মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিকুলাম সর্বত্র সমানভাবে পালিত হচ্ছে কি?

  মাছুম বিল্লাহ ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিকুলাম সর্বত্র সমানভাবে পালিত হচ্ছে কি?

নভেম্বরের মাঝামাঝি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম- কুষ্টিয়ার কুমারখালী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিদিন সব শ্রেণীতেই আটটি বিষয়ে ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এতে শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা যেমন চাপ সহ্য করতে পারছে না, তেমনি ক্লাসের ব্যাপ্তি কমে যাচ্ছে। এটি শুধু কুমারখালীতেই নয়, দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়েই পাঠদানের ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হচ্ছে না।

পাঠ্যক্রম ২০১২ অনুযায়ী শনি থেকে বুধবার প্রতিদিন ছয় পিরিয়ড ও বৃহস্পতিবার চার পিরিয়ড ক্লাস নেয়ার নিদের্শনা রয়েছে। আর রয়েছে শ্রেণীভিত্তিক পাঠদানের জন্য বিষয় কাঠামো ও সময় বণ্টন, বাড়ির কাজ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, দলগত কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশনা।

কিন্তু তা অনুসরণ না করে নিজস্ব রুটিনেই পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছে অধিকাংশ বিদ্যালয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ নির্দেশনা যে পালিত হচ্ছে না তা দেখার কি কেউ নেই? আমরা জানি উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা দেখভাল করার জন্য অফিসার রয়েছেন, তাছাড়াও একাডেমিক সুপারভাইজার রয়েছেন বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য।

আর সবার ওপরে জেলা শিক্ষা অফিসার তো রয়েছেনই। এসব কর্মকর্তা বোধকরি একাডেমিক বিষয়ের চেয়ে অন্যান্য বিষয়েই বেশি গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন, যার ফলে যে স্কুল যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই চালাচ্ছে তাদের একাডেমিক কর্মকাণ্ড।

দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় একসময় প্রতিদিন আটটি পিরিয়ডেই ক্লাস নেয়া হতো। এ ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতি ক্লাসের ব্যাপ্তি ছিল ৪০ মিনিট। তবে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার পর পাঠদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আসে।

নতুন সিলেবাস ও পাঠদানের জন্য ৪০ মিনিট সময় খুবই অপ্রতুল। ৪০ মিনিটের একটি ক্লাস মানে যেনতেন প্রকারে ক্লাস নেয়া। যেমন একটি শ্রেণীকক্ষে যদি ৪০ শিক্ষার্থীও থাকে এর অর্থ হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী পাচ্ছে এক মিনিট।

আর ৪০ মিনিটের ক্লাসে কি পুরো চল্লিশ মিনিটই পড়ানো হয়? অবশ্যই না। সেখানে প্রস্তুতির ব্যাপার আছে, ক্লাস শেষ করা ও বাড়ির কাজ দেয়ার ব্যাপার আছে। তাছাড়া এক ক্লাসে শিক্ষার্থী তো ৫০, ৬০, ৭০, এমনকি ১০০ জনও আছে। ৪০ মিনিটের ক্লাসে ১০০ শিক্ষার্থীবিশিষ্ট ক্লাস শিক্ষার্থীপ্রতি কত মিনিট/কত সেকেন্ড বরাদ্দ হতে পারে?

এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে পাঠদানের সুবিধার্থে নতুন পাঠক্রমে পিরিয়ড আট থেকে ছয়ে নামিয়ে এনে ক্লাস নিতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথম পিরিয়ডে ৬০ মিনিট এবং অন্যান্য পিরিয়ডে ৫০ মিনিট করে ক্লাস নিয়ে বলা হয়। এটি ছিল একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত; কিন্তু অধিকাংশ বিদ্যালয় এগুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে না।

পাঠদানের ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম অনুসরণ না করা মানে ‘শিখন ফল’ অর্জন সঠিকভাবে না হওয়া। শিক্ষাক্রমে সিলেবাসের আলোকে বছরের মোট কর্মদিবস বিবেচনায় নিয়ে একটি বিষয়ের কোন অধ্যায় কত পিরিয়ডে শেষ করতে হবে, সেটি বলে দেয়া আছে।

সব মিলিয়ে প্রতিটি শ্রেণীর জন্য এক বছরের একটি প্যাকেজ তৈরি করে দেয়া আছে পাঠ্যক্রমে। অতিরিক্ত ক্লাস নেয়ার ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস পরিচালনার নাম ‘টপিক লোড’ বলা যেতে পারে। বেশি ক্লাস নেয়ার চাপ থাকায় শিক্ষকরাও ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারেন না। আর শিক্ষার্থীদের ওপর যখন টপিক লোড পড়ে, তখন তারাও কিন্তু যা শিখছে সেগুলো ডাইজেস্ট করতে পারে না।

শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ পড়ে, জোর করে ক্লাসে থাকলে মাথাব্যথা হয়। আর বেশি বেশি বই ও খাতা বহন করার ফলে শরীরের তুলনায় ব্যাগের ওজন বেশি হয়, ফলে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষাকে আনন্দময় করার জন্য যেখানে এত প্রচেষ্টা, এত প্রশিক্ষণ, এত লেখালেখি, এত আয়োজন, সেখানে কিছুতেই যেন কাজ হচ্ছে না। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া যেন ক্রমেই নিরানন্দের দিকে, প্রাচীনকালের দিকে এগোচ্ছে। এগুলো সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই দেখতে হবে।

দেশে কিছু ভালো মানের বিদ্যালয় আছে, যেখানে প্রথম পিরিয়ড ৫০ মিনিট এবং এর পরেরগুলো ৩৫ মিনিটে করা হয়। টিফিন পিরিয়ডের পরের ক্লাসগুলো ৫০ মিনিটের পরিবর্তে ৩৫ মিনিট করে নেয়া হয়। এসব বিদ্যালয়ে সর্বমোট সাত পিরিয়ড নেয়া হয়। দেশে এখন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে দুই শিফট চালু আছে। এসব বিদ্যালয়ে সব ক্ষেত্রে ৫ মিনিট করে কম সময় নেয়া হয় অর্থাৎ প্রথম পিরিয়ড ৫৫ মিনিট, তার পরেরগুলো ৪৫ মিনিট করে নেয়ার কথা। পিরিয়ডের ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম অনুসরণ না করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম পিরিয়ড ৫০ মিনিট, পরবর্তীগুলো ৪০ ও ৩৫ মিনিট করে নেয়া হয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ বিদ্যালয়ই এক শিফটে পরিচালিত হয়। কারিকুলাম করার ক্ষেত্রে সেসব বিদ্যালয়ই বিবেচনায় নেয়া হয়। দুই শিফটের বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম অনুযায়ী রুটিন করা সম্ভব হয় না এসব বিদ্যালয়ে। এসব বিদ্যালয়ে দেখা যায় শিক্ষকরা ৪০ কিংবা ৩৫ মিনিটেই কভার করে ফেলেন একটি পিরিয়ড। এতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণই বা থাকে কতটুকু, আর একটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ধারণা দেয়ারই বা সময় কোথায়? আমাদের দেশে ৩৬৫ দিনের মধ্যে এনসিটিবির রিপোর্ট অনুযায়ী কর্মদিবস ২৪৭ দিন। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি থেকে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এ কর্মদিবস বিদ্যালয়গুলোতে আসলে ১৮০ দিন; কিন্তু ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় মাত্র ১২০ দিন। এখানেও রয়েছে গ্যাপ। মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে দুটি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার কারণে আরও ২৪ দিন এ সময় থেকে বাদ যায়।

একটি দেশের আবহাওয়ার বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম করা উচিত। কারণ সব ঋতুতে সমানভাবে ক্লাসরুম কার্যাবলি পরিচালনা করা যায় না। শিক্ষার্থীরাও সব ঋতুতে একই মানসিকতা নিয়ে ক্লাসরুম কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে না। আর আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ রয়েছে। কানাডায় সেপ্টেম্বর-জুন, ইংল্যান্ডে সেপ্টেম্বর-জুলাই, জাপানে এপ্রিল-মার্চ, দক্ষিণ আফ্রিকায় জানুয়ারি-ডিসেম্বর, সুইডেনে ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ আগস্ট, নিউজিল্যান্ডে ১ ফেব্রুয়ারি-১৫ ডিসেম্বর। বাংলাদেশে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ। তবে, এসএসসি পরীক্ষার পর উচ্চমাধ্যমিকে বিষয়টি একটু ভিন্ন। আমাদের দেশে বছরের শুরুর দিকে এবং শেষের দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম থাকে বলে শিক্ষা কার্যক্রম ওই সময়ে ভালোভাবে হওয়ার কথা। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ দেয়ার উপযুক্ত আবহাওয়া যখন পায়, তখনই তারা বিভিন্ন রকম কো-কারিকুলাম কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, বৈরী পরিবেশে সেটি পারার কথা নয়। যেমন বাইরে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, তখন খুব মনোযোগসহকারে শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারে না, শিক্ষকরাও পারেন না ক্লাস পরিচালনা করতে। আমাদের দেশ যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগের, আমাদের শ্রেণীকক্ষ কার্যক্রমও সেই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে করা উচিত। আবার হাওর এলাকার চিত্র অন্যরকম। পুরো দেশ যখন শুকনো থাকে, তখন দেখা যায় নৌকা ছাড়া হাওর এলাকার বাচ্চারা স্কুলে আসতে পারে না। একইভাবে হাওর এলাকার ফসল ফলানোর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এগুলো মাথায় নিয়েই আমাদের বার্ষিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত ক্লাস রুটিন ও পিরিয়ড দেয়া আছে শিক্ষাক্রমে। এগুলো দেখার জন্য, মনিটরিংয়ের জন্য জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও একাডেমিক সুপারভাইজার রয়েছেন আর সার্বিকভাবে আছে মাউশি। শ্রেণীকক্ষে সময়সূচি অনুযায়ী পাঠদান ছাড়াও শিক্ষকদের আরও কিছু কাজ করতে হয়। এ ছাড়া বইয়ের বাইরেও বিভিন্ন অ্যাকটিভিটির মাধ্যমে ক্লাস নিতে হয় একজন শিক্ষককে। আর শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে হাজার হাজার বিদ্যালয়ে। শিক্ষকস্বল্পতা মানে হচ্ছে যেসব শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ে আছেন, তাদের ওপর ক্লাস নেয়ার চাপ আরও বেশি হওয়া। শিক্ষার মান নিম্নগামী হওয়ার অন্য কারণগুলোর মধ্যে এগুলোও কম দায়ী নয়। এ বিষয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এবং পেশাগতভাবে যাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখতে পারেন, সে বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর গুরুত্বের সঙ্গে নেবে বলে আমরা আশা রাখি। দেশে চলছে নির্বাচনী হাওয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা সরকার গঠন করার দায়িত্ব পাবেন, তারাও শিক্ষার সমস্যাগুলো বাস্তবতার নিরিখে সমাধান করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।

মাছুম বিল্লাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক : সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×