আ মরি বাংলাভাষা

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহীত উল আলম

ওপরের শিরোনামটি দিয়েছি বটে একুশের মাহাত্ম্যকে সম্মান করতে, কিন্তু খুব যে স্বস্তির সঙ্গে দিয়েছি তা নয়। প্রতি বছরই একুশ এলে কিছু না কিছু একুশকে উদ্দেশ করে লিখি। এবার লিখতে গিয়ে ঘটনাক্রমে হাত পড়ল ২০১২ সালে আমার প্রকাশিত একটি লেখা একুশের ওপর, যেখানে আমি নিশ্চিত প্রত্যয় নিয়ে বলেছি যে মাতৃভাষা সর্বস্তরে প্রচলিত না হলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। এ কথাও খুবই সঠিকভাবে বলেছি যে কিছু শিক্ষিত মানুষ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ চালাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু সর্বমানুষকে অর্থাৎ জনসাধারণকে উন্নতির কাতারে নিয়ে আসতে গেলে বাংলাভাষার সার্বিক প্রচলনের বিকল্প নেই।

কিন্তু ছয় বছর পরে ঠিক এ জোরটাই যেন আমি পাচ্ছি না। কেন পাচ্ছি না তার একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বর্তমান লেখাটি। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম সব সময় বলতেন বাংলাভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা না করলে, বাংলাদেশ কোনোদিন বৈজ্ঞানিক সমাজে রূপান্তরিত হতে পারবে না। সমান্তরাল আরেকটি অনুযোগ বহু আগে করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বলেছিলেন, ‘আগে চাই বাংলাভাষার গাঁথুনি।’ কিন্তু একদিন এক ছাত্রীর বাচ্চাকে এত সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে শুনলাম যে ভাবলাম কে কোন ভাষায় কথা বলছে সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু যে ভাষায় বলছে সেটা শেখার প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এখন আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে মাতৃভাষার মতো সমান দক্ষতায় শিশু অন্য ভাষা শিখতে পারে যদি সে পরিবেশ দেয়া যায়। যদিও ভাষা মানুষের চিন্তার পরিপূর্ণ বাহক নয়, তারপরও ধারণা করা যায় চিন্তার বহিঃপ্রকাশের সময় মাতৃভাষাই মানুষের জন্য পরম মাধ্যম। কিন্তু কথাটা আর বাস্তব মনে হয় না। মাতৃভাষা নয় কিন্তু ভালোভাবে রপ্ত হয়েছে সেরকম ভাষায়ও মৌলিক চিন্তা প্রকাশ করা যায়। কয়েকদিন আগে একজন লেখকের চল্লিশা উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় একজন চাকমা কর্মকর্তার ভাষণ শুনে চমৎকৃত হলাম, এত ভালো বাংলা সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের শেখা হয় না। অমিতাভ ঘোষ, ঝুম্পা লাহিড়ীসহ যেসব ভারতীয় ইংরেজি ভাষার লেখক এখন বিশ্বসাহিত্য মাত করে বেড়াচ্ছেন, তাদের অনেকেই নিজ ভাষায় লিখতেই পারেন না। যেমন আমার ছাত্রী খানিকটা চাপা অহংকার নিয়ে বলেছিল, ‘আমার ছেলে স্যার বাংলা বলতে পারে না, এবং সে জন্য আমি খুব বকা দিই।’ আমার শিক্ষক-জীবন প্রাইভেট আর পাবলিকে মেশানো। দেখেছি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ঠোঁটে লিপজেল মাখার মধ্যে মিল আছে। একটা নামকাওয়াস্তে বাংলাভাষা বা সাহিত্যের ওপর ১০০ নম্বরের কোর্স দেয়া হয় যা পড়ানো বা যাতে পাস করার ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথা থাকে না। আমার এক বন্ধু যখন বাংলা বা ইংরেজি দুটাতেই অনার্স পড়ার সুযোগ পায়, তার এক আত্মীয় বললেন, কি আশ্চর্য বাংলা আবার পড়তে হয় নাকি, ওটাতো নিজেই পড়তে পার। ইংরেজিতে পড়, কত স্মার্ট ভাষা!

কিন্তু একুশের চেতনার একটি মৌলিক বাস্তবায়নযোগ্য দাবি হল সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু করা। বাংলাদেশ হওয়ার অব্যবহিত পরে ইংরেজি পেপারে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে স্নাতক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা পাস করছিল না। তখন ইংরেজি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হল। পরে সম্ভবত তিন বছর পরে সেটি আবার ফিরিয়ে আনা হয়। সম্ভবত অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীই প্রথম যিনি ইংরেজি তুলে নেয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেন একটি শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে মাথায় রেখে। তিনি তখন নতুন দিগন্তের আগে সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন। ওইটির কোন একটি সংখ্যায় বিতর্ক আহ্বান করে তিনি ভূমিকাতে লিখলেন যে গ্রামের ব্যাপক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দুর্বল, কিন্তু তাদের সে জন্য ইংরেজি শিখতে বারণ করে সহজ পথে স্নাতক পাস করানোর অর্থ হচ্ছে হিতে বিপরীত হওয়া। তাদের চাকরির বাজারে আরও অযোগ্য করে তোলা। এটা অর্থাৎ ইংরেজি শেখার আবশ্যকীয়তা যদি শিক্ষা-যোগ-জীবিকার একটি মৌল চাহিদা হয়ে থাকে, স্বীকার করতে হবে যে এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু করা দুরূহ হবে।

সমাজের হালচাল দেখে এটা বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই যে মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে আমরা বিরাট একটা আত্মপ্রবঞ্চনাকে নিশ্চিত প্রত্যয় হিসেবে ধরে নিয়েছি। আমরা দেখছি যে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু রাখা বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই এ ব্যাপারটা নিয়ে জিদ ধরে থাকি। একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখকে যে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব দিবস বলা হয়, সেটা এ জন্যই। সমাজজীবন বলতে যা বুঝি সেটা আসলে কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে না। বাংলা সর্বস্তরে চালু হওয়ার প্রত্যয় যদি একরকমের আবশ্যিকতা হারিয়ে ফেলে তা হলে সমাজ সেটাকে টেনে ধরে রাখবে না, প্রচেষ্টা যত মহতই হোক না কেন। তাই বাংলাভাষা সর্বস্তরে চালু হোক- এটি এখন কেবল রেটরিক বা বাগাড়ম্বর।

একদিন প্রাতঃকালীন হাঁটার সময় বাচ্চাদের স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া অভিভাবকদের গাল-গল্প কানে এলো : ‘ভাবী, বুঝছেন, আমার মেয়েটার হাতের লেখা খুব সুন্দর, কিন্তু ও দুষ্টু, ইচ্ছা করেই বিশ্রি করে লেখে।’ ভদ্র মহিলার কথা আমি সরল অনুবাদ করে নিলাম যে আসলে তার মেয়ের লেখাটা বিশ্রি, তিনি যেভাবেই সেটাকে ঢাকা দিতে চান না কেন। ঠিক সেরকম আসলে বাংলাভাষা সর্বত্র ব্যবহার করতে পারব সেরকম রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে না।

আমি এটা বলছি না যে বাংলাদেশে কোনোদিন ইংরেজি বা আরবি, হিন্দি বা উর্দু বাংলাভাষার স্থান দখল করে নেবে। সেটা কোনোদিন হবে না, হওয়ারও নয়। ইংরেজির প্রবল প্রতিপত্তি সত্ত্বেও আমরা এমন ইংরেজি শিখিনি যে হাটে-বাটে-মাঠে অকাতরে ইংরেজি বলে যাচ্ছি, বা পত্র-পত্রিকা ইংরেজি লেখায় ভুরভুর করছে বা একুশের বইমেলায় ইংরেজিতে বাংলাদেশিদের লেখা বইয়ে স্টল ভরে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামকে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ধর্মতে পরিণত করলেও এমন ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতা আমাদের গ্রাস করেনি যে আমরা বটগাছ ভুলে খেজুর গাছকে পূজা করছি, বা মেঘনা নদী-মাতৃকা পরিবেশের চেয়ে মরুভূমির বালিময় অঞ্চলকে স্বস্তিকর মনে করছি, বা আরবিতে বাতচিৎ করছি। যদিও ইংরেজি বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানকারী ভাষা হিসেবে আমাদের যথেষ্ট উপনিবেশিত করে রেখেছে এবং ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতার দিক থেকে আরবিও খানিকটা চেষ্টা করা শুরু করেছে। এখন ‘কেমন আছেন?’ এ প্রশ্নটা করলে যেটি উত্তর আসে সেটি কিন্তু বাংলা শব্দ নয়। যা হোক, বাংলাদেশের বিরাট সুবিধা এটা যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং হিরন পয়েন্ট থেকে জাফলং কোথাও বাংলাভাষার বিকল্প অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করতে হয় না। সেদিক থেকে বাংলা সর্বস্তরে চালু না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু কারণ আছে, কারণটা দ্বি-মাত্রিক, যদিও পরষ্পরের পরিপূরক।

আমার বেশ কয়েকজন কবি বন্ধু তাদের কবিতাসমগ্র অন্যের কৃত ইংরেজি অনুবাদে বের করেছেন। উদ্দেশ্য, ব্যাপক ইংরেজি বিশ্বপাঠকের কাছে পরিচিত হওয়া। বন্ধুদের এ মনোস্কামনার সঙ্গে ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের নিজের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইংরেজি বিশ্বপাঠকমহলে পরিচিত হওয়ার মিল আছে। এটার অর্থ হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের সময়কার শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজি ভাষা কালক্রমে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বিশ্বভাষায় পরিণত হয়েছে, ফলে আমাদের কবি-লেখকরাও চান ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বিস্তৃত হতে। ঠিক, এর পাশাপাশি আরেকটা ছবি হল, সাংখ্যিক প্রযুক্তির যুগে বিশ্বসমাজের একরৈখিক চেহারা প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ববিদ রোনাল্ডো রিসাল্টো বলছেন, মানব সমাজের নৃতাত্ত্বিকভাবে এক এক গোত্রের নির্দিষ্ট মৌল দেহসৌষ্ঠব থাকলেও, সাংস্কৃতিক দিক থেকে মানবসমাজ কৌম। মানবসমাজ তার মতে ছিদ্রান্বিত, ছিদ্রবিহীনতা তার থাকতে পারে না। হাভার্ডের সংস্কৃতি পাঠের অধ্যাপক হোমি কে ভাবা বলছেন, সমাজ সংজ্ঞায়িত ও বিশেষায়িত হয় কেন্দ্রে নয়, প্রান্তে-সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে, লেনদেন, আদান-প্রদানের মাধ্যমে। আরেকজন নৃতত্ত্ববিদ জন ডিক্সন বলছেন, মানব সমাজ হচ্ছে ট্রেন স্টেশনের লাউঞ্জের মতো। আসা-যাওয়াটাই সত্য, থাকাটা নয়।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিগণিত হওয়ায় বাংলাভাষার ওপর আন্তর্জাতিকতার মাত্রা বেড়ে গেছে, ফলে তার মৌল রূপ থেকে কৌম রূপের দিকে প্রসাারিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু একটা সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে বাংলা ভাষার কৌম রূপের প্রসারণের ওপর প্রচ্ছন্ন একটা ছায়ার মতো প্রভাব বিস্তারিত হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি, যা বাংলাভাষা সর্বস্তরে প্রচলনের বিপক্ষে কাজ করবে। বিষয়টি যতটা না চাক্ষুস তার চেয়ে বেশি আধিপত্যমূলক একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

মুঘল নৃপতি আকবর ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫। ওই একই সময়ে ইংল্যান্ডের রানী ছিলেন এলিজাবেথ, ১ম, যিনি শাসন করেছিলেন ১৫৫৮ থেকে ১৬০৩ পর্যন্ত। আকবর সম্পর্কে জানা যায় তিনি নৌবাহিনী গঠন করতে অনুৎসাহী ছিলেন কারণ একে তো তার স্থলবাহিনী ছিল দুর্ধর্ষ, দ্বিতীয়ত, সম্ভবত উপযুক্ত ভৌগোলিক জ্ঞানের অভাবে, তিনি সমুদ্রপথে কোনো বিপদের আশঙ্কা করেননি। অন্যদিকে ১৬০০ সালের শেষ দিনে লন্ডনের কতিপয় অভিযাত্রিক বণিক রানী এলিজাবেথের কাছে ভারতীয় মহাসাগরে বাণিজ্য করার অনুমতি চাইলে রানী সনদপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং যে কোম্পানিটি গঠিত হয় সেটির নাম হল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। আকবরের উত্তরসূরি মুঘল রাজবংশের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ্র হাত থেকে ভারতের ক্ষমতা দখল করে নেয় এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৭ সালে। তারই ঠিক একশ’ বছর আগে, ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা (যদিও তিনি বাংলা জানতেন না) এই ইংরেজ কোম্পানির হাতেই পলাশীর প্রান্তরে শুধু রাজ্য হারাননি, নিজের প্রাণটাও খুইয়েছিলেন।

শত্রুর শত্রু বন্ধু- এ ফর্মুলা অনুযায়ী মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা নেয়ার কারণে ইংরেজরা হিন্দুদের বন্ধু এবং মুসলমানদের শত্রু জ্ঞান করতে থাকে। মুসলমানরাও তাদের পূর্বতন অবস্থান থেকে সরে আসে না এবং স্যার সৈয়দ আহমদের মুসলমানদের ইংরেজি ভাষা শেখার গুরুত্ব প্রচারের আগে পর্যন্ত তারা ধর্মীয় ভাষা আরবি ও পূর্বের রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি শিক্ষা চালু রাখে। আজকের বাংলাদেশ তখন ছিল পূর্ব-বঙ্গ, কিন্তু তার আগে অর্থাৎ মধ্যযুগে বাংলার মুসলমান নৃপতিরা যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক অনুশীলন ও চর্চার পরিবেশ তৈরি করছিলেন, তা ইংরেজ আমলে পূর্ব-বঙ্গের মুসলমানদের মধ্য থেকে তিরোহিত হয়- এবং প্রচুর মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে যে ঐতিহ্য শুধু যে ইংরেজি ভাষার বিপক্ষে প্রতিবাদী একটি চেতনা তৈরি করল তা নয়, আমার ধারণা, বাংলাভাষার বিপক্ষেও একটি সচেতনতা তৈরি করল। এটা যে খুব প্রামাণিকভাবে বলা যাবে তা নয়, কিন্তু ধারণাটা যৌক্তিক।

সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের যখন সৃষ্টি হল তখন বাংলাভাষার ওপর আক্রমণগুলো চিন্তা করলে এ কথা স্পষ্ট হয় যে ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ওই আক্রমণগুলো পরিচালিত হয়েছিল। যেমন বাংলা হরফ পরিবর্তনের চিন্তা পর্যন্ত করা হয়েছিল।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে উত্তরণ- রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় যেটা হল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে দেশ উত্তরিত হয়েছে। কিন্তু সাংখ্যিক প্রযুক্তির যুগে আর সব কিছুর সঙ্গে পৃথিবীতে ধর্মীয় মৌলবাদ বেড়ে গেছে- তার কিছু উপসর্গ বাংলাদেশেও পরিলক্ষিত হয়েছে। মৌলবাদ সন্ত্রাসী অর্থে না হলেও সাংস্কৃতিক অর্থে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবেদন তুলছে, ফলে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গত দু’দশক ধরে আচার-আচরণে, কথাবার্তায়, শব্দ-বাছাইয়ে, শিক্ষাগ্রহণে, সামাজিক অনুষ্ঠান পালনে বেশ কিছু উপাদান ঢুকে গেছে, যা নানা অর্থেই পাকিস্তানি তত্ত্বে নিহিত সাম্প্রদায়িকতারই প্রলম্বিত ভাষাভিত্তিক প্রতিফলন। এটিই আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যেটি ক্রমশ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিকড় গাড়ছে। হয়ত এ কথাটা বলার সময় এখনও আসেনি, কিন্তু বাংলাভাষার সর্বস্তরে প্রচলনের পথে ও প্রক্রিয়ায় ওপরে ব্যাখ্যাত দুটা কারণই প্রাসঙ্গিকভাবে প্রতিপক্ষতামূলক। হ