খেলোয়াড়দের ঘর আজ জুয়াড়ির আস্তানা

দিনের আলোতে খেলায় মত্ত থাকা ক্লাবগুলো রাতের অন্ধকারে হয়ে ওঠে জুয়ায় উন্মত্ত * নব্বইয়ের দশক থেকে জুয়াড়িদের কর্মকাণ্ড প্রকট আকার ধারণ করে। প্রথমদিকে হাতাহাতি হতো। পরে তা হত্যাযজ্ঞেও রূপ নিতে শুরু করে * খেলোয়াড়দের বের করে দিয়ে বসানো হয় ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ড। আর এসব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করত যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা * ক্যাসিনোতে বাধা দেয়ায় পুলিশের মতিঝিল জোনের ডিসি বদলি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে

  মোজাম্মেল হক চঞ্চল ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় ডেঙ্গুর চেয়েও যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে ক্যাসিনো। ক্রীড়া ক্লাবগুলো দখল করে নিয়েছে জুয়াড়িরা। শুধু যে ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের লোকজনই খেলেন তা নয়, ক্রীড়া সংগঠক ও খেলোয়াড়রাও এই নেশায় আচ্ছন্ন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক ম্যানেজার ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন নানা সময়ে বিদেশ সফরে ক্যাসিনো কেলেংকারি ঘটিয়েছেন। টিম হোটেল ছেড়ে প্রায়ই ক্যাসিনোতে গিয়ে পড়ে থাকতেন সুজন। শ্রীলংকায় সর্বশেষ সফরে বাংলাদেশ দল হারার পরও সুজন ক্যাসিনোতে গিয়ে বুঁদ হয়েছিলেন। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। শুধু সুজন নয়, বিসিবির আরও কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ পুরনো। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) এক কর্মকর্তা তো প্রায় সারাক্ষণই জুয়া-ক্যাসিনো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ওই কর্মকর্তাকে প্রায়শই একটি অভিজাত ক্লাবে জুয়া খেলতে দেখা যায়। বিদেশে সভা, সেমিনারে যোগ দেয়ার নামে ক্যাসিনোতেই সময় কাটান বাফুফের ওই কর্মকর্তা। ফুটবলের বারোটা বাজিয়ে তিনি মদ ও জুয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ খোদ সাবেক তারকা ফুটবলার শামসুল আলম মঞ্জুর।

দিনের আলোতে খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য ক্লাবগুলো প্রশংসিত হয়। কিন্তু আলো ফুরিয়ে যখন অন্ধকার নামতে থাকে তখনই অন্য আরেক জগৎ তৈরি হয় ক্লাব অঙ্গনে। ক্যাসিনো, হাউজি এবং ওয়ানটেনের মতো জুয়ার উন্মাতাল নাটক মঞ্চায়িত হয় ক্লাবের অভ্যন্তরে। খেলোয়াড়দের ঘর পরিণত হয় জুয়াড়ির আস্তানায়। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জুয়াড়ির সংখ্যাও। খেলাধুলায় দেশের ক্লাবগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। যুগ যুগ ধরে ক্লাবগুলোর কল্যাণেই দেশ পেয়েছে তারকা খেলোয়াড়দের। যাদের নৈপুণ্যে বিশ্ব চিনেছে বাংলাদেশকে। জেনেছে বাংলাদেশের গৌরবান্বিত অধ্যায়। দেশের খেলাধুলার সূতিকাগার ক্লাবগুলোই। মতিঝিলপাড়ার ক্লাবগুলো তো আরও পুরনো। কোনো কোনো ক্লাব এখন দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের সাক্ষী হয়ে। যুগে যুগে তারকা খেলোয়াড় তৈরি করে আজ তারা ব্যাপক পরিচিত। গর্বিত খেলোয়াড়ের গর্বিত জনকও এ ক্লাবগুলো। দিনের আলোতে খেলায় মত্ত থাকা ক্লাবগুলো রাতের অন্ধকারে হয়ে ওঠে জুয়ায় উন্মত্ত।

ক্লাবে হাউজি কিংবা তাসের গ্যাম্বলিন শুরু হয় সেই ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই- কেউ কেউ বললেন এমন কথা। সেই ধারাতেই আজ ক্লাবগুলো হয়ে উঠেছে ‘জুয়াড়িদের অভয়ারণ্য’। আগে ক্লাবগুলোতে জুয়া চললেও অনেকটাই নীরব আকারেই ছিল। রাতের বেলা জুয়া বা গ্যাম্বলিন খেলে যে যার মতো বাড়ি ফিরত। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা মারামারির ঘটনা তেমনটা শোনা যেত না। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে জুয়াড়িদের কর্মকাণ্ড প্রকট আকার ধারণ করে। প্রথমদিকে হাতাহাতি হতো। পরে তা হত্যাযজ্ঞেও রূপ নিতে শুরু করে। ওয়ানটেন, হাউজি আর তাসের গ্যাম্বলিন ছিল মতিঝিলপাড়ার ক্লাবগুলোর প্রধান আয়ের উৎস। জুয়াড়িদের নিরাপদ জুয়ার স্থান এখন খেলাধুলার এ ক্লাবগুলো। ধীরে ধীরে জুয়াড়িদের সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ক্লাব প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে রাস্তায়ও কাগজ নিয়ে বসে পড়েন তারা। যেখানে উচ্চশ্রেণি থেকে নিু-মধ্যবিত্তরাও আসেন অর্থপ্রাপ্তির লোভে। আর সর্বস্ব হারিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় একটা সময়। জুয়ার শ্রেণিভেদে ওয়ানটেনই ছিল ভয়ংকর। বেশ বড় আয়তাকার একটা টেবিল। তার ওপর এক থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা লেখা ১০টি ঘর। পাশে দেয়ালে রাখা একটি বোর্ড, যাতে একই সংখ্যাগুলো লেখা অসংখ্যবার। একজন পাঁচটি ডার্ট (ছোট এক ধরনের তীর) তাক করে মারেন বোর্ড লক্ষ্য করে। যে যে সংখ্যায় ডার্ট পড়ে সেসব সংখ্যাকে জয়ী ধরা হয়। আর টেবিলে ওই সংখ্যা লেখা ঘরে যাদের টাকা থাকে, তার দ্বিগুণ ফেরত পায় তারা। কমপক্ষে ২০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা হয় এখানে। কোনো ডার্ট বোর্ডে না পড়লে তা আবারও মারা হয়। আপাত নিরীহ এই জুয়াতেই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা খোয়ান শত শত জুয়াড়ি।

১৯৯৪ সালের দিকে মতিঝিলের আরামবাগে আগমন ঘটে ওয়ানটেন খেলার। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার প্রায় সব ক্লাবেই। এ নিয়ে জুয়াড়িদের মধ্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে যে, একে অপরকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না তারা। ১৯৯৭ সালে দিলকুশা ক্লাবে জুয়াড়িদের হাতে খোকন নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এর রেশ ধরে বেশ ক’বছর বন্ধ ছিল বেআইনি জুয়া ওয়ানটেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে এ নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ক্লাবগুলোতে গিয়ে রীতিমতো কর্মকর্তাদের মারধর করেন। ওয়ানটেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর ওয়ানটেন ফের দখল করে নেয় ক্লাবের বোর্ডে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্লাবের এক কর্মকর্তা জানান, ‘ওয়ানটেন। জুয়া খেলা এখন কেবল আরামবাগ, মুক্তিযোদ্ধা এবং ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা কারও তোয়াক্কা করত না। সেই ওয়ানটেন এখন মৃত। আরামবাগের প্রায় সব ক্লাবেই বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যাসিনো। দিনে-রাতে সমানে চলত ক্যাসিনো। কোটি কোটি টাকা হাতবদল হয় প্রতিদিন। এই টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিকসহ অনেকের পকেটেই যাচ্ছে। ক্যাসিনোকে সুরক্ষা করার দায়িত্ব পালন করত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই। তাদের ম্যানেজ করেই ক্লাবপাড়ায় এযাবত চলেছে ওয়ানটেন ও ক্যাসিনো।’ তিনি যোগ করেন, ‘ক্যাসিনো বেআইনি হলেও সমস্যা হয়নি। কারণ স্থানীয় থানা পুলিশ ম্যানেজ করেছিল। পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা প্রতি রাতের বোর্ড থেকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ পান। ডিবি পুলিশও ভাগ পেয়ে থাকে।’

ক্যাসিনোতে বাধা দেয়ায় পুলিশের মতিঝিল জোনের ডিসি বদলি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকেই এখানে আসে জুয়াড়িরা। রীতিমতো মাইকে ঘোষণা দিয়ে চলে টাকার খেলা। অর্থলোভে পড়ে কেউ সর্বস্ব হারান, কেউ এক রাতেই বনে যান লাখপতি। ক্লাবগুলো প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পায়। এই অর্থের পুরোটাই যে ক্লাবের তহবিলে জমা হয় তা নয়, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের পকেটেও যেত। আরামবাগের এক ক্লাব কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রত্যেক বছর দলবদলের সময় বড় ক্লাবগুলো কোটি কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নামে। এদের পাশাপাশি লড়াইয়ে টিকে থাকতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে মাঝারি ও ছোট ক্লাবগুলো। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গেলে জুয়াকে প্রশ্রয় দিতেই হতো। কারণ আমাদের মতো ক্লাবগুলোর তো আর ডোনার নেই। যেখানে আবাহনী ও মোহামেডানের মতো ক্লাবগুলো বিশাল অঙ্কের চাঁদা পেয়ে থাকে। সেখানে আমাদের অবস্থানটা কোথায় ভেবে দেখুন? তাই বাধ্য হয়ে বোর্ড বসাতে হয়েছিল আমাদের। আগে হাউজির বোর্ড থেকে ক্লাব যা পেত তা দিয়ে প্রতিদিনের ক্যাম্প খরচ উঠে যেত। কিন্তু সেই হাউজি উঠিয়ে দিয়ে ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো বসানো হয়। ঠিক তখনি এখান থেকে খেলোধুলার পরিবেশটাই উঠে যায়। অধিকাংশ ক্লাব অস্ত্র ও ক্ষমতার জোরে দখল করে নেয়া হয়। খেলোয়াড়দের বের করে দিয়ে বসানো হয় ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ড। আর এসব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করত যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। কারও কিছু বলার ছিল না। কেউ টুঁ শব্দ করতে পারত না।’

ক্যাসিনো নিয়ে বেশ বেকায়দায় রয়েছেন এলাকাবাসী। একজন জানালেন, কি বলব ভাই? এখানে মানসম্মান নিয়ে বাস করাটা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারও বাড়িতে অতিথি এলে, রাস্তায় হয়তো দালালরা ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করে, খেলবেন নাকি? এভাবে কী ভদ্র সমাজ নিয়ে বাস করা যায়। মেহমান এলে আমাদের লজ্জার মধ্যে পড়তে হয়।’ আরেকজনের কথা, ‘বাড়িতে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে মেহমান এসেছিল। তাদের মধ্যে দু’জন ক্লাবপাড়ায় ঘুরতে গিয়ে ক্যাসিনোতে ঢুকে যায়। সর্বস্ব খুঁইয়ে লজ্জায় আর আমার বাসায় আসেনি।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×