অঙ্গীকার ভঙ্গকারী দল বা সংসদ সদস্যদের শাস্তি কী?

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. মইনুল ইসলাম

নির্বাচন আসন্ন। দেশে নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে। নতুন সরকার আসবে। সে সরকার যেন একটি সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন, তাই এতদিনকার নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে।

এর পেছনের বড় কারণ আমাদের নির্বাচনের ইতিহাসকে কারচুপি, কারসাজি ও ষড়যন্ত্র বেশ কয়েকবার কলঙ্কিত করেছে। আলোচনা-সমালোচনা এখনও চলছে এবং এটার একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে দেশবাসী এ ব্যাপারে সচেতন এবং আগ্রহশীল।

গণতন্ত্রের দাবিদার সব দেশেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকে। আমাদের দেশেও আছে। তার মধ্যে বড় দুটি দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে মোটামুটি নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশে সরকারের পরিবর্তন হচ্ছিল।

এর মধ্যে বিএনপি তাদের দ্বিতীয় শাসনকাল অবসানের শেষ দিনগুলোতে আবারও ক্ষমতায় আসার মানসে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও কারসাজির পরিকল্পনা করছিল।

ফলে ব্যাপক গণরোষের কারণে সেনাবাহিনীর সমর্থনে দু’বছরের জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনা করে। ২০০৮-এর শেষ দিকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

এরপর থেকে গত ১০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট দেশ পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে ক্ষমতাসীনদের অনির্বাচিত সরকার আখ্যায়িত করে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত দেশবাসী শেখ হাসিনার সরকারকে মেনে নেয়। তারই সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে। তাই ৩০ ডিসেম্বর আরেকটি জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় না।

নতুন এবং উন্নত জীবনের প্রত্যাশা নিয়েই মানুষ নতুনকে স্বাগত জানায়। আসন্ন নির্বাচন দেশবাসীকে নতুন এবং উন্নত মানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং জীবনমান উপহার দেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

কারণ গত ১০ বছর ধরে দেশে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, তা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা সে উন্নয়নধারা শুধু অব্যাহত থাকুক তাই নয়, তা আরও গতিশীল হোক। আমাদের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) এতদিনকার ৭.৫ শতাংশ থেকে তা আগামী ৫ বছরে ৯.৫ শতাংশে উন্নীত হোক, এটাই আমাদের কাম্য।

আমরা স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল (Developing) দেশে পা রেখেছি। সেটা উন্নত দেশে (Developed Country) পরিণত হোক, এটা আমাদের একান্ত প্রত্যাশা এবং সেটা আগামী সরকারেরও হোক সুদৃঢ় অঙ্গীকার।

বর্তমান সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে দেশবাসী অনেকটা সন্তুষ্ট। যুগ যুগ ধরে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত একটি দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে এবং তার কিছু সুফল বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটা যে বেজায় আনন্দের ব্যাপার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশও জাতির ভাগ্যোন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্রচালকদের, বিশেষ করে প্রধান চালকের ঐকান্তিকতা ও আন্তরিকতাকে প্রশংসা না জানিয়ে পারা যায় না। তবে মানুষ চায় এ অর্জন শুধু অব্যাহত থাকুক তাই নয়, তা আরও ত্বরান্বিত হোক।

কিন্তু রাষ্ট্র এবং সরকারের কাছে মানুষ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই চায় না। দারিদ্র্যের যেমন অবসান চায়, তেমনি চায় মৌলিক গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকারগুলোরও উন্নয়ন। তাই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়ন বলতে উভয় ধরনের উন্নয়নকেই বোঝায়।

প্রথমত আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা দারিদ্র্যবিমোচন চাই। তবে তার সঙ্গে রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতায়নও চাই। এছাড়া রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ক্রমাগত গণতান্ত্রিক এবং জনদরদি হোক, এটাও হবে আমাদের কাছে উন্নয়নের মাপকাঠি।

সুশাসন বা Good governance গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। দেশে একদল রাজনীতিক ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একমাত্র নির্বাচনকেই গণতন্ত্র বলে প্রচার করে। ফলে গণমানুষের মনে এটি বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে নির্বাচনই গণতন্ত্র।

এ ধারণা সৃষ্টির ফলে সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের (যাদের একটি বড় অংশই ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ) যা লাভ হয়েছে তা হল নির্বাচন তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়া সহজ করে। রাষ্ট্রকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করে নয়, বরঞ্চ নিজেদের সম্পদ এবং ক্ষমতা অর্জনের উপায় হিসেবে তারা ব্যবহার করে।

এটা গত ৮-১০ দিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্বাচনে মনোনয়ন প্রার্থীদের হরেকরকমে অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত ধনী হওয়ার খবরগুলো দেখলেই বোঝা যায়। এ কারণেই ৯ ডিসেম্বর সিপিডি’র বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নির্বাচনকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর গবেষণা ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

নির্বাচনে প্রার্থীদের এমন বিপুল উৎসাহ এবং ব্যয়ভার বহন কেবল জনসেবার অভিপ্রায়ে, সেটা আমাদের মতো দরিদ্র দেশের প্রেক্ষাপটে সহজে বিশ্বাস করা যায় না। বরঞ্চ এটা যে এক ধরনের বিনিয়োগ এবং এর সঙ্গে বিরাট অঙ্কের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা জড়িত তা অবিশ্বাস করা যায় না।

এর ব্যতিক্রম নেই তা বলা যাবে না। তবে ব্যবসা এবং লাভের প্রত্যাশাটাই যে বহুলাংশে এর মূল চালিকাশক্তি তা অস্বীকার করা যাবে না।

তাই উন্নয়নের যুদ্ধটিকে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে রাজনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিচালনা করতে হবে। সুশাসন (Good governance) এবং সুসরকারের (Good government) সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে যোগ করতে হবে।

এগুলো হল- ১. আইনের শাসন (Rule of Law), ২. জবাবদিহিতা Accountability, ৩. স্বচ্ছতা (Transparency), ৪. কার্যকারিতা এবং দক্ষতা (Effectiveness and efficiency), ৫. অন্তর্ভুক্তিমূলকতা (Inclusiveness), ৬. অংশগ্রহণমূলকতা (Participatoriness) এবং ৭. Responsiveness (উত্তরদানের মানসিকতা)। এসবই সুশাসনের অংশ। তবে দেশে দুর্নীতি আমাদের সমধিক পীড়া দেয়।

জার্মানিভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআই’র মতে বিশ্বের সেরা ২০টি দুর্নীতিবাজ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ইদানীং অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। টিআই’র মতে ২০১৬ সালে দুর্নীতিতে আমাদের অবস্থান ছিল ১৪৫তম। তা দুই ধাপ হ্রাস পেয়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ১৪৩তমে।

আগামী সরকার দেশকে এ দুর্নামের হাত থেকে রক্ষা করবে, এটা আমাদের বড় প্রত্যাশা। এটা তখনই সম্ভব যখন দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। অথবা অন্তত সুশাসনের প্রক্রিয়াটি জোরদার হবে।

এটি জোরদার হলে দেশে ধনী-গরিবের মধ্যে বিরাজমান এবং বর্ধমান বৈষম্যটিও হ্রাস পাবে। কারণ দুর্নীতিই দেশে ধনীদের দ্রুত ধনবান হওয়ার একটি বড় কারণ বৈষম্য হ্রাস পেলে দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নও জোরদার হবে।

দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও আন্তরিকতা এবং দক্ষতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিতকরণের মাধ্যমে আগামী সরকার মানুষের কাছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আদর্শ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। অতীতে যেমন দেখেছি, তেমনি আসন্ন নির্বাচনেও দেখব রাজনীতিকদের অসংখ্য সুবাক্য ও প্রতিশ্রুতির বন্যা।

ক্ষমতায় গেলে এর কতটা তাদের মনে থাকবে এবং বাস্তবায়িত হবে সে ব্যাপারে মানুষের মনে যথেষ্ট সংশয় আছে। মহাজোট সরকার অবশ্য অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাদের আন্তরিকতা অনেকটা প্রমাণ করেছে।

তবে নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি প্রাধান্য পায় তা হল নির্বাচনী ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি পালন না করলে অমান্যকারীদের কীভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।

কারণ আমাদের মতো দেশে সংসদ এখনও ততটা শক্তিশালী হয়নি। সচেতন সুশিক্ষিত সুশীল সমাজেরও একই অবস্থা। গণমাধ্যমকেও মাঝে মাঝে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। তবু তাদেরই গণমানুষের কথা অনেকটা বলতে দেখা যায়।

গণমানুষের অশান্তি বা অসন্তোষের কথা নির্বাচনের পর প্রায়ই দল বা সাংসদদের কণ্ঠে শোনা যায় না। অথচ ভোটের সময় তারা এসব বিষয়ে বেজায় সরব থাকে এবং ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দেয়। এর প্রতিকার কী?

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়