সূর্যোদয়ের দেশের সূর্যকন্যার ইতিহাস

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এএফপি, নিউইয়র্ক

এই গ্রীষ্মে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাসতেই যেন ভুলে গিয়েছিল জাপানের মানুষ। এমন কঠিন সময়ে টাইফুন ও ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত সূর্যোদয়ের দেশে শোক ভোলার দারুণ এক উপলক্ষ এনে দিলেন নাওমি ওসাকা। জাপানের ২০ বছর বয়সী টেনিসকন্যা নিউইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোয় অভাবনীয় এক ভূমিকম্প ঘটিয়ে গড়লেন নতুন ইতিহাস।

শনিবার ইউএস ওপেনের নারী এককের ফাইনালে নিজের শৈশবের আদর্শ সেরেনা উইলিয়ামসকে সরাসরি ৬-২, ৬-৪ গেমে হারিয়ে জাপানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে কোনো গ্র্যান্ডস্লাম এককে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছেন ওসাকা।

তবে জাপানি কন্যার ঐতিহাসিক সাফল্য একটু হলেও ম্লান হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিতর্কে। চেয়ার আম্পায়ারের সঙ্গে ম্যাচজুড়ে সেরেনার বাকবিতণ্ডায় নষ্ট হয়েছে ম্যাচের সৌন্দর্য। আসলে কোর্টের লড়াইয়ের চেয়ে বিতর্কই বেশি উত্তাপ ছড়িয়েছে ফাইনালে। সেখানে ওসাকার কোনো ভূমিকা ছিল না। চেয়ার আম্পায়ার কার্লোস রামোসের সঙ্গে ঠোকাঠুকির একপর্যায়ে সরাসরি তাকে ‘চোর’ বলে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন সেরেনা।

গত বছর সেপ্টেম্বরে মা হওয়ার পর আর গ্র্যান্ডস্লাম জিততে পারেননি সেরেনা। মার্গারেট কোর্টের সর্বোচ্চ ২৪টি গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের রেকর্ড ছুঁতে আর মাত্র একটি শিরোপা দরকার ৩৬ বছর বয়সী মার্কিন কৃষ্ণকলির। মাসদুয়েক আগে উইম্বলডন ফাইনালে হারায় এবার ইউএস ওপেনের ফাইনালে সব মিলিয়ে চাপে ছিলেন সেরেনা। সেই চাপ থেকেই হয়তো এমন বিস্ফোরণ। প্রথম সেট চলাকালীন সেরেনার কোচ গ্যালারি থেকে শিষ্যকে ইশারায় পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

ট্যুর ম্যাচে এমন সুযোগ থাকলেও গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্টে কোচদের এভাবে খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দেয়ার নিয়ম নেই। এজন্য সেরেনাকে সতর্ক করেন রামোস। এতেই ঘটনার শুরু। নিয়মবহির্ভূতভাবে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করার অভিযোগকে নিজের জন্য অবমাননাকর দাবি করে চেয়ার আম্পায়ারের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন সেরেনা।

রামোসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একজন মা। আমি জানি, আমার মেয়ের জন্য কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। আমি কখনও প্রতারণা করি না। দরকার হলে হেরে যাব।’

এরপর দ্বিতীয় সেটে ৩-২ গেমে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় হতাশায় কোর্টেই আছাড় মেরে নিজের র‌্যাকেট ভেঙে ফেলায় সেরেনার একটি পয়েন্ট কেটে নেন রামোস। এতে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে পর্তুগিজ আম্পায়ারকে উদ্দেশ্য করে সেরেনা বলেন, ‘আপনি চোর। আপনি আমার পয়েন্ট চুরি করেছেন। আপনি মিথ্যাবাদী। যতদিন বাঁচবেন আর কখনও আমার কোর্টে থাকবেন না। আপনাকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’

এতে আবারও আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে সেরেনার বিপক্ষে একটি গেম পেনাল্টি করেন রামোস। পুরো সময় গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় ২৪ হাজার দর্শক সেরেনার পক্ষ নিয়ে দুয়ো দিয়েছেন রামোসকে। ম্যাচ শেষে চেয়ার আম্পায়ারের বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও লিঙ্গবৈষম্যের অভিযোগ আনেন সেরেনা।

তবে হারের পর ছুটে গিয়ে হাত মিলিয়ে আন্তরিকভাবেই ওসাকাকে অভিনন্দন জানান মার্কিন কৃষ্ণকলি। টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের পর আনন্দের আতিশয্যে ওসাকা যখন কাঁদছিলেন, গ্যালারি থেকে তাকে লক্ষ্য করেও ভেসে আসে দুয়ো। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ওসাকার ঢাল হয়ে এগিয়ে আসেন সেরেনাই, ‘আপনারা থামুন। সে ভালো খেলেছে। এটা তার প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম। আসুন সবাই মিলে মুহূর্তটা তার জন্য স্মরণীয় করে তুলি।’

উত্তরে হাসিমুখে ওসাকা বলেন, ‘ধন্যবাদ সেরেনা। ইউএস ওপেনের ফাইনালে আপনার মুখোমুখি হওয়াটা ছিল আমার শৈশবের স্বপ্ন। সেই সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য। জানি, দর্শকরা এমন ফাইনাল দেখতে চায়নি। ম্যাচটা এভাবে শেষ হওয়ায় খারাপ লাগছে।’