নদী-সাগরে ইলিশের আকাল

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো

ছবি- সংগৃহীত

মৌসুমের শেষ সময়েও নদী কিংবা সাগরে ধরা পড়ছে না ইলিশ। বাকি ক’দিনে ইলিশ ধরা পড়লেও এ খাতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের হাজার হাজার কোটি টাকা উঠবে না। আর মাছ ধরা না পড়ায় উপকূলের লাখ লাখ জেলে পড়েছেন চরম বিপদে। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করাই কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই পেট চালাতে অনেকে রিকশা বা ভ্যান চালাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও লোকসানের মুখে কপালে হাত দিয়ে ঝিমুচ্ছেন। এ বছর কেন ইলিশের অকাল তার কোনো ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে না।

বছরে দু’বার ইলিশের মৌসুম আসে। সবচেয়ে বড় মৌসুম হিসেবে ইলিশ ধরা হয় জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়। এ সময়টা ঘিরেই জমজমাট হয় ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতিনির্ভর দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলো।

একদিকে বর্ষাকাল আর অন্যদিকে ছোটখাটো ঝড়-ঝঞ্ঝার মৌসুম হওয়ায় প্রকৃতি যেন উজার করে ঢেলে দেয় ইলিশ। পানি বিজ্ঞানীদের মতে, ‘এই সময়ে উপকূলীয় এলাকাগুলোয় কমে যায় লবণাক্ততা। বৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা ঢলের পানি সমুদ্রে গিয়ে মেশায় উপকূল ভাগের সমুদ্রে লবণাক্ত পানি থাকে না বললেই চলে।

মিঠা পানির টানে উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে ইলিশ। মোহনা দিয়ে অভ্যন্তর ভাগের নদীতেও প্রবেশ করে ইলিশ। ফলে জেলেদের জালে ধরাও পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে। কিন্তু এবার কেন যেন ব্যত্যয় ঘটেছে এ নিয়মে। মৌসুমের শুরুর দিকে কিছু ইলিশ মিললেও এরপর টানা প্রায় ৪ মাস ধরে মিলছে না ইলিশের দেখা।

বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুরসহ সর্বত্রই বিরাজ করছে এ পরিস্থিতি। মাছের আশায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সাগরে যাওয়া ট্রলারগুলো ফিরে আসছে প্রায় শূন্য হাতে।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুম আকন বলেন, ‘৫-৭ দিনের জন্য একটি ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে পাঠালে জেলেদের বাজার ও জ্বালানিসহ প্রায় লাখ টাকা খরচ হয়। বরগুনা পাথরঘাটার বহু মালিক এভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ট্রলার সাগরে পাঠিয়েছে। কিন্তু প্রায় সবগুলোই ফিরেছে শূন্য হাতে। তার ওপর রয়েছে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গত ২-৩ মাসের মধ্যে কম করে হলেও ২২-২৫ বার ঘূর্ণিঝড়ের সর্তক বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। ফলে মাঝ সমুদ্র থেকে ফিরে এসেছে ট্রলার। একদিকে সাগরে ইলিশের শূন্যতা আর অন্যদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া- সবমিলিয়ে পথে বসার জোগাড় আমাদের।’

বুধবার সাগর থেকে পাথরঘাটায় ফেরা মাছ ধরা ট্রলার এফবি মহসীন আউলিয়ার জেলে আলী মাঝি বলেন, ‘দিনের পর দিন সাগরে জাল ফেলে বসে থেকেও মিলছে না ইলিশ। শূন্য হাতে কূলে ফিরে এসেছি আমরা।’ পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মার্কেটিং কর্মকর্তা আহম্মেদউল্লাহ বলেন, ‘গেল বছর এ সময়ে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ১১-১২শ’ টন ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রে এসেছে সেখানে এখন ২-৩শ’ টনও আসছে না।’ চরদোয়ানীর সাগর মাঝি আসলাম সন্যামত বলেন, ‘পর পর ৩ বার সাগরে ট্রলার পাঠিয়েছিল আমাদের মালিক। প্রতিবারই খালি হাতে ফিরেছি আমরা। এখন ঘাটে বসে আছে ট্রলার। এদিকে ৫ খানেওয়ালার সংসারে খাবারও তো জোগাড় করতে হবে। তাই ক’দিন ধরে ভ্যান চালাচ্ছি। দিনভর রোজগারে যা মিলছে তাই দিয়ে চাল-ডাল কিনে মিটছে পেটের ক্ষুধা।’

ইলিশ না মেলায় চরম বিপাকে পড়েছেন উপকূলের মৎস্য আড়তদাররাও। ফি বছর খরা মৌসুমে জেলেদের দাদন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা দেন এরা। মৌসুমে ইলিশ ধরে ওইসব আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে শোধ হয় দাদন। কিন্তু এবার নদী ও সাগরে ইলিশ না মেলায় ঝুুঁকির মুখে পড়েছে তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বরিশাল মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশেনের সাধারণ সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল বলেন, ‘মোট ১৬৫ জন আড়তদার রয়েছেন বরিশাল ইলিশ মোকামে। তাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি দাদন দেয়া আছে ট্রলার মালিক এবং জেলেদের। কেবলমাত্র বরিশালেই দাদনের পরিমাণ ২-৩শ’ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি পাথরঘাটায় আড়তদারের সংখ্যা প্রায় ১০০। একই সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-আলীপুর-মহীপুর, পিরোজপুরের পাড়েরহাট, বরগুনার আমুয়া, ঝালকাঠি, ভোলা এবং বাগেরহাটসহ উপকূলীয় এলাকার প্রায় সবগুলো মৎস্য বন্দর ও জেলায় রয়েছে অসংখ্য আড়তদার- যারা প্রত্যেক্যেই দাদন দেন। সবমিলিয়ে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এ বছর মৌসুমে ইলিশ না মেলায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিনিয়োগের এ হাজার হাজার কোটি টাকা।’

ইলিশ না মিললে দাদনের টাকা আদায়ের ব্যবস্থা কি- জানতে চাইলে পাথরঘাটা মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘দাদনের বিষয়টি আসলে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। এ মৌসুমে মাছ না পেলে অপেক্ষা থাকে পরবর্তী মৌসুমের। তাই মাছ না মিললে জেলে কিংবা ট্রলার মালিকদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা হবে এমনটা নয়। তবে যারা দাদন খাটিয়েছে তারা পড়বে চরম বিপদে। তাদের অনেকে আছেন জমি বন্ধক কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দাদন দিয়েছেন। সঠিক সময়ে টাকা না উঠলে এদের কারও কারও দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে।’

হঠাৎ ইলিশের এ সংকট সম্পর্কে জানতে চাইলে উপকূলের মৎস্য ব্যবসায়ী এবং জেলেরা বলেন, ‘নদী মোহনাগুলোতে জেগে উঠা অসংখ্য চর ডুবোচরের পাশাপাশি বাংলাদেশি জলসীমায় ভারতীয় শত শত ট্রলারের মাছ ধরার কারণেই এ সংকট। আমরা যেখানে দেশের অভ্যন্তর ভাগে জাটকা নিধন রোধ, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ এবং নিরাপদ জলাশয় স্থাপনসহ নানা নিয়ম মেনে চলছি, এমনকি বছরের প্রায় ৯ মাস কোনো না কোনোভাবে বন্ধ থাকছে আমাদের ইলিশ শিকার সেখানে ভারতীয় জেলেরা আমাদের জলসীমায় ঢুকে শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে ইলিশ। তারা জাটকা, মা ইলিশসহ কোনোটাই বাছ-বিচার করছে না।’

জেলেদের এ বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, ‘ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই বছর একটু কম। এর প্রধান কারণ হচ্ছে প্রবল বৃষ্টিপাত। এছাড়া আমার মনে হচ্ছে ইলিশ শিকারের নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবেশগত কারণে মোহনায় প্রচুর পরিমাণ ৮ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১২-১৪ ইঞ্চি সাইজের ইলিশ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। বিভিন্ন অভিযানে এসব ইলিশ জব্দও করা হয়। যে কারণে এবার ইলিশের পরিমাণ কম। শুধু বরিশালেই এবার ইলিশের পরিমাণ কম দেখা যাচ্ছে। তবে ঢাকা ও ময়মনসিংহ এলাকায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে।’