জাত নিমের পাতা

পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর আসলে কী ঘটেছিল?

  মাহবুব কামাল ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর আসলে কী ঘটেছিল?
ছবি: সংগৃহীত

গতকাল ছিল ৭ নভেম্বর। রাজনীতির বিভিন্ন পক্ষ এ দিনটিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে আখ্যায়িত করে থাকে এবং সেভাবেই প্রতিটি পক্ষ গতকাল দিনটি পালন করেছে। আওয়ামী লীগ ও সমমনা, বিএনপি ও সমমনা এবং জাসদ ও সমমনারা দিনটি পালন করেছে- যথাক্রমে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি এবং সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে।

বলাবাহুল্য, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বরের মতো ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে মূল্যায়িত ও পালিত হয় না। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর গত ৪৩ বছরে কেউ এমন কোনো মূল্যায়ন দাঁড় করাতে পারেননি, যাতে দিবসটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে পালিত হতে পারে।

২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের ব্যাপারে আমরা যে ঐকমত্যে পৌঁছতে পেরেছি, তার একটি বড় কারণ এই যে, এই দিবসগুলো একটি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটা কমন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম আমরা। এই যুদ্ধের দুটি পক্ষের একটি ছিল পাকিস্তানি, আরেকটি বাঙালি। স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বাঙালির মধ্যে যেহেতু পক্ষ-বিপক্ষ (গুটিকয়েক রাজাকার বাদ দিয়ে) ছিল না, তাই যুদ্ধজয়ের পর দিবসগুলো নিয়ে আমরা কোনো বিতর্কে জড়াইনি।

পক্ষান্তরে, ৭ নভেম্বরের ঘটনায় যারা অংশ নিয়েছিলেন, তারা একই বাঙালি জাতির ভিন্ন ভিন্ন অংশ। এই অংশগুলোর প্রতিটিই আবার এখন পর্যন্ত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং তারা নিজস্ব রাজনীতির স্বার্থে ৭ নভেম্বরকে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মূল্যায়ন করতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতি যারা করেন, তারা সবসময় উত্তেজনার মধ্যে থাকেন আর উত্তেজনার মধ্যে থাকলে কারও পক্ষেই কোনো ঘটনার নির্মোহ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

তাছাড়া ৭ নভেম্বর একটি জটিল রাজনৈতিক প্রপঞ্চ (phenomenon)। ঘটনাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, সেগুলোর আলাদা ব্যবচ্ছেদ করে একটি সমগ্র মূল্যায়ন দাঁড় করানো কঠিন। চিনির সঙ্গে বালু যোগ করলে সেটা মিশ্রণ। মিশ্রণের উপাদানগুলো সহজে আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু চিনির সঙ্গে পানি মেশালে সেটা দ্রবণ।

দ্রবণের উপাদানগুলো আলাদা করা সহজ নয়। ৭ নভেম্বর একটি রাজনৈতিক দ্রবণ। এ দ্রবণে ব্যক্তিগতভাবে আমিও দ্রবীভূত হয়েছিলাম। বহুদিন সেই দ্রবণ থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারিনি, ভ্রান্তিবিলাস কাটেনি বলে। এ লেখাটি যদি ৩০ কী ৪০ বছর আগে লিখতাম, সেটা আজকের মতো হতো না। আমি এখন উত্তেজনারহিত, নির্মোহ এক আলাদা সত্তা।

খুব সত্য কথা, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ যারা কাছ থেকে দেখেননি, বিশেষত নতুন প্রজন্মকে এর মূল্যায়ন আত্মস্থ করানো খুব কঠিন। জ্ঞানের তিন ধাপ- পারসেপশন, কনসেপশন ও থিওরি- পড়ার মাধ্যমে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা জ্ঞানের বড়জোর কনসেপশন পর্যায়ে উঠতে পারে। জ্ঞানের চূড়ান্ত উৎকর্ষ বলেও কোনো কথা নেই। সুতরাং ইতিহাসভিত্তিক যে কোনো লেখারই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে, থাকতে বাধ্য। এ লেখাটিরও তেমন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে বৈকি।

৭ নভেম্বরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমি একটা ভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে চাইছি। এ পর্যন্ত অনেকেই ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন, আমি সেদিকে না গিয়ে ঘটনাগুলো যে তিন মূল ব্যক্তির মধ্য দিয়ে পার্সোনিফাইড হয়েছিল, সেই ব্যক্তিত্রয়ের মূল্যায়নের চেষ্টা করব। বোধকরি তাতে ঘটনাও যুগপৎ মূল্যায়িত হবে।

পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের তিন প্রধান চরিত্র ছিলেন যথাক্রমে খালেদ মোশাররফ, আবু তাহের ও জিয়াউর রহমান। ওই সময়টায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) এবং তাহের ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্নেল, যিনি যুগপৎ ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের আর্মস ব্যান্ড- বিপ্লবী গণবাহিনীর কমান্ডার বা সর্বাধিনায়কও।

প্রকৃতপক্ষে এ তিন ব্যক্তিই ৭ নভেম্বর-পরবর্তী সময়ে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন জাতির সামনে। কে কাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন, সেদিকে যাব না। আমরা শুধু আমাদের কথাই বলব।

বস্তুত, খালেদ মোশাররফ বাংলাদেশের সেই বিরল বিখ্যাত ব্যক্তিদের একজন, যিনি ব্যাপকভাবে মিসআন্ডারস্টুড হয়েছেন, অর্থাৎ অনেকেই তাকে ভুল বুঝে আছেন।

রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা মানে তা এক ধরনের ঝুঁকিও বটে এবং সেই ঝুঁকি কখনও কখনও মৃত্যুতেও পর্যবসিত হয়। আবার সব মৃত্যুই ট্রাজেডি নয়, কোনো বীর যখন দর্শক-শ্রোতার মনে সন্দেহ-ভীতি তৈরি করে মৃত্যুবরণ করেন, তখনই তা ট্র্যাজেডি চরিত্র হয়। হ্যামলেট বা ম্যাকবেথ যেমন। খালেদও তেমন ইতিহাসের এক ট্র্যাজেডি নায়ক। তিনি বীরত্বের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন, তবে রেখে গেছেন এক ঝুড়ি অপব্যাখ্যা।

প্রকৃতপক্ষে ৭ নভেম্বর ছিল ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘটনাবলির চেইন রিঅ্যাকশন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন, তারা ছিলেন সেনাবাহিনীর কিছু মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা, যাদের মাত্র দু’জন (ফারুক ও রশীদ) ছিলেন ইন-সার্ভিসে; বাকিরা সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রধানত মেজর র‌্যাংকের কর্মকর্তা।

জিয়া তখন ছিলেন সেনাপ্রধান; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কিলারদেরই ডিকটেশনে চলছিল দেশ। তারা অবস্থান নিয়েছিলেন বঙ্গভবনে এবং কোমরে পিস্তল গুঁজে একের পর এক নির্দেশ দিয়ে পরিচালনা করছিলেন সাক্ষীগোপাল রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাককে। ওই দিনগুলোয় সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল।

খালেদ ছিলেন দেশের কনভেনশনাল আর্মির একজন জেনুইন অফিসার। সেনাপ্রধান জিয়ার অবনমিত মস্তককে তিনি সমগ্র সেনাবাহিনীর জন্য অপমান ভেবেছিলেন। অধস্তনরা জিয়াকে সম্মান করছেন না, সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু সমগ্র সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা তো এভাবে নষ্ট হতে পারে না। খালেদ তাই এগিয়ে এলেন এবং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াকে বন্দি করে সেনাবাহিনীর মূল কমান্ড তুলে নিলেন নিজ হাতে।

পরিহাসই বটে, ঘটনা ভিন্ন চরিত্র ধারণ করল। ১৫ আগস্টের হোতারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভারতবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। সাধারণের মনে জ্যামিতিক নিয়মে ধারণা জন্মাল, এই শক্তির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংঘটিত করলেন যিনি বা যারা (খালেদ ও তার সহযোগীরা), তারা নিশ্চয়ই ভারতপন্থী।

জনতার একটা বড় অংশের মধ্যে ক্রিয়াশীল এ ভাবনা পরিপক্বতা লাভ করল তখন, যখন তারা দেখলেন রাজপথে খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ও তার মা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল বের করেছেন। বাস্তবে রাশেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংগঠিত সেই মিছিলের সঙ্গে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের কোনোই সম্পর্ক ছিল না। এদেশে যেমনটা হয়- রাশেদ মোশাররফ অতিউৎসাহী হয়ে ঘটনার ফল আওয়ামী লীগের থলেতে ভরতে চেয়েছিলেন মাত্র।

ঘটনাপ্রবাহের ভিডিও ক্লিপ এবার রিওয়াইন্ড করে তাহের সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিই। এককথায় তাহের ছিলেন এক সরল দেশপ্রেমিক। মুক্তিযুদ্ধে এক পা হারানো সহজ-সরল এ মানুষটি যা বুঝতেন সরাসরি বুঝতেন, ঘোরপ্যাঁচ জানতেন না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায়ই তিনি কমিউনিজমের দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নে মার্কসীয় বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অসাধারণ বীরত্ব দেখানোর পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যাশায় জাসদে যোগ দিয়ে এর আর্মস ব্যান্ড বিপ্লবী গণবাহিনীর কমান্ডার হয়েছিলেন। তাহের চরিত্রের একটি বড় ঘাটতি ছিল, তিনি মার্কসীয় দর্শনের ব্যবহারিক রূপ নির্ধারণ করতে সক্ষম ছিলেন না এবং এ মতবাদকে যান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হলে বুর্জোয়া সেনাবাহিনীরও বিপ্লবীকরণ দরকার। এ লক্ষ্যে তিনি জাসদে যোগ দেয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনীতে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামে একটি সমান্তরাল সেনা কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। এ সংগঠন খুব বড় আকারের ছিল না, বলা যেতে পারে এটি ছিল নিউক্লিয়াস ধরনের একটি কেন্দ্র।

এবার আমরা ভিডিও ক্লিপে ফিরে আসি। জিয়াকে বন্দি করার পর খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময়টায় (৩ থেকে ৬ নভেম্বর) দেশের পরিস্থিতি ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। কেউ বুঝতে পারছিল না রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে কে চালাচ্ছে, তবে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর ভয়ানক কিছু ঘটে চলেছে তা টের পাচ্ছিল জনতা।

কুয়াশাচ্ছন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে যখন ঠিকমতো কিছুই দেখা যাচ্ছিল না- তখন ১৫ আগস্টের কিলার গ্র“প নিজেরা আক্রান্ত হতে পারে ভয়ে দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার অভিপ্রায়ে জেলের অভ্যন্তরে দলটির ঊর্ধ্বতন চার নেতাকে হত্যা করে গোপনে দেশত্যাগ করে। ওদিকে বাতাসে গুজব ছড়ানো হয়েছে, ভারত ঘটনাপ্রবাহে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এমন এক জটিল ও দুর্বোধ্য সময়ে তাহের তৎপর হয়ে ওঠেন। যোগাযোগ করেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার জেসিও ও এনসিও পর্যায়ের সেনাসদস্য এবং জিয়ার বিশ্বস্ত অনুসারীদের সঙ্গে।

তিনি ফর্মুলা দিলেন- স্ট্রাইক হোয়াইল দ্য আয়রন ইজ হট। তিনি যেহেতু সেনাবাহিনীতে কর্মরত কেউ নন, সেহেতু কর্মরত একজন সেনা কর্মকর্তাকেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে চাইলেন।

সবদিক বিবেচনা করে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও আপাত বিশ্বস্ত, যিনি এর আগে তার অনেক কথার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেছিলেন, সেই জিয়াকেই বেছে নিলেন। এবার প্রশ্ন দেখা দিল, আঘাত তো করবেন, কিন্তু কাকে আঘাত করবেন? জাসদ নেতৃত্ব তাকে ভুল বোঝাল। আজ বলতে দ্বিধা নেই, সিরাজুল আলম খান ওরফে দাদা ভাই ও তার মতো দু’একজন জাসদ নেতার অনেক ভ্রান্ত চিন্তার ফলে এ জাতি বিস্তর ভুগেছে।

যে মুহূর্তে দেশের মানুষ ভারতীয় হস্তক্ষেপের ভয়ে গুটিয়ে থেকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবছিল, জাসদের এ নেতারা তখন তাহেরকে শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্ব বোঝালেন। শ্রেণী সংগ্রাম মানে তা পুঁজিপতির সঙ্গে শ্রমিকের সংগ্রাম, উচ্চবিত্তের সঙ্গে সর্বহারার। তাহের ভাবলেন, ক্যান্টনমেন্টের ভেতর এ দ্বন্দ্বের স্বরূপ অবশ্যই অফিসার বনাম সিপাহি।

তাহেরের অনুসারী বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাই মেতে উঠল অফিসার নিধনে। এ প্রেক্ষাপটেই নিহত হলেন খালেদ মোশাররফ, লে. কর্নেল হায়দারসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা। অফিসার নিধন প্রক্রিয়া বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। এরই মধ্যে জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন তাহের। জিয়ার ওপর অসীম আস্থা রেখে তাহের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণভার সম্পূর্ণরূপে ন্যস্ত করেন তার ওপর।

জিয়াউর রহমান ছিলেন আসলে ইতিহাসের এক বরপুত্র। আর্থিক দুর্নীতিমুক্ত অথচ নিষ্ঠুর প্রকৃতির এ মানুষটি দেশের দুটি মহাক্রান্তিলগ্নে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন কোনোভাবে।

দুই ক্ষেত্রেই তিনি সে দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। একটি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ, অন্যটি ’৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। ৭ নভেম্বরে তিনি ইতিহাসের শুধু নয়, বর পেয়েছিলেন জেনারেল ওসমানীরও। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী সেনাবাহিনীতে আমৃত্যু বিশাল প্রভাব বিস্তার করে রাখতে সক্ষম ছিলেন।

সেনাবাহিনীতে তার জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, ওসমানী ফ্যাক্টরই মূলত নির্ধারণ করত এর গতি-প্রকৃতি। এই ওসমানীর আশীর্বাদ পেয়েই তাহেরকে ছাড়াই জিয়া ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠলেন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর। অন্যদিকে তাহেরের কাছে জাসদ নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েও অভ্যুত্থানের পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমাবেশ ঘটানোয় চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় তাহের শক্তির ভারসাম্যে কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েন। জিয়া তাহেরকে গুড হিউমারে রেখেছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না তার ক্ষমতা সুসংহত করতে পেরেছিলেন।

কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী জিয়া-তাহের ঐক্যফ্রন্ট দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়ল একসময় এবং জিয়া তখন সরাসরি ঘুরে দাঁড়িয়ে পিঠ দেখালেন তাহেরকে। নির্মম রসিকতার সুরে বললেন- বন্ধু আমার, আমি বুর্জোয়া মার্সিনারি আর্মির একজন অফিসার, আমার কাছে বিপ্লব ধরনের কিছু চাইতে এসো না। আমি দুঃখিত।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহ মর্মান্তিক। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্টিকার কপালে সাঁটেন জিয়া। রক্তচক্ষু ঢেকে রাখেন কালো চশমা দিয়ে। তার জীবন রক্ষাকারী তাহেরকে প্রহসনের ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে ঝোলান ফাঁসিতে।

এ-ই তো ইতিহাস। এ লেখাকে আরও বড় করা যেতে পারে। তাতে পাঠকের বাড়তি কোনো সুবিধা হবে না।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter