বিপিএলের সাতকাহন

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  স্পোর্টস রিপোর্টার

শুক্রবার শেষ হওয়া বিপিএলের ষষ্ঠ আসর ছিল আক্ষরিক অর্থেই ঘটনাবহুল। যার শেষ অঙ্কে ঢাকার হৃদয় ভেঙে শিরোপা উঠেছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হাতে। ৩৬ দিন ও ৪৬ ম্যাচের এ টুর্নামেন্টের নানা ঘটনা তুলে ধরা হল-

অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কের বিপিএল

বিপিএল মানেই বিতর্ক। অনিয়মই যেখানে নিয়ম। ম্যাচ শুরুর আগ মুহূর্তেও অনেক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। এবার শুরুর আগেই অস্ট্রেলিয়ার স্টিভেন স্মিথকে খেলার সুযোগ করে দিতে নতুন আইন করল বিসিবি। এরপর প্রথম সপ্তাহে থাকল ডিআরএস বিতর্ক। অর্ধেক ডিআরএস নিয়ে টুর্নামেন্টে শুরু হয়েছিল। পরে সেটা অবশ্য পরিপূর্ণ করা হয়েছে। তবে মোটা দাগে দলীয় বিষয় নিয়ে আর তেমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি।

স্লো ওভার রেটে শাস্তি পাননি কোনো অধিনায়ক

বিপিএল ৪৬ ম্যাচের আসর। স্লো ওভার রেটের কারণে এবার কোনো অধিনায়ককে জরিমানা গুনতে হয়নি। এছাড়া আম্পায়ারের দিকে কোনো অধিনায়ক তেড়ে গেছেন এমনটাও হয়নি। মেহেদী হাসান মিরাজকে অধিনায়ক করে এবার সবাইকে চমকে দিয়েছিল রাজশাহী কিংস। আবার সিলেট সিক্সার্সকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনজন, কুমিল্লাকে দু’জন।

ডিআরএস ও আম্পায়ারিং বিতর্ক

বিপিএলে এবারই প্রথম ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএস ছিল। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে রিভিউর ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আল্ট্রাএজ কিংবা øিকোমিটার ছিল না। তাতে টেলিভিশন আম্পায়ার খালি চোখে এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত দিলেন যা বিতর্কের উত্তাপ ছড়াল। বিতর্ক এড়াতে পরে ডিআরএসে আল্ট্রাএজ যোগ করে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল।

দুর্দান্ত তাসকিন, দুর্ভাগা তাসকিন

ইনজুরি কাটিয়ে বিপিএলে দুর্দান্ত শুরু করেছিলেন তাসকিন। যতদিন টুর্নামেন্টে ছিলেন তার অধিকাংশ সময়ই ছিলেন শীর্ষ উইকেট শিকারি। ফর্মহীনতা ও ইনজুরির কারণে ২০১৭ সালের শেষ দিক থেকে জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন তাসকিন। এবার দারুণ বোলিং করে ১২ ম্যাচে ২২ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছেন। ১৫ ম্যাচে ২৩ উইকেট নিয়ে সবার উপরে রয়েছেন সাকিব আল হাসান। বিপিএলের পারফরম্যান্সে নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়ানডে ও টেস্ট দলে সুযোগ পেয়েছিলেন তাসকিন। কিন্তু লিগপর্বের শেষ ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সের পেসার তাসকিন ফিল্ডিং করতে গিয়ে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়লেন। তাতে নিউজিল্যান্ড সফরও শেষ হয়ে যায়।

রাইলি রুশার রেকর্ড রান

আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সের দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান রাইলি রুশোর ব্যাটে এবার ছিল রানের জোয়ার। শুধু দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচেই তিনি শূন্য রানে আউট হন। তারপরও অসাধারণ ব্যাটিংয়ে বিপিএলে এক আসরে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েছেন। ১৪ ম্যাচে একটি সেঞ্চুরি ও পাঁচটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। গড় ৬৯.৫৫। রান ৫৫৮। অপরাজিত থেকেছেন পাঁচবার। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান তারই।

একই দলে চার ব্যাটিং দানব

ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্স, অ্যালেক্স হেলস, রাইলি রুশো। ডি ভিলিয়ার্স সিলেট পর্বে যোগ দিতেই এই চার বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানের সমন্বয়ে সবাইকে উড়িয়ে দিতে শুরু করে রংপুর রাইডার্স। লিগপর্বের রংপুর শেষ ছয় ম্যাচ জিতেছে টানা। শেষ ছয় ম্যাচ খেলে চলে যান ডি ভিলিয়ার্স। হেলস তার আগেই ইনজুরির কারণে দেশে ফেরেন। এবার গেইল নিষ্প্রভ থাকলেও বাকি তিন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন। তবে ভিলিয়ার্স ও হেলস চলে যাওয়ায় এবং প্লে-অফ পর্বে রুশো ও গেইল জ্বলে না ওঠায় রংপুরও ফাইনালে যেতে পারেনি।

মাশরাফির সেরা পারফরম্যান্স

বয়সের কারণ দেখিয়ে অনেকটা চাপ দিয়েই আন্তর্জাতিক টি ২০ ক্রিকেট থেকে মাশরাফি মুর্তজাকে অবসরে পাঠান হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু বুড়ো হাড়ের ভেলকিতে একের পর এক চমক দেখিয়েই চলেছেন মাশরাফি। এবারের আসরে ১৪ ম্যাচে ২২ উইকেট এই মিডিয়াম পেসারের, যা টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিপিএলে রংপুর অধিনায়কের এটাই সেরা পারফরম্যান্স। প্রথম বিপিএলে ১১ ম্যাচে নিয়েছিলেন ১০ উইকেট। দ্বিতীয় বিপিএলে ১১ ম্যাচে আট উইকেট। তৃতীয় বিপিএলে ১২ ম্যাচে পাঁচ উইকেট। চতুর্থ বিপিএলে ১২ ম্যাচে ১৩ উইকেট। পঞ্চম আসরে ১৪ ম্যাচে ১৫ উইকেট।

আবার সেরা সাকিব

বোলিংয়ে নিয়েছেন সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট। ব্যাটিংয়ে করেছেন ৩০১ রান। বিপিএলের সেরা অলরাউন্ডার সাকিবই। টুর্নামেন্টসেরাও হয়েছেন ঢাকা অধিনায়ক। বিপিএলে তার সেরা হওয়া যেন সাধারণ ঘটনাই!

তামিম যেন গেইল

আগের পাঁচ আসরে একবারও ফাইনালে খেলা হয়নি তামিম ইকবালের। গতবার একটুর জন্য মিস করেছিলেন। এবার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে খেললেন নিজের প্রথম বিপিএল ফাইনাল। ফাইনালে গেইল না থাকলেও তার অভাব বুঝতে দেননি তামিম। খেলেছেন ৬১ বলে ১৪১* রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস। শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হয়েছেন তিনি। ১৪ ম্যাচে তার রান ৪৬৭।

রানপ্রসবা চট্টগ্রামের উইকেট

শুরুতে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ১৪০/১৫০ রান তাড়া করেও জেতা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। রানও উঠছিল না। সবাই তাকিয়ে ছিল বিপিএলের সিলেটপর্বের দিকে। সেখানে রান হল। কিন্তু রানপ্রসবা হিসেবে প্রমাণিত চট্টগ্রাম। সেখানে রংপুর রাইডার্সের দুই ব্যাটসম্যান চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করলেন। ওই ম্যাচে চার উইকেটে ২৩৯ রান করল রংপুর, যা বিপিএলের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোরের নতুন রেকর্ড। দু’দিন বাদেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স পাঁচ উইকেটে ২৩৭ রান তোলে।

রংপুরের রেকর্ড

এক ইনিংসে দুই সেঞ্চুরির কীর্তি এবারই প্রথম দেখল বিপিএল। চট্টগ্রামে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে চার উইকেটে ২৩৯ রান তুলে বিপিএলে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে রংপুর। অ্যালেক্স হেলস (১০০) ও রাইলি রুশো (১০০*) করেন সেঞ্চুরি। টি ২০ ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো এক ইনিংসে দুই সেঞ্চুরির দেখা মেলে। এবারের আসরে হওয়া রেকর্ড ছয় সেঞ্চুরির তিনটি রংপুরের।

সেঞ্চুরি-হ্যাটট্রিকের ম্যাচ

চট্টগ্রামে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স এভিন লুইসের অপরাজিত ১০৯ রানের সুবাদে তুলেছিল পাঁচ উইকেটে ২৩৭ রান। সেই রানে পিষ্ট হয়ে খুলনা টাইটানস ১৫৭ রানে অলআউট। টানা তিন বলে তাদের শেষ তিন ব্যাটসম্যানকে আউট করে হ্যাটট্রিক করলেন পাকিস্তানি পেসার ওয়াহাব রিয়াজ। বিপিএল প্রথমবারের মতো এক ম্যাচে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকের কীর্তি দেখল।

সেঞ্চুরির বিপিএল

প্রথম বিপিএলে সেঞ্চুরি হয়েছিল চারটি। গেইলের ছিল দুটি। দ্বিতীয় বিপিএলে সেঞ্চুরি হয়েছিল তিনটি। গেইলের ছিল একটি। তৃতীয় ও চতুর্থ বিপিএলে সেঞ্চুরি হয়েছিল একটি করে। পঞ্চম বিপিএলে সেঞ্চুরি হয়েছিল তিনটি। গেইলের ছিল দুটি। এবারের বিপিএলে সেঞ্চুরি হয়েছে ছয়টি। এভিন লুইস (১০৯*), লরি ইভান্স (১০৪*), রাইলি রুশো (১০০*) এবি ডি ভিলিয়ার্স (১০০*), অ্যালেক্স হেলস (১০০) ও তামিম ইকবাল (১৪১*)। ছুঁয়েছেন তিন অঙ্ক।

হ্যাটট্রিকের বিপিএল

আগের পাঁচ আসরে হ্যাটট্রিক হয়েছিল মাত্র দুটি। আর এবার এক আসরেই হল তিনটি। এর দুটি আবার ঢাকা ডায়নামাইটসের। এবারের আসরের প্রথম হ্যাটট্রিক আলিস ইসলামের। ঢাকার অফ-স্পিনার অভিষেকে হ্যাটট্রিক করলেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের পাকিস্তানি পেসার ওয়াহাব রিয়াজ চট্টগ্রামে হ্যাটট্রিক করলেন। একদিন পর আন্দ্রে রাসেল ঢাকার পক্ষে করেন দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। বিপিএলের উদ্বোধনী আসরে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ সামি। তৃতীয় বিপিএলে হ্যাটট্রিক করেন বাংলাদেশি পেসার আল আমিন হোসেন।

প্রথম সুপার ওভার

ষষ্ঠ আসরে এসে বিপিএল দেখল প্রথম সুপার ওভার। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে খুলনা টাইটানস ও চিটাগং ভাইকিংসের ম্যাচটা হল টাই। তারপর এক ওভারের রোমাঞ্চে জিতল চিটাগং।