উন্নয়নের স্বার্থে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন

  ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোট নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। এ পরিবর্তন যেন দুর্নীতিকে এগিয়ে না আনতে পারে। অব্যাহত উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে হবে। উন্নয়নের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে যাতে অন্যের পকেটে ঢুকতে না পারে, সে দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে। যুগ যুগ ধরে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে পকেট ভর্তি করছে, আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, এ ধরনের প্রার্থীদের বয়কট করতে হবে। তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে রাজনৈতিক দল এবং জনগণকে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যেসব দল অংশগ্রহণ করবে, তারা যেন সৎ, যোগ্য, আদর্শবান দেশপ্রেমিক লোককে মনোনয়ন দেয়। অর্থ আর কালো টাকার দাপটে চোরাকারবারি, মাদক পাচারকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ যেন প্রার্থী হতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হতে হবে। অব্যাহত উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে হলে অবশ্যই গতিশীল, দায়িত্বশীল দেশপ্রেমিক সরকার দরকার। যাদের পক্ষে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব তাদেরই ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা জনগণের দায়িত্ব। কোনো ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র যেন দেশের উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকেও সতর্ক থাকতে হবে। উন্নয়ন ও দেশবিরোধী সব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জাতিকে সফল হতে হবে। এ সফলতার মাধ্যমে আগামী দিনের জাতীয় সমস্যা বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী যাতে কর্মসংস্থান পায়, সে চিন্তা এখন থেকে করতে হবে। প্রতিবছর সরকারের এমন পরিকল্পনা করতে হবে যাতে বেশিসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীতে শ্রম রফতানির পথ ছোট হয়ে আসছে। পৃথিবীব্যাপী হু হু করে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে আগামী নির্বাচিত সরকারকে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষিত জনশক্তি নিজ দেশে আত্মমর্যাদার সঙ্গে কাজের সুযোগ পেলে শ্রমশক্তি বিদেশে রফতানি করতে হবে না। নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক হতাশার মধ্যেও জাতির সামনে এক উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাতাসে নানা গুঞ্জনও ভেসে বেড়াচ্ছে। জনগণ সেসব গুঞ্জনে কান দিতে চান না।

চলতি বছরের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু শুধুই সংবিধানের দোহাই এবং নির্বাচনের জন্য নির্বাচন হলে ভালো হবে কি? সার্থক নির্বাচনের জন্য দরকার সব দলের ও সব মতের লোকের অংশগ্রহণ। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য, তবে সরকারকে অবশ্যই সহায়ক হতে হবে। মেয়াদপূর্ণ হওয়ার পর নতুন মেয়াদে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু সেই নির্বাচন কীভাবে হবে? কারা করবে? নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে কি? না আগামী নির্বাচনও ২০১৪ সালের মতো একতরফা হবে? এসব প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেয়ার সময় এখনও আসেনি। সব দলকে নির্বাচনে আনতে প্রথমে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব নাগরিক যেন তাদের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে স্বাধীনভাবে দিতে পারে, নির্বাচন কমিশনকে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তাহলেই দেশে সুখ-শান্তি ফিরে আসবে এবং জনগণ তাদের প্রাপ্য অধিকার ভোগ করতে পারবে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের জন্য আবশ্যিক শর্ত, সবার জন্য মাঠ সমতল করা। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু মতবিনিময় সভা করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নির্বাচন কমিশনকে আগে থেকেই বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা করে সুষ্ঠু ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে, সেই ক্ষেত্রটি তৈরি করার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত সুষ্ঠু নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে একটি সুন্দর সংসদ উপহার দিতে পারে। সব দল অংশ নিলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বজনগ্রাহ্য মতগুলো নিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে দেশ ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা দেশবাসীর। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিকদের কোনো ভুলের কারণে যদি দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়ে, নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যায়, তাহলে ইতিহাস কিন্তু ক্ষমা করবে না। গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বর্তমান সরকার সে গণতন্ত্রের প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেই দেশের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। আর গণতন্ত্র মানে আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার, সুশাসন, মানবিক উন্নয়ন অর্থাৎ একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও সেসব গণতান্ত্রিক চেতনা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ বাংলাদেশে যে কয়টি রাজনৈতিক দল রয়েছে, বিশেষ করে বড় দুই দলের নেতারা যোগ্য ও অভিজ্ঞ, তারা এ দেশেরই সন্তান। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এ দেশের মাটি ও মানুষের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো কারণে যদি বড় দুই দলের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়, তবে নিজেরা বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। রাজনীতিতে বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়া মোটেই ঠিক নয়। আশা করি, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না।

দেশ এখন উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। শহর, গ্রাম, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বলতে গেলে উন্নয়নের একটা গতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ গতিকে কেউ ইচ্ছা করে থামাতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম উন্নয়ন অগ্রগতিতে বিশ্বাসী। দৃশ্যমান উন্নয়ন অগ্রগতিকে তারা সাধুবাদ জানাচ্ছে। অফিস-আদালতে আগের মতো যুগ যুগ ধরে ফাইল আটকে থাকে না। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থা অনেকটা নিয়মের মধ্যে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সব প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছামাফিক ভোগান্তির দিন প্রায় শেষ। অন্যায়, অবিচার, জুলুম করলেই সঙ্গে সঙ্গে এখন তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যতই প্রভাবশালী আর ক্ষমতাধর হোক না কেন, বর্তমান সরকার নিজ দলের হলেও এ ক্ষেত্রে ছাড় দিচ্ছে না। এতে এ প্রজন্মের ভোটারের কাছে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। উন্নয়ন ও শৃঙ্খলায় দেশ যেভাবে সামনের দিকে এগোচ্ছে, এতে সরকারের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই সরকারের সব ধরনের তথ্য বিজ্ঞপ্তি হাতের নাগালেই পেয়ে যাচ্ছে। ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক হানাহানি ও সহিংস কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জনগণ তাদের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে দিনযাপন করতে বাধা পাচ্ছে না। নির্দিষ্ট শ্রেণী ও পেশার মানুষ ছাড়া অন্য জনগণ প্রশাসন ও পুলিশের অতটা হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। একসময় ব্যবসায়ীরা সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভয়ে ব্যবসা করতে পারতেন না। এখন সে ধরনের খবর খুব কমই পাওয়া যায়। ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের বক্তব্য, তারা ভালোভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ইচ্ছামতো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মাসের পর মাস অবরোধ রেখে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে শিক্ষাজীবন ধ্বংস করার কর্মসূচি এখন আর কেউ পালন করতে পারে না। রাজনীতির নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন তাদের নিজস্ব নিয়মনীতিতে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ মাদক বেচাবিক্রি প্রায় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং আন্তরিকতার কারণে এসব সম্ভব হচ্ছে।

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের নির্বাচনমুখী দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। বড় বড় দলের নমিনেশন পেতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করতেও পিছু হটে না। নির্বাচনে একবার জয়ী হতে পারলেই যেন একসঙ্গে দুই হাতে আয় করা সম্ভব। যাদের ন্যূনতম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, এমন প্রার্থীকেও নির্বাচনের প্রার্থী হতে দেখা যায়। যাদের হাতে অবৈধ টাকার পাহাড়, তারা অর্থ দিয়ে বড় বড় দলের নীতিনির্ধারকদের বশ করে দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন।

অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অধিক গুরুত্ব বহন করে। তাই দেশ ও জনগণ সরকারের স্বার্থেই দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিককে বয়কট করার শপথ এখন থেকেই গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ : গবেষক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×