ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন।

তেজগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) মো. সেন্টু মিয়া যুগান্তরকে বলেন, দুপুর ১১টার দিকে এসপি মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী সালমা আক্তার ওরফে নীপা মিজানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রেকর্ড হয়েছে। একটি মামলায় এসপি মিজানকে আসামি করা হয়েছে। অপর মামলায় তিনি ও তার স্ত্রীকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মিজানুর রহমান ১৯৮৯ সালে সার্জেন্ট (এসআই) হিসেবে তৃতীয় শ্রেণীর পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। পরে ১৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে পুলিশে যোগ দিয়ে বর্তমানে পুলিশ সুপার পদে কর্মরত আছেন।

এই সময়ে তিনি নিজ নামে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৮ শতাংশ জমিতে ২ তলা বাড়ি ও ১ হাজার ২৯৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ কৃষিজমি, ঢাকার তেজকুনিপাড়ায় ১ হাজার ৭১৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট ফ্ল্যাটের অর্ধেক অংশ, জুরাইনে একটি দোকান, ঢাকায় ১৫ শতাংশ জমি, রাজউকের উত্তরা তৃতীয় ফেজে ৩ কাঠা জমির মালিক হয়েছেন।

এ ছাড়া দুটি মাইক্রোবাস, আসবাব, ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর), ইলেকট্রনিকস, মেয়ের নামে শেয়ার এবং হাতে ও নগদে প্রায় তিন কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হস্তান্তর/রূপান্তর করে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন।

একজন সরকারি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়ে সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই স্ত্রী, মেয়ে ও বাবার নামে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে রেজিস্ট্রিভুক্ত কেরানীগঞ্জে একটি সার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

ওই প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব আসামি মিজানুর রহমান পরিচালনা করেন এবং প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্বও নিজে পালন করেন। এ ছাড়া নামে-বেনামে মেঘনা ফার্টিলাইজার, মেসার্স খোয়াজ ফার্টিলাইজার কোম্পানি ও ফার্ম নেস্ট অ্যান্ড মিল্ক প্রডাক্টস নামে আরও তিনটি কারখানার মালিক তিনি।

মিজানুর রহমানের স্ত্রী নীপা মিজানের নামেও রয়েছে অঢেল সম্পদ। এজাহারে বলা হয়, ২০০৩ সালে মিজানুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় নীপার। একজন সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হয়ে স্বামীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে রেজিস্ট্রিভুক্ত কেরানীগঞ্জে একটি সার কারখানার মালিক হন তিনি।

তার উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার মিরপুর মাজার রোডে ৫ কাঠা জমির ওপর তিন তলা ভবন, ঢাকার কেরানীগঞ্জে ১০ শতাংশ জমিতে ২ তলা বাড়ি, ঢাকা ও কেরানীগঞ্জে ৬৬ শতাংশ জমি, মিরপুর মাজার রোডে ২ কাঠা জমিতে দোকান, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ৫৩৮ শতাংশ জমি, তেজকুনিপাড়ায় ১৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। এ ছাড়া ব্যবসায়িক মূলধন, হাতে নগদ অর্থসহ অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ।

দুদকের অনুসন্ধান : ২০১২ সাল থেকে মিজানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান হলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও তাকে দায়মুক্তি দিয়েছিল সংস্থাটি। দুদক সূত্র জানায়, ২০১৬ সাল থেকে আবারও অনুসন্ধান শুরু হয় তার বিরুদ্ধে।

নিজের বাড়ি নির্মাণের সময় পুলিশের ৬০ জন সদস্যকে রাজমিস্ত্রির সহকারী বা জোগালির কাজ করানোর অভিযোগ ওঠে মিজানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ছিল, সাভারের হেমায়েতপুরের আলীপুর ব্রিজ-সংলগ্ন ৮৪ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি তৈরি ও ঢাকার মিরপুরের মাজার রোডের আলমাস টাওয়ারের পাশে আরও একটি বাড়ি নির্মাণে জোগালি ও শ্রমিক হিসেবে সাব-ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে দিয়ে কাজ করান মিজানুর রহমান।

সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কাজে খাটানোর অভিযোগ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামেন দুদকের উপপরিচালক এসএম মফিদুল ইসলাম। এর মধ্যে মিজানের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পরে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র আরও বেড়ে যায়।

মিজানের বিরুদ্ধে নকল সার কারখানা পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। এটিও যুক্ত হয় অভিযোগের নথিতে। এর মধ্যে নতুন করে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তিনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মিজান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করলেন।

এসপির নকল সার কারখানা : দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিজান ফসল উৎপাদনে বহুল ব্যবহৃত টিএসপি বা ট্রিপল সুপার ফসফেট সার নকল করার চারটি বড় কারখানা পরিচালনা করেন।

এর মধ্যে দুটি কারখানা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় আর অন্য দুটির একটি ঢাকার অদূরে হেমায়েতপুরে এবং অন্যটি কেরানীগঞ্জে। ওই চারটি কারখানায় প্রতিদিন এক হাজার টন নকল টিএসপি সার উৎপাদন করা হয়, যার দাম প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর এসব সার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয় সরকারি টিএসপি সারের বস্তায় ভরে।

কিছু সার বিক্রি হয় ‘তিউনিসিয়া টিএসপি’ নামে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর দুদক তা আমলে নেয় এবং এ-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে।

এত অভিযোগের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে মিজান : ২০১২ সালে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদক যে অনুসন্ধান করেছে, তখন সংস্থার চারজন কর্মকর্তা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করেও তার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাননি। একাধিকবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন করেও মামলা করার মতো কিছু পায়নি দুদক।

তাই অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে মিজানকে অব্যাহতি দিয়েছিল সংস্থাটি। তবে এ বিষয়ে দুদকেও কানাঘুষা ছিল। প্রভাব খাটিয়ে দুদক থেকে দায়মুক্তির সনদ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছিল।

দুদক সূত্র জানায়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে অনুসন্ধান শুরু হয়।

উপপরিচালক গোলাম মোরশেদ অনুসন্ধান শুরু করলেও পরে আরেক উপপরিচালক ফজলুল হককে দায়িত্ব দেয়া হয়। দু’জনই মিজানুর রহমানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি। পরে আবার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় উপপরিচালক হামিদুল হাসানকে।

হামিদুল হাসানও অভিযোগটি নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেন। এ সুপারিশ অগ্রাহ্য করে উপপরিচালক মো. আবদুস সোবহানকে পুনরায় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয় কমিশন।

দুদকে আসা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৪ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ বছরে তিনি কয়েকশ’ বিঘা স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন। ব্যাংকে তার নগদ অর্থ রয়েছে ১০ কোটি টাকার বেশি। তার স্ত্রীর নামে লাইসেন্স নেয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ বৈধ করেন।

এসব রেকর্ডে মিজানের স্ত্রী নীপা মিজানের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান অনুসন্ধান কর্মকর্তা হামিদুল হাসান। কিন্তু কমিশনের উপর মহল থেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অদৃশ্য ইশারায় অনুসন্ধান নথিভুক্তির সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

সর্বশেষ অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. আবদুস সোবহানের অনুসন্ধান চলার সময় নোটিশ ছাড়াই বেশ কয়েকবার এসপি মিজানুর রহমানকে দুদকে আসতে দেখা যায়। এ সময় তিনি সাক্ষাৎ করেন দুদকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও অনুসন্ধান কর্মকর্তার সঙ্গে। আর এর ফলে পুনঃঅনুসন্ধান প্রতিবেদনেও তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়েরের পরিবর্তে নথিভুক্তির সুপারিশ আসে।