এই লজ্জার দায় কার

ঘূর্ণি উইকেটের নামে যে মৃত্যুকূপ বানানো হয়েছিল সেটা বুমেরাং হয়ে স্বাগতিকদেরই প্রাণ সংহার করল

  ইশতিয়াক সজীব ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগেরদিন মেহেদী হাসান মিরাজ শুনিয়েছিলেন তিনশ’ ছাড়ানো লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের অলীক প্রত্যাশার কথা। কিন্তু বিভীষিকাময় ব্যাটিং বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকল দ্বিতীয় ইনিংসেও। তালগোল পাকানো ব্যাটিংয়ে পেতে হল ভীষণ বিব্রতকর হারের তিক্ত স্বাদ। চতুর্থ ইনিংসে ৩৩৯ রানের প্রায় অসম্ভব এক লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১২৩ রানে অলআউট হয়ে কার্যত আড়াই দিনেই ঢাকা টেস্ট হেরে বসল বাংলাদেশ। ২১৫ রানের বিশাল জয়ে দুই টেস্টের সিরিজ ১-০ ব্যবধানে জিতে নিল শ্রীলংকা।

এখন প্রশ্ন হল, বিব্রতকর এই হারের দায় কার? বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যর্থতার দায় নেয়ার সংস্কৃতি নেই। সবাই অন্যের ওপর দোষ চাপাতে পারদর্শী। বলির পাঁঠা বানানো হবে মিরপুরের লংকান কিউরেটরকে। স্পিনিং উইকেটের নামে যে ‘মাইনফিল্ড’ বানানো হয়েছিল, সেটা বুমেরাং হয়ে স্বাগতিকদেরই প্রাণ সংহার করল। ড্র হওয়া প্রথম টেস্টে চট্টগ্রামের ফ্লাট উইকেটে পাঁচদিনে পড়েছিল সাকুল্যে ২৪ উইকেট। যেখানে আড়াই দিনেই ৪০ উইকেটের পতন দেখল মিরপুর। তীক্ষ্ণ টার্ন, অসমান বাউন্স। সঙ্গে গতি বিভ্রাট। এমন ব্যাটিং দুরূই উইকেট বানিয়ে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখার আগে প্রতিপক্ষের শক্তি-সামর্থ্যরে ব্যাপারটি মাথায় রাখা উচিত ছিল। কার্যত ঝুঁকির নামে জুয়া খেলে নিজেদের ফাঁদেই আটকে গেছে বাংলাদেশ। দায়টা তাই সবার আগে টিম ম্যানেজমেন্টের। নিজেদের সদ্য সাবেক কোচ প্রতিপক্ষ শিবিরে থাকার ঝুঁকিটাও উপলব্ধি করতে পারেনি তারা। পারলে হাথুরুসিংহের শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রধান কোচ ছাড়া টেস্ট খেলার দুঃসাহস দেখাত না। ঢাকা টেস্টের একাদশও জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নের। চট্টগ্রাম টেস্টে দলের বাইরে থাকা ফর্মহীন সাব্বির রহমানকে কোন বিবেচনায় দ্বিতীয় টেস্টে মোসাদ্দেকের জায়গায় খেলানো হল, তা বোধগম্য নয়। ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ মিসের মহড়ার পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে দুই ইনিংস মিলিয়ে সাব্বির করেছেন মাত্র এক রান।

অবশ্য সাব্বির একা নন, বাংলাদেশের পুরো ব্যাটিং ইউনিটই সুপার ফ্লপ। দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশ টিকতে পেরেছে মাত্র ৭৫.১ ওভার! প্রথম ইনিংসে মাত্র তিন রানে শেষ পাঁচ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছিল ১১০ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৩ রানে পড়েছে শেষ ছয় উইকেট। ইনিংসের স্থায়িত্ব ২৯.৩ ওভার। দুই ইনিংসেই মাত্র চারজন করে ব্যাটসম্যান দুই অঙ্ক ছুঁতে পেরেছেন। প্রথম ইনিংসে মিরাজের অপরাজিত ৩৮ রান সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুলের ব্যাট থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ৩৩। পুরো ম্যাচে বাংলাদশের কারও ফিফটি নেই, নেই ৫০ রানের জুটিও। সেই একই উইকেটে দুই ইনিংসে শ্রীলংকা করেছে যথাক্রমে ২২২ ও ২২৬ রান। খেলেছে ১৩৯.২ ওভার। দুই ইনিংসে তিনটি ফিফটি। ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্টেই জোড়া ফিফটিতে ম্যাচ ও সিরিজসেরার পুরস্কার উঠল রোশেন সিলভার হাতে। অচেনা মিরপুরের বাইশ গজের ভাষা বুঝতে রোশেনের কোনো সমস্যা হল না, অথচ নিজেদের হোম অব ক্রিকেটের প্রতিটি ঘাস যাদের চেনা সেই তামিম, মুশফিকরা চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ের বদলে বেছে নিলেন আত্মহননের পথ। দলের সেরা ব্যাটসম্যান তামিম দুই ইনিংস মিলিয়ে টিকেছেন মাত্র ১০ বল! প্রথম ইনিংসের ১১০ রান মিরপুরের সর্বনিু টেস্ট স্কোর। আর ১২৩ এই মাঠে চতুর্থ ইনিংসে সর্বনিু দলীয় স্কোর! এমন বিস্মরণযোগ্য ব্যাটিংয়ের পর সব দায় উইকেটের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। লংকান স্পিনারদের দু’হাত ভরে সাফল্য উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই। প্রয়োগ ক্ষমতাবিষয়ক প্রশ্ন আরও পরের কথা, স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের কথিত শক্তি-সামর্থ্য কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটাই আগে নির্ণয় করা উচিত। উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতাই লক্ষ্য করা যায়নি কারও মধ্যে। সবাই যেন নিয়তি মেনে কেবল রুটিন কাজটা সারতে নেমেছিলেন। যাদের ভরসায় বানানো হয়েছিল এই ঘূর্ণি ফাঁদ, সেই স্পিনাররাও দিতে পারেননি নিজেদের সেরাটা। দুই ইনিংসেই চারটি করে উইকেট নিয়েছেন তাইজুল।

প্রথম ইনিংসে রাজ্জাকও পেয়েছিলেন চার উইকেট। কিন্তু লংকান ব্যাটিংয়ে সত্যিকারের ধস নামাতে পারেননি তারা। অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২৪ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে যা করে দেখিয়েছেন লংকান স্পিনার আকিলা ধনঞ্জয়া। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪৪ রানে নিয়েছেন আট উইকেট। টেস্ট অভিষেকে শ্রীলংকার কোনো বোলারের এটাই সেরা বোলিং। লংকান স্পিন আক্রমণের নেতা রঙ্গনা হেরাথ দ্বিতীয় ইনিংসে চার উইকেট নেয়ার পথে গড়েছেন আরেকটি দারুণ কীর্তি। ওয়াসিম আকরামকে (৪১৪) ছাড়িয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি উইকেট বাঁ-হাতি বোলার এখন হেরাথ (৪১৫)। লংকানদের এত কীর্তি স্বাগতিকদের লজ্জা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter