সুদহার কি নয়-ছয়ে নামবে না?

  মকসুদুজ্জামান লস্কর ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুদ

ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। বেশ কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মালিক সমিতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস স্বপ্রণোদিত হয়ে জুলাই মাসের মধ্যে সুদ আমানতের জন্য ৬ শতাংশে এবং ঋণের জন্য ৯ শতাংশে কমিয়ে আনার ঘোষণা করে।

এই প্রথম ব্যাংক মালিকদের সমিতি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করল। সঙ্গত কারণেই আশা করা গিয়েছিল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের স্বউদ্যোগে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত অচিরেই বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু বাস্তবে এর বাস্তবায়ন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি- এমনটাই লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২১টি ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ সুদ হার হচ্ছে ৬ শতাংশ।

ইতিপূর্বে যুগান্তরে প্রকাশিত একটি লেখায় আমি সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে উল্লেখ করেছিলাম- বোতাম টিপে সব ব্যাংক একসঙ্গে সুদের হার কমিয়ে ফেলবে, এমনটা আশা করা যায় না।

বাজারের শক্তির ওপর সুদের হার ওঠানামা করে। এক সময় সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হতো। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুদের হারের এই নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ে এবং সুদের হার নির্ধারণের ক্ষমতা কয়েকটি খাত ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়।

আর তাই প্রতিটি ব্যাংক তার নিজস্ব বিবেচনায় এবং বাজারের শক্তির ওপর ভিত্তি করে সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। প্রতিটি ব্যাংক তাদের ঘোষিত সুদের হার সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতা হিসেবে অবগত করে থাকে। আর তাই কোনো ব্যাংক তার ঘোষিত হার লঙ্ঘন করছে কিনা, বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটর করতে পারে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে ব্যাংকগুলোর সমিতি যদি নিজেরা সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে, তাতে কোনো বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন হয়েছে এমনটা মনে করার কোনো কারণ যদিও নেই; তবে এটা নজিরবিহীন।

তবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস কর্তৃক নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনমনে তাদের সক্ষমতা ও সদস্যদের ওপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার গ্রাহকের ব্যাংকে জমা দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা নিয়ন্ত্রণের একটা চেষ্টা করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সুকৌশলে অলিখিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যাংককে তাদের সর্বোচ্চ একটা সীমা নির্ধারণ করতে বলে। ব্যাংকগুলো এই অলিখিত নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সমহারে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা অবগত করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোরভাবে এই সুদের হার বাস্তবায়নে মনিটরিং করে এবং এর ফলে ওই সময় সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। আবার উচ্চসুদে আমানত নেয়ার কারণে কোনো কোনো ব্যাংককে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুদের হার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার নজির নেই। আর ব্যাংকারদের কাছে যদি টাকার প্রচুর চাহিদা থাকে এবং জোগান কম থাকে, তাহলে সুদের হার কমানো সহজ বিষয় নয়।

কিছুদিন আগেও সুদের হার এক অঙ্কের নিচে নেমে গিয়েছিল। আমানতের ওপর সুদের হার ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। ফলে আমানতকারীদের ব্যাংকে আমানত রাখার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। ২০১৬ সালে যেখানে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৮ শতাংশ, ২০১৭-এর বছর শেষে তা ১১.৭ শতাংশে নেমে আসে।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে ঋণ বৃদ্ধি পায় ১৮.৯ শতাংশ। আমানত সংগ্রহ কমল অথচ ঋণ বাড়ল- এমন অসঙ্গতিতে নতুন করে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকারদের ঘুম হারাম হবে; এটাই স্বাভাবিক আর এমন পরিস্থিতিতে আমানতের ওপর সুদের হার কমানোর সুযোগ খুব কম।

২০১৭ সালে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বৃদ্ধি পায় ৪৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল মাত্র ২২ শতাংশ। ঋণ ও আমানত বৃদ্ধির এই অসামঞ্জস্যতা পূরণ করা হয় অন্য ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে। অর্থাৎ কিছু ব্যাংকের তারল্য খুব ভালো ছিল, আবার কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট ছিল।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যাংকের কাছে প্রচুর তারল্য রয়েছে এবং এসব ব্যাংক ছয় ও নয়ের হিসাব মেনে চলছে। আবার কিছু ব্যাংক বেপরোয়া হয়ে বাজার থেকে উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ করছে; বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেশি, তারাই বেশি তারল্য সংকটে ভুগছে।

২০১৭ শেষে ঋণখেলাপির পরিমাণ ছিল ৯.৭ শতাংশ, যা ২০১৬ সাল থেকে বেড়েছে মাত্র ০.৪ শতাংশ। কিন্তু ৯ মাসের মাথায় এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১০ শতাংশের ওপর। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের এটাও অন্যতম কারণ।

উচ্চহারে অকার্যকর ঋণে জর্জরিত ব্যাংকগুলো তাদের ন্যূনতম তারল্য সংরক্ষণ ও নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা কোনো বিধিবদ্ধ সুদহারের সীমার তোয়াক্কা না করে বাজার থেকে উচ্চহারে অর্থ সংগ্রহ করে।

মোট ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকটি ব্যাংক যদি বাজার থেকে উচ্চসুদে আমানত গ্রহণ করে, তাহলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অন্য ব্যাংকগুলোও একই পথে পা বাড়ায়। বর্তমান ব্যাংকিং খাতে এমন অবস্থাই বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বর্তমানে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো নয়। যেসব ব্যাংকের উচ্চহারে অকার্যকর ঋণ রয়েছে, ওইসব ব্যাংকের সঞ্চিতি রাখার পরিমাণও বেশি। ব্যাংকের সঞ্চিতির ঘাটতি হয়েছে, এমন ব্যাংকের বেপরোয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সঞ্চিতির ঘাটতি হয় মুনাফা থেকে প্রভিশন পূরণের ব্যর্থতার কারণে।

ঘাটতি পূরণের সহজ উপায় হচ্ছে মুনাফা বৃদ্ধি করা। মুনাফা বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকের নতুন ঋণ প্রদান জরুরি। আর নতুন ঋণ বৃদ্ধির জন্য বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহই একমাত্র ভরসা। তাছাড়া সঞ্চিতির ঘাটতি নেই কিংবা উচ্চ মাত্রার অকার্যকর ঋণ নেই- এমন ব্যাংকও বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে, যদি তাদের ঋণ আমানতের অনুপাত রেগুলেটরি সীমা অতিক্রম করে কিংবা ব্যাংকের প্রচুর ঋণ প্রদানের চাহিদা থাকে।

এসব ব্যাংক অধিক সুদ প্রদান করে হলেও বাজার থেকে অর্থ তুলে নিতে বেশি তৎপর থাকে। অধিক সুদে অর্থ সংগ্রহের পরিণতি হচ্ছে অধিক সুদে ঋণ দেয়া।

সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার তাগিদ আসে ব্যবসায়ীদের সাশ্রয়ী মূল্যে ঋণ প্রদানের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকের সুদ এক ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টার পেছনে এই উদ্দেশ্যটাই প্রধান ছিল। ব্যবসায়ীরাও সরকারের কাছে এমন দাবি করে আসছিল।

কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের সঙ্গে দরকষাকষিতে যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে। কোনো বিশেষ ব্যাংকের প্রতি তাদের আর আগের মতো আনুগত্য ও দুর্বলতা নেই।

সেবার ওপর সুদ ও মাশুল নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা দরকষাকষি করে থাকে এবং সন্তুষ্ট না হলে বর্তমান ব্যাংকের ওপর আনুগত্য ত্যাগে পিছপা হয় না। আর তাই ব্যাংকগুলো তাদের বর্তমান গ্রাহকের সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে, যাতে গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়ে অন্য ব্যাংকের দিকে ধাবিত না হয়।

সামনে ব্যংকগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহের প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাড়বে। আর এসব বিনিয়োগের একটা অংশ ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত থেকে সংগ্রহের চাহিদা থাকবে। অন্যদিকে ঋণখেলাপির হারও বাড়ছে। আর তাই তারল্য ঠিক রাখার জন্য ব্যাংকারদের চ্যালেঞ্জ বাড়বে বৈ কমবে না।

মকসুদুজ্জামান লস্কর : ব্যাংকার; ব্যাংকিং, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক লেখক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×