মালাক্কা ডিলেমা, বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা সমস্যা

  মো. আমীর হোসেন এবং শ.ই. শামীম ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মালাক্কা ডিলেমা, বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা সমস্যা
ছবি: সংগৃহীত

‘মালাক্কা ডিলেমা’ কি এক সময় বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে? সিরিয়ার যুদ্ধ শেষ হলে আমেরিকা কোথায় নতুন যুদ্ধ শুরু করবে? তা কি ঘটতে পারে বঙ্গোপসাগরে, বাংলাদেশের বাহির বাড়ির উঠানে? বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই দেখে নেয়া যাক ‘মালাক্কা ডিলেমা’ কী এবং এটি কতটা ঝামেলা পাকাতে পারে।

২০০৩ সালে তখনকার চীনা প্রেসিডেন্ট হু জিন তাও সর্বপ্রথম ‘মালাক্কা ডিলেমা’ কথাটি চালু করেন। আরও আগে ১৯৪২-৪৩ সালে চীনারা মালাক্কা ডিলেমার বেকায়দাটা ভালোমতো টের পেয়েছিল। বাংলাদেশের কাছেই (দক্ষিণ-পূর্ব দিকে) ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মাঝের সরু সমুদ্র প্রণালীটি হচ্ছে মালাক্কা প্রণালী। এ প্রণালী হল ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে ও চীন সাগরে যাওয়ার প্রধান ও সংক্ষিপ্ততম সমুদ্রপথ।

প্রতিবছর ৬০ হাজারেরও বেশি জাহাজ চলাচল করে এ সরু সমুদ্র প্রণালী দিয়ে। গোটা বিশ্বের বার্ষিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ ঘটে এ সমুদ্রপথ দিয়ে। এর চেয়েও বড় বিষয় হল- চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদার শতকরা ৮০ ভাগই এ পথে আরব দেশ (মধ্যপ্রাচ্য) থেকে চীনে আসে। এ জন্য চীনের যত মাথাব্যথা! কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের শত্রুপক্ষ এ মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে এ প্রণালীর নৌপথে চীনের জাহাজ চলাচল কঠিন ছিল। কার্যত চীন তখন ছিল জাপান দ্বারা অবরুদ্ধ।

ওই সময় বাংলাদেশসহ গোটা ভারতবর্ষই ছিল ব্রিটিশের অধীনস্থ উপনিবেশ, আর ব্রিটিশরা তখন ছিল চীনের বন্ধু। আমেরিকাও ছিল চীনের পক্ষে। যে কারণে আমেরিকান জেনারেল স্টিলওয়েলের নেতৃত্বে আমেরিকান সৈন্যরা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতায় অবস্থান নিয়েছিল আর তাদের পাইলটরা বিমানে করে ‘হিমালয়ের কুজে’র (সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা) ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মালামাল ‘এয়ার লিফট’ (বিমান দ্বারা পৌঁছানো) করে অবরুদ্ধ চীনকে স্বস্তি দিয়েছিল। তবে এখন আর সেই খাতির নেই।

ভারত, আমেরিকা, জাপান ও ব্রিটেন এখন চীনকে ভয়ের চোখে দেখে। তারা উপরে উপরে চীনের সঙ্গে বন্ধুভাব দেখালেও সময় মতো যে শত্রুতা করবে, চীন তা ভালোভাবেই বোঝে। তাই আগামীতে মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ হলে ভারতের ওপর দিয়ে ‘এয়ার লিফট’ পাওয়া যাবে না- এটা চীনের কাছে পরিষ্কার।

১৯৭৮ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট দেং জিয়াও পিংয়ের করা সংস্কারের ফলে চীন দ্রুত শিল্পায়িত হয়েছে, জনসংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মালাক্কা প্রণালীর সমুদ্রপথে চীনের জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের চাপও দিন দিন বাড়ছে। এভাবে চীনের কাছে মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্ব ও নির্ভরতা যতই বাড়ছে, চীনের প্রতিপক্ষরা ততই মালাক্কা প্রণালীতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে; যেমন- এ অঞ্চলে আমেরিকার বড় নৌঘাঁটি ছিল ফিলিপাইনে। কিন্তু ১৯৯১ সালের দিকে তা এগিয়ে সিঙ্গাপুরে আনার সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকা। আর এ সিঙ্গাপুর হচ্ছে মালাক্কা প্রণালীর একদম দক্ষিণ মুখে- যা বঙ্গোপসাগরের পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারও বটে!

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দ্রুত হামলা চালিয়ে সিঙ্গাপুর দখল করেছিল, যার দরুন চীন অবরুদ্ধ হয়েছিল। আবার মালাক্কা প্রণালীর উত্তর-মুখে দীর্ঘ শিকলের মতো দাঁড়িয়ে আছে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপমালা। সেখানে পোর্ট ব্লেয়ারে আছে ভারতের শক্ত সামরিক উপস্থিতি। এসব কারণে মালাক্কা প্রণালীর প্রতিটি মুখই বলতে গেলে চীনের প্রতিপক্ষদের কব্জায়। তদুপরি মালাক্কা প্রণালীর ভেতরে আন্তঃদেশীয় জলদস্যুদের উৎপাত দিনে দিনে বাড়ছে, যা এ প্রণালীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচলকে ক্রমাগত কঠিন করে তুলছে। এ প্রণালীর আশপাশেই রয়েছে মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশের এমন কিছু এলাকা- যেখানে মুসলিম, বৌদ্ধ এমনকি খ্রিস্টান সশস্ত্র চরমপন্থী দল-উপদলের অবাধ বিচরণ রয়েছে। এ চরমপন্থীরা এক সময় জলদস্যুদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে এ আশঙ্কায় আমেরিকা ও জাপান মালাক্কা প্রণালীর সাগরপথে নৌ ও বিমান টহলদারি চালু করতে চাইছে। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তা করতে দিতে রাজি নয়।

মালাক্কা প্রণালীর এহেন নাজুক পরিস্থিতির কারণে চীন বেশকিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প পদক্ষেপ নিয়েছে; প্রথমত- নিজ দেশের খনি থেকে তোলা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি রাখাইনের ‘স’ (Shew) সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে নিয়ে যাওয়া, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী উৎপাদনের প্রসার ইত্যাদি। এগুলো মূলত মালাক্কা প্রণালী পথে আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পদক্ষেপ। এছাড়া জ্বালানি তেলের আপৎকালীন চাহিদা পূরণের জন্য কৌশলগত মজুদ হিসেবে ২০০৪ সালে চীন তার পূর্বাঞ্চলীয় গুং ডং ও হাইনান প্রদেশে চারটি এসপিএস (SPS- Strategic Petroleum Stockpile) তৈরির উদ্যোগ নেয়, যেগুলোতে গোটা চীনের ২০ থেকে ৩০ দিনের চাহিদা পূরণের মতো জ্বালানি তেল মজুদ করা সম্ভব বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এগুলো স্থায়ী সমাধান নয়।

যতদূর জানা যায়, ১৯৭৭ সালের দিকে চীন সরকার মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে নতুন ট্রানজিট নৌপথ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। চেষ্টা করেছিল আন্দামান সাগর থেকে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ‘ক্রা ইসথমুসে’র ওপর দিয়ে থাই উপসাগর পর্যন্ত দু’লেন বিশিষ্ট একটা কৃত্রিম খাল খননের। সেই খালের সমান্তরালে নির্মাণ করা হতো পূর্ব-পশ্চিমমুখী মহাসড়ক। মহাসড়কের দু’প্রান্তে থাকতো দুটি পোতাশ্রয়, দুটি তেল শোধনাগার এবং দুটি সংরক্ষণাগার। ভাবা হয়েছিল- এতে অনেক কর্মসংস্থান হবে, তেল শোধনাগার ও ট্রানজিট বাবদ অনেক রাজস্ব আসবে, এমনকি বিশ্ব অর্থনীতিও এতে অনেক সুফল পেত। ধারণা করা হয়, এ পথে জাহাজের ২-৩ দিনের চলার সময় বেঁচে যেত। এসব কারণে এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘এশিয়ার পানামা খাল’। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভূ-রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা বাংলাদেশের অনেক দূর দিয়ে বইতো। আমরা ও রোহিঙ্গারা বেশ স্বস্তিতে থাকতে পারতাম। কিন্তু বিধি বাম! আর্থিক, কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ২০০১ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১০-১২ বার এ প্রকল্পের কাজ থমকে থাকে। এরপর ২০০৩ সালে তখনকার থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এ প্রকল্পে অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকল্পটিকে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করেন।

এরপর চীন মরিয়া হয়ে ভিন্ন পথ ধরে। এখন তাদের লক্ষ্য মালাক্কা প্রণালীকে একদম এড়িয়ে নিজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমদানিকৃত তেল-গ্যাস সরাসরি পৌঁছানো। আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপের কিছুটা দক্ষিণ-পূর্বে রাখাইনের (সাবেক আরাকান) সিত্তাওয়ে (প্রাচীন আকিয়াব) বন্দরের কাছে মেড দ্বীপে জ্বালানি তেলের টার্মিনাল তৈরি করেছে চীন। একই সঙ্গে চীন পাশের কিয়াকপিউ দ্বীপে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং এর লাগোয়া অঞ্চলে স্পেশাল ইকোনমিক জোনও তৈরি করেছে। এগুলো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির অংশ। এর কিছুটা দক্ষিণ-পূর্বে পূর্বোল্লেখিত আন্দামান সাগরের ‘স’ গ্যাসক্ষেত্রে ৯.১ ট্রিলিয়ন কিউবিক গ্যাস সঞ্চিত রয়েছে- যার ৮০ শতাংশ পাবে চীন, বাদবাকি ২০ শতাংশ মাত্র থাকবে মিয়ানমারের ভাগে! এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে চীনের কুনমিং প্রদেশ হয়ে গোঞ্জেহ প্রদেশ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন বসানো হয়েছে, যা দিয়ে এখন বছরে ২০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সঞ্চালিত হচ্ছে।

আরাকানের মেড দ্বীপে চীনের জ্বালানি তেলের টার্মিনাল থেকে কুনমিং প্রদেশ পর্যন্ত বসানো হয়েছে দীর্ঘ পাইপলাইন। জানা যায়, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে যখন রোহিঙ্গা উচ্ছেদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, তখন এ টার্মিনালে প্রথম সৌদি অশোধিত তেল খালাস করা হয়েছে। রাখাইন থেকে চীন পর্যন্ত রেললাইন বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে, তবে বিভিন্ন আপত্তির মুখে তা এখনও হয়ে ওঠেনি।

শান্তিবাদী বাংলাদেশের জন্য চীনের এসব কর্মযজ্ঞ কোনো দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। তবে ভাবনা হল, চীনের প্রতিপক্ষরা এ বিষয়ে কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে? প্রবল দু’পক্ষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশই বা কি কৌশল গ্রহণ করবে? সময়টা এখন চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের! অতীতে অনেক বাণিজ্যযুদ্ধই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্রযুদ্ধের পরিণতি লাভ করেছে। চীন সাগরে আমেরিকা ও চীনের যুদ্ধজাহাজ এরই মধ্যে কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছে। ওদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে আগাম হুমকি দিয়েছেন, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের রাজকীয় নৌবাহিনী চীন সাগরে নামানো হবে। সম্ভবত আগামী বছর ব্রেক্সিট শেষ হবে এবং এটা হয়ে গেলে ব্রিটেন আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে থাকবে না বিধায় তখন ব্রিটেন অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ-বিবাদে জড়াতে পারবে নিজ ইচ্ছেমতো!

এ সময়ের আগে চীনকে ঘেরাও করার জন্য আমেরিকা এখন চীনের আশপাশে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে দহরম-মহরম শুরু করতে চাইছে। ভিয়েতনামও এখন যোগ দিয়েছে আমেরিকান শিবিরে; অথচ বছরের পর বছর পরমাণু অস্ত্র ছাড়া রাসায়নিক অস্ত্র ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’সহ যতরকম অস্ত্র আমেরিকার ভাণ্ডারে ছিল, তা এই ভিয়েতনামে ফেলেছিল আমেরিকা। শেষতক ১৯৭৪ সালে ভিয়েতনাম গেরিলারা বিজয়ী হলে ভিয়েতনামে আমেরিকার দখলদারিত্বের অবসান ঘটে। আন্তর্জাতিক দলাদলির তোড়জোড়ে সেই রক্তাক্ত ইতিহাস এখন ভুলতে বসেছে ভিয়েতনাম। এহেন আন্তর্জাতিক দলাদলি কি ঝড়ের ইঙ্গিত বহন করে?

প্রশ্ন হল, আমাদের দুয়ারে এমন অঘটন ঘটলে বাংলার মানুষের জন্য তা কতটা ক্ষয়ক্ষতি বয়ে আনতে পারে? মনে রাখতে হবে- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলার মাটিতে কোনো যুদ্ধ হয়নি; তবুও যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় এ বাংলায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে! তখন মানুষ কম ছিল আর বাংলা ছিল গ্রামনির্ভর, গ্রামের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তার চারপাশের প্রকৃতি থেকে সংগ্রহে সক্ষম ছিল বলে অভাব সহজে সামাল দিতে পেরেছে। এখন মানুষ বেশি, এর উপর উৎপাদনবিমুখ শহুরে জীবন আমদানিনির্ভর বিধায় দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে, যা দুশ্চিন্তার বিষয় বৈকি!

চীনের এ বিশাল প্রকল্পগুলোর আশপাশে ছিল বাস্তুচ্যুত হওয়া অনেক রোহিঙ্গার বসবাস। কে জানে হয়তো সে জন্যই রোহিঙ্গা সমস্যায় চীন সরব হয়নি! অন্যদিকে চীনের ওই প্রকল্পগুলোর উত্তরে এবং বাংলাদেশের সীমান্তের দক্ষিণে রাখাইনের যে সরু উত্তর-পূর্বমুখী ভূখণ্ড রয়েছে, তার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে কালাদান নদী। এ নদীকে ঘিরে বাস্তবায়িত হচ্ছে ভারতের ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’। উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম মিজোরাম অঞ্চলে মালামাল পৌঁছানোর জন্য রাখাইনের মাটিতে ভারত এ প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। যদি কখনও ‘চিকেন নেক’ পথে অথবা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট পথে পূর্ব ভারতে মালামাল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে এ ‘কালাদান প্রকল্প’ হতে পারবে বিকল্প পথ। এ ছাড়া রাখাইনে চীনের মহাপ্রকল্পগুলোর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারতকে সুরক্ষিত রাখার জন্যও কালাদান প্রকল্পের গুরুত্ব থাকতে পারে।

আরাকানের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় অংশটির বসবাস ছিল এ কালাদান প্রকল্প অঞ্চলে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের নীরবতার অন্তত একটি কারণ এতে নিহিত থাকতে পারে। অসহায় রোহিঙ্গারা জানে না, কিভাবে এ ভূ-কৌশলগত দ্বন্দ্ব^ থেকে তারা রেহাই পাবে। সিরিয়া যুদ্ধে কে বা কারা কলকাঠি নাড়ে, তা বুঝতে পারলে বিপদটা সহজে অনুভব করা সম্ভব! রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপের কাছে বিক্রি করতে হলে সিরিয়ার ওপর দিয়ে পাইপলাইন বসাতে হবে। অন্যদিকে ইরাককে রক্তাক্ত করে আমেরিকা ইরাকের তেল-গ্যাসে ভাগ বসালো। এরপর আমেরিকার সাধ জাগলো ইউরোপে ওই গ্যাস বিক্রির পাইপলাইন বসানোর; কিন্তু রাশিয়া কিছুতেই তা হতে দেবে না। কারণ ইরাকের গ্যাস আমেরিকা ইউরোপে বিক্রি করলে রাশিয়ার গ্যাস কেনার খরিদ্দার থাকবে না। অতএব, সিরিয়া রক্তাক্ত হল! বলি হল সিরিয়ার নিরীহ নাগরিক- যারা ঘটনার কোনো পক্ষই না! কথায় বলে, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’।

কোনো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের পক্ষে এ ধরনের ভূ-কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়, তবে খাপ-খাইয়ে চলার কৌশল অবলম্বন করে টিকে থাকা যায়। দেশের ভেতরে কলহ-কোন্দল-মতভেদ কম থাকলে, সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কম থাকলে তা আরও সুফলপ্রদ হয়। বিভাজিত জনগণকে নিয়ে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করা দুষ্কর। সঠিক চর্চার অভাবে বিশ্বের দেশে দেশে ‘গণতন্ত্র’ এখন বিভাজনতন্ত্রের রূপ ধারণ করতে চলেছে। উত্থান ঘটছে ‘পপুলারিজম’-এর, যা সহজেই হঠকারিতা কিংবা চরমপন্থার ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। এহেন বিরূপ অবস্থায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভেদ-অনৈক্য দূরে ঠেলে দেবে, এতটা আশা করা যায় না। তবে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ যদি সম্ভব নাও হয়, অন্তত ঘরোয়া/সামাজিক পর্যায়ে হলেও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিকল্প যোগাযোগের চ্যানেল থাকা দরকার- যেখানে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ (উভয় সংকট) জনিত উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কলাকৌশল আগাম নির্ধারণ করা যাবে।

আমাদের সুশীল সমাজের কাছে এ বিষয়ে কিছু আশা করা যায় না। কারণ এ শ্রেণীর বেশিরভাগ সদস্য দাতাদের বেঁধে দেয়া এজেন্ডার বাইরে তেমন কিছু বলেন না; এ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তাও নেই। কেননা, তাদের পাসপোর্টে অনেক বিদেশি ভিসা লাগানো থাকে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এটা বড় সমস্যা; যাদের দেশের বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নিজের বোঝা নিজেকেই বইতে হবে!

মো. আমীর হোসেন এবং শ. ই. শামীম : আইনজীবী ও গবেষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×