নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

অর্থনীতিতে নির্বাচনী উত্তাপ কতটা

  ড. আর এম দেবনাথ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অর্থনীতিতে ‘নগদ টাকার’ প্রবাহ বেড়েছে বলে যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি বেরিয়েছে গত বৃহস্পতিবার। এ প্রতিবেদনে মোটামুটি তিনটি খবর স্থান পেয়েছে। টাকা প্রবাহের পরিমাণ বেড়েছে এই হচ্ছে প্রথম খবর। দ্বিতীয় খবরে বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে।

অনেক ব্যাংক নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে না পেরে ‘কলমানি’ মার্কেটে যাচ্ছে ঋণ করার জন্য। কেউ কেউ যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাদের ‘বন্ড’ ভাঙাতে। তৃতীয়ত, খবরটিতে মূল্যস্ফীতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব বিষয়ের ওপর আলোচনা করার জন্য, বিশেষ করে নির্ভরযোগ্য আলোচনার জন্য সর্বশেষ তথ্য দরকার। এখন ডিসেম্বর মাস শেষ হতে চলেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য যা আছে, তা সেপ্টেম্বর মাসের। তিন মাসের ব্যবধান। তবু বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে টাকার প্রবাহ বেড়েছে ৮ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। এবং ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে টাকার প্রবাহ ছিল ১১ লাখ ১৮ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এখন ‘টাকার প্রবাহ’ বলতে প্রতিবেদক কী বোঝাচ্ছেন তা বোঝা মুশকিল। এমনকি বোঝা মুশকিল ‘সঞ্চিত অর্থ’-এর সংজ্ঞা কী।

বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে তিনি এ তথ্য নিয়েছেন। আমি ওদিকে যাব না। কারণ সংজ্ঞা না বুঝে আলোচনা করা যায় না। আমার হাতের কাছে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইকোনমিক ট্রেন্ডস’- নভেম্বর, ২০১৮। এটাই সর্বশেষ ছাপা তথ্যের বই। এতে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ (সিওবি)-এর তথ্য আছে। আমরা যাকে ‘ক্যাশ’ বলি এটাই সেই ‘ক্যাশ’।

মানুষের হাতে হাতে যে টাকা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য আছে তা-ই ‘ক্যাশ’। একে কি ‘টাকার প্রবাহ’ বলা হচ্ছে? জানি না। তবে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ই বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে বাজারের নগদ টাকা। এর পরে কিছু টাকা থাকে ব্যাংকের ‘ভল্টে’। যতক্ষণ পর্যন্ত না তা বাজারে আসে ততক্ষণ এটি ‘ক্যাশ’ নয়। ‘বন্দি টাকা’। তারপর মানুষের টাকা থাকে ব্যাংকের আমানত (ডিপোজিট) হিসাবে।

আমানত দুই প্রকার- ‘মেয়াদি আমানত’ এবং ‘ডিমান্ড (তলবী) ডিপোজিট’। আমরা যখন অর্থ (মুদ্রা) সরবরাহ (প্রবাহ) বলি, তখন এর দুটো ভাগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক : ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ এবং ‘ডিমান্ড ডিপোজিট’। দুইয়ে মিলে হয় ‘এম ওয়ান’ বা মুদ্রা সরবরাহ ওয়ান বা ‘ন্যারো মানি’। ‘ন্যারো মানি’র সঙ্গে ‘মেয়াদি আমানত’ যোগ করলে পাওয়া যায় ‘ব্রড মানি’। এখন মুশকিল হচ্ছে এ সবই মানি। ‘মানি’ শুধু নগদ টাকা নয়। অর্থাৎ অর্থ বা মানি শুধু নগদ টাকা নয়, আমানত বা ডিপোজিটও ‘মানি’ বা ‘অর্থ’ বা ‘মুদ্রা’।

আমার মনে হয় এত প্যাঁচে না গিয়ে মানুষের হাতে যে ‘নগদ টাকা’ আছে, তা নিয়েই আলোচনা করা যায়। কারণ এটাই চিন্তা বা দুশ্চিন্তার বিষয়। ব্যাংকে টাকা থাকলে চিন্তা কম। হাতে হাতে যে টাকা, যাকে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ বলা হয়, তার অবস্থা কী?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নভেম্বরে প্রকাশিত ইকোনমিক ট্রেন্ডসের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সিওবি’ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৮ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বৃদ্ধির পরিমাণ ১২ শতাংশ।

২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ৬ শতাংশ। এই তথ্য থেকে বলা যাবে না যে, ‘সিওবি’ বা ‘নগদ টাকা’ বাজারে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে, বরং উল্টো ঘটনা ঘটেছে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ‘সিওবি’ বৃদ্ধির পরিমাণ কম। এখন কথা হচ্ছে, ডিসেম্বরের অবস্থা কী? এটা বলা এখন মুশকিল।

যতক্ষণ পর্যন্ত না ‘সিওবি’র ডিসেম্বরের তথ্য পাওয়া যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘নগদ টাকা’ প্রবাহের বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে দৃশ্যত মনে হচ্ছে নগদ টাকা উড়ছে বাজারে। উপলক্ষ নির্বাচন।

মানুষের ধারণা, ধনাঢ্য প্রার্থীরা ‘নগদ টাকা’ উড়াচ্ছে। সমর্থকদের, ভোটারদের দিচ্ছে। এ সন্দেহের পেছনের কারণ বর্তমান মাসের ঘটনা। দেখা যাচ্ছে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পরিমাণ বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোটি কোটি নগদ টাকা জব্দ করেছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে।

‘কল মানি মার্কেট’ যা ছিল মরমর অবস্থায়, তা চাঙ্গা হয়েছে। কারণ যেসব ব্যাংকে নগদ টাকার অভাব, তারা দৌড়াচ্ছে ওই মার্কেটে। ধারের জন্য। আবার অনেক ব্যাংক তাদের ‘বন্ড’ ভাঙিয়ে নগদ টাকার সংকট মুছতে চেষ্টা করছে। দৃশ্যতই ব্যাংকে ব্যাংকে নড়াচড়া হচ্ছে।

এমনও হতে পারে- ‘চেকের’ মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা তুলছে কোম্পানিগুলো, যা ভিন্ন পথে যাবে ভোটারদের হাতে। আমানতও ভাঙা হতে পারে। কিন্তু সব শেষে এর প্রতিফলন ঘটবে দুটো ঘটনায়। প্রথমত, ‘আমানত’ বা ‘ডিপোজিট’ হ্রাস পাবে। এবং ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ বাড়বে। এসবের হিসাব দৈনিক ভিত্তিতে একটি ব্যাংক, দুটি ব্যাংক হয়তো দিতে পারবে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের পক্ষে সম্ভব নয়। এই তথ্য কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকই দিতে পারে।

সমস্যাটা হচ্ছে অন্যত্র। দৃশ্যতই বোঝা যাচ্ছে টাকা, নগদ টাকা উড়ছে বাজারে। রেস্তোরাঁয় ক্যাশ, নগদ লেনদেন বেশি। ভোগ্যপণ্যের বাজারে ক্যাশ। সর্বত্রই ক্যাশ। নির্বাচনে প্রার্থীরা খরচ করেছে দেদার। এমনও খবর ছিল যে, কোটি কোটি টাকা নিয়ে নেমেছে একেকজন প্রার্থী। তাহলে তো দুই-তিন হাজার প্রার্থী মিলে খরচ হবে হাজার হাজার কোটি টাকা। এটা হলে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংকস’ বাড়াটাই স্বাভাবিক।

এছাড়া তো অন্য কোনো উপায় নেই। যদি ডিসেম্বর মাসে ‘সিওবি’ ভীষণভাবে বাড়ে, তাহলে কি মূল্যস্ফীতি বাড়বে- এটা হচ্ছে আরেক বড় প্রশ্ন। প্রথমত, যে টাকা বাজারে আছে, ব্যাংকে আছে, তা নিয়েই যদি নড়াচড়া হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি নোট ছেপে তা বাজারে ছাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। ব্যাংকের আমানতের টাকা, বাজারের টাকা, ব্যাংকের ভল্টের টাকা- এ সবই হিসাবের মধ্যে আছে।

এর মধ্যে নড়াচড়া হলে অসুবিধা নেই। সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে, তাহলে বিপদ। ওই টাকা বাজারে এলে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আছে। আবার সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও মূল্যস্ফীতি হতে পারে, যদি আমদানিকৃত দ্রব্যাদির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পায়। তেলের মূল্য যদি বাড়ে, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য যদি বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকে।

তবে এবার নির্বাচনের সময়টিতে একটি বাঁচোয়া বা ইতিবাচক বিষয় আছে। এটা ডিসেম্বর মাস, বাংলা পৌষ মাস। সবে নতুন ফসল উঠেছে। একে আমরা আমন বলি। চালের অভাব বাজারে নেই। নতুন চাল বাজারে। শীতকালে এমনিতেই শাকসবজি, মাছ, তরিতরকারির দাম কম থাকে। কারণ এ সময়ে সরবরাহ থাকে সর্বোচ্চ। সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনুকূল। পণ্য সরবরাহে কোথাও কোনো রকমের বাধা-বিপত্তি নেই।

ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি স্বাভাবিক। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা কম। টাকা তোলার হিড়িকের কারণে কি বাজারে নগদ টাকার সংকট দেখা দেবে? না, তা হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। প্রচুর ক্যাশ ব্যাংকিং খাতে আছে। ব্যাংকগুলো সার্বিকভাবে নগদ অর্থের অভাবে ভুগছে না। হতে পারে কোনো নির্দিষ্ট একটি বা দুটি ব্যাংকের ‘ক্যাশ’ সমস্যা আছে। তা সার্বিক সমস্যা নয়।

আমানত তোলা হচ্ছে, এতে কি আমানত হ্রাস পাবে? সাময়িকভাবে কারও কারও আমানত হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু নগদ টাকা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকেই ফিরে আসে। এটাই টাকার ধর্ম। এবং এ কারণেই ব্যাংকগুলো টিকে আছে। এ মুহূর্তে ‘ক্যাশ’, পর মুহূর্তেই তা ‘ডিপোজিটে’ পরিণত হয়। নগদ টাকা ব্যাংকে ঢুকলেই তার নাম হয় ডিপোজিট।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×