‘ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশের ফুটবল’

  মোজাম্মেল হক চঞ্চল ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রিমিয়ার ফুটবল লীগ শেষ হয়ে গেলেও পাতানো ম্যাচের অভিযোগ-অভিশাপ ও কলংকের দাগ লেপ্টেই থাকল। পুরো লীগে আট থেকে ১০টি ম্যাচকে ঘিরে পাতানো ম্যাচের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। তবে লীগে রানার্সআপ শেখ জামাল ও ফরাশগঞ্জের মধ্যকার নির্লজ্জ পাতানো ম্যাচটি দর্শকদের চোখে ধরা পড়লেও কর্মকর্তাদের চোখ ঢাকা ছিল যেন টিনের চশমা দিয়ে। ফরাশগঞ্জ ও বিজেএমসির মধ্যকার ম্যাচটি পাতানো বলে মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ আমলে নেয়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। চ্যাম্পিয়নশিপ লীগ, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে অহরহ পাতানো ম্যাচ হচ্ছে। কিন্তু বাফুফে এসব আমলে নিতে নারাজ। যদিও ফুটবলবোদ্ধারা বলছেন, ঢাকার ফুটবল থেকে পাতানো ম্যাচ উপড়ে ফেলা যাবে না। কেননা ক্লাব কর্মকর্তারাই বাফুফের চেয়ারগুলোতে বসে আছেন। তারা যতদিন নিরপেক্ষ হবেন না, ততদিন ফুটবল এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে না।

২০১০ সালে শেখ জামাল ও রহমতগঞ্জের মধ্যকার ম্যাচটিকে ঘিরে পাতানো খেলার অভিযোগ উঠেছিল। লীগ কমিটি সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী শেখ জামালের ২০ লাখ এবং রহমতগঞ্জের পাঁচ লাখ টাকা জরিমান করা হয়। রহমতগঞ্জের গোলকিপার ইরান শেখকে নিষিদ্ধ করে ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়া হয়। রহমতগঞ্জের ফুটবল সম্পাদক সাবেক তারকা ফুটবলার সালাউদ্দিন কালা নিষেধাজ্ঞার গেঁরো থেকে মুক্তি পাওয়ার আগেই ইহলোক ত্যাগ করেন। কালার ভাই জামালের তাই খুব হতাশা ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ভাইকে নিষিদ্ধ করা হল ফুটবল থেকে। তার মৃত্যুর পরও সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। অথচ এখন আমি কড় গুনে বলে দিতে পারব, এবারের লীগে কতটি পাতানো ম্যাচ হয়েছে। কারা পাতানো ম্যাচ খেলেছে। দিবালোকের মতো পরিষ্কার হওয়ার পরও পাতানো ম্যাচ খেলা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি লীগ কমিটি।’ পাতানো ম্যাচের খবরে বিস্মিত দুই সাবেক ফুটবলার। এ নির্লজ্জ প্রবণতার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথও বাতলেছেন তারা।

গোলাম সারওয়ার টিপু

ঢাকার মাঠে মাঝে মধ্যেই পাতানো খেলা হচ্ছে। শেখ জামাল ও ফরাশগঞ্জের ম্যাচটি ছিল ওপেন সিক্রেট। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পাতানো ম্যাচ খেলার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। ওইসব দেশে পাতানো ম্যাচ খেলার জন্য কড়া শাস্তি দেয়া হয়। আর আমাদের দেশে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বিশ্বের যেসব দেশেই পাতানো ম্যাচের ঘটনা ঘটেছে, সেসব দেশের ফুটবল ক্রমশ নিচের দিকেই নামছে। বাংলাদেশেও একই অবস্থা। পাতানো ম্যাচের কারণে দেশের ফুটবল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পাতানো ম্যাচের বিষবাষ্পে ফুটবলাঙ্গনের বাতাসটা দূষিত হয়ে উঠেছে। এই অভিশাপ থেকে যেন আমাদের পরিত্রাণ নেই। পাতানো ম্যাচের শাস্তি হবে বলে আমার মনে হয় না। কেননা যারা শাস্তি দেবেন, তাদের ক্ষমতার জোর নেই। কর্মকর্তারা বিশেষ ব্যক্তিদের তোয়াজ করে চলছেন। আমাদের দেশের ফুটবল কর্মকর্তারা ফেডারেশনের চেয়ে ক্লাবের পরিচয়টাকে বড় করে দেখেন। কেউ আবাহনী, কেউ মোহামেডানের কর্মকর্তা। ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাছাড়া ফুটবল নিয়েও কথা বলে এখন লাভ নেই। কথা বলতেও আর ভালো লাগে না। ফুটবলের জন্য নয়, বাফুফের কর্মকর্তারা এখন দরজা খুলে বসে রয়েছেন ফিফা ও এএফসির অনুদান নেয়ার জন্য। ফুটবল নিয়ে কথা বললে তারা বিরক্ত বোধ করেন। আপনারা সাংবাদিকরা আর কত লিখবেন।

বাফুফের এখনকার কর্মকর্তারা প্রিন্ট মিডিয়া নিয়ে তেমন একটা গা করেন বলে মনে হয় না। চেহারা দেখাতে পারায় ইলেকট্রোনিক্স মিডিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রতাপ শংকর হাজরা

আমি স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে তেমন একটা যাই না। নিজে ফুটবল খেলেছি। ফুটবলটা উপভোগ করতে চাই। কিন্তু সমঝোতার ম্যাচ দেখে আনন্দ পাওয়ার চেয়ে হতাশাগ্রস্ত হতে রাজি নই। পাতানো ম্যাচ হওয়ার অন্যতম কারণ দুর্বল পরিচালনা। নীতিহীন ব্যক্তিদের হাতে স্বাভাবিক ফুটবল হতে পারে না। নীতিভ্রষ্টরা ফুটবলকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন, তখনই এসব পাতানো ম্যাচ হয়। এখন যারা ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তারা ফুটবলের চেয়ে নিজেদের স্বার্থটাকে বড় করে দেখছেন। পাতানো ম্যাচ যারা খেলেন কিংবা উৎসাহ জোগান, তারা ফুটবলের সঙ্গে ব্যাভিচার করছেন বলে আমি মনে করি। বর্তমানে পাতানো ম্যাচ নিয়ে কোনো শাস্তি দেয়া দূরের কথা, প্রমাণও করবে না লীগ কমিটি। কেননা তাদের কোমরে জোর কম। বুকে সাহস নেই। ফুটবলকে যদি সত্যিকার অর্থে ভালোবাসেন, তাহলে পাতানো ম্যাচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। অন্যান্য দেশে যে শাস্তি দেয়ার নিয়ম রয়েছে, তার ছিটেফোঁটা দিলেও আমি খুশি হতাম।

কায়সার হামিদ

এসব বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেও এখন লজ্জা লাগে। আসলে এই লজ্জাটা পাওয়ার কথা ছিল বাফুফের কর্মকর্তাদের। দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে চোখের সামনে যেভাবে পাতানো ম্যাচ হচ্ছে, তা বিশ্বের অন্য কোথাও হয় না। তারপরও এতটুকু হেলদোল নেই তাদের। যেন দেখেও না দেখার ভান করছেন তারা। মিডিয়াগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরও পাতানো ম্যাচ নিয়ে তেমন গা করছেন না কর্তারা। দেশে মনে হচ্ছে, ফুটবলে পাতানো ম্যাচ বলবে এটা আইনসিদ্ধ। নইলে কেন এর যথাযথ বিচার কিংবা শাস্তি হবে না। এ কারণেই এদেশের ফুটবল এখন আর কেউ দেখতে চান না।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter