যে ঋণ শোধ হওয়ার নয়

  জেড এ এম খায়রুজ্জামান তপু ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যে ঋণ শোধ হওয়ার নয়
শহীদ আরএএম খায়রুল বাশার ও আছির উদ্দিন আহমেদ

এখন বিজয়ের মাস। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের রক্তের ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। বিএ ৬৯৬৬ শহীদ আরএএম খায়রুল বাশার এএসসি তেমনই একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি সেনা কর্মকর্তা।

১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন স্টেশন সাপ্লাই ডিপোর (এসএসডি) অফিসার কমান্ডিং ছিলেন। চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম এ বাঙালি সেনা কর্মকর্তার অধীন স্টেশন সাপ্লাই ডিপো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বালুচ রেজিমেন্ট কর্তৃক আক্রান্ত হয়। লক্ষ্য ছিল ক্যাপ্টেন বাশারের হাত থেকে স্টেশন সাপ্লাই ডিপোর নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেয়া। কিন্তু ক্যাপ্টেন বাশার তার অধীনস্থ সৈনিকদের নিয়ে পাকিস্তানিদের আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করে শত্রুদের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন।

সে সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা ক্যাপ্টেন বাশারের বীরত্বের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনিই সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তার এক বছর বয়সী কন্যাসন্তানের প্যারাম্বুলেটরে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড্ডয়ন করে সারা সেনানিবাস এলাকা প্রদক্ষিণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন বাশারের বীরত্বগাথা সর্বজনবিদিত। তার অসম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টের একটি সড়ক (সাবেক স্টাফ রোড) ক্যাপ্টেন বাশার রোড, খুলনা জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্টের প্রধান ফটক শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার গেট, খুলনা জাহানাবাদ ক্যান্টমেন্টের শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার মার্কেট এবং নীলফামারীতে শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার তোরণ স্থাপিত হয়েছে। নীলফামারী জেলা শহরের এ সূর্যসন্তানটি বাংলাদেশের অহংকার।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) একটি শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’, যেটি হানিফ সংকেতের দক্ষ পরিচালনায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। নিকট অতীতে ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে ‘নীলফামারী পর্ব’ (এপিসোড) প্রচারিত হয়। সেখানে নীলফামারী জেলা শহরের প্রবেশমুখে নির্মিত শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার তোরণটির ফ্ল্যাশ দেখানো হলেও ক্যাপ্টেন বাশারের বীরত্বগাথা নিয়ে কোনো তথ্য প্রদান করা হয়নি।

তেমনি শহীদ ক্যাপ্টেন বাশারের স্বনামধন্য পিতা এতদঞ্চলের কিংবদন্তি প্রধান শিক্ষক শিক্ষাগুরু আছির উদ্দিন আহমেদ সাহেবের ব্যাপারেও নীরবতা পালন করা হয়। অথচ নীলফামারী মানেই আছির উদ্দিন আহমেদ। এখানকার চল্লিশোর্ধ্ব বা পঞ্চাশোর্ধ্ব কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে তারা তাদের হেড স্যার আছির উদ্দিন আহমেদকে চিনবেন না, এটা অবিশ্বাস্য। ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে প্রতিকৃতিসহ দেখানো হয়েছে পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খয়রাত হোসেন, নীলফামারী গার্লস হাই স্কুলের (বর্তমান সরকারি গার্লস হাই স্কুল) স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক আবু নাজেম মোহাম্মদ আলী এবং বিশিষ্ট পল্লী সঙ্গীতশিল্পী হরলাল রায়কে। তাদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হলেও নীলফামারী হাই ইংলিশ স্কুলের (বর্তমানে নীলফামারী গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল) প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক আছির উদ্দিন আহমেদ ও তার সুযোগ্য সন্তান শহীদ ক্যাপ্টেন বাশারকে এড়িয়ে নীলফামারীর খণ্ডিত ইতিহাস প্রচারিত হয়।

শত শত প্রাণপ্রিয় ছাত্রকে নিজ সন্তান জ্ঞান করে শিক্ষাগুরু আছির উদ্দিন আহমেদ অকাতরে জ্ঞান বিতরণ করেছেন। সেসব শিক্ষার্থী এখন ভারত, ব্রিটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং মানব কল্যাণে অবদান রাখছেন। সেই শিক্ষার্থীদের অনেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বসবাস করেন। তাদের অনেকেই বিটিভির ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে ‘নীলফামারী পর্ব’ দেখে এই লেখকের কাছে ফোন করে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তারা এমনও বলেছেন, ‘হেড স্যারের’ স্থান তাদের হৃদয়জুড়ে, সেখান থেকে তার নাম কখনই মোছা যাবে না। আর যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবেন।

স্বাধীনতার শহীদ ক্যাপ্টেন বাশারের রক্তঋণ যেমন কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়, তেমনি শিক্ষাগুরু আছির উদ্দিন আহমেদের জ্ঞান বিতরণের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। তারা দু’জনেই অমর। শিক্ষাগুরু আছির উদ্দিন আহমেদ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন বাশারের নাম নীলফামারী তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

জেডএএম খায়রুজ্জামান তপু : সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×