নির্বাচনে শিক্ষকদের অবস্থান

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কাজী ফারুক আহমেদ

রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকার পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের বোদ্ধা সমাজ বিভাজিত। যুক্তি-যৌক্তিকতা এক্ষেত্রে সেভাবে এখনও কাক্সিক্ষত মাত্রায় দেখা যায় না। প্রগতিশীলতার দাবিদারদের অবস্থান এবং ভূমিকাও প্রধানত কাগজে ও ড্রইং রুমের আলোচনায় সীমিত।

শালীন-অশালীন বাকযুদ্ধ, প্রতিপক্ষের ওপর মারমুখী হামলা, নির্বাচন পরিচালনাকারী ইসিতে এক ব্যক্তির অভিমত প্রকাশের ব্যতিক্রমী প্রবণতা, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং সর্বশেষ অধুনালুপ্ত হাওয়া ভবনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ছড়ানোর মতো অনৈতিক আচরণসহ নানামুখী বিচিত্র ঘটনার প্রেক্ষাপটে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

অন্যগুলো স্বব্যাখ্যাত বিধায় তিনটি ভালো দৃষ্টান্ত কীভাবে এবারের সংসদ নির্বাচনে ইতিবাচক মাত্রা যোগ করেছে তার উল্লেখ করা দরকার। সিলেটে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোমেন ও মুক্তাদির বড়দিনে একজন আরেকজনের মুখে সহাস্যে কেক তুলে দিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় আক্রান্ত, আহত গয়েশ্বর রায়কে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নসরুল হামিদ নিজে দেখা করে দুঃখ প্রকাশ ও সমবেদনা জানাতে ছুটে গিয়েছেন। নন্দিত ক্রিকেটার মাশরাফি মুর্তজা নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে সমর্থকদের অব্যাহতভাবে বলে চলেছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে সেরূপ আচরণই করতে হবে যা তার সঙ্গে করা সঙ্গত।

শিক্ষকদের পেশাগত সংগঠনও বিভাজনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২৩ ডিসেম্বর শহীদ মিনারের পেশাজীবী সমাবেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির অনুকূলে সমর্থন ব্যক্ত করে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, মানবতার শত্রু জামায়াতে ইসলামী, আলবদর আলশামস, গণশত্রু রাজাকারদের রাজনীতি করার অধিকার প্রদান করা হিমালয় সমান গর্হিত অপরাধ হয়েছে। এর কার্যকর প্রতিকারের সময় এসেছে। না হলে প্রজন্মাত্তরে প্রায়শ্চিত্ত করেও কূল পাওয়া যাবে না।

শিক্ষক কর্মচারী সংগ্রাম কমিটি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ সংবাদ সম্মেলনে, কর্মসূচি দিয়ে নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সমর্থনে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তাদের বক্তব্যে এসেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন, আইসিটি শিক্ষা প্রচলন ও ৭০০০ আইসিটি শিক্ষককে এমপিওভুক্তকরণ, ২০১০ সালে ১৬২৪টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ, ২৬১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তকরণ, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান, ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা প্রদান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন, মেট্রোরেল স্থাপন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠাসহ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।

দেশের এ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে হবে। শিক্ষক নেতৃত্বের এ অংশ শিক্ষকদের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষকের সমর্থনপুষ্ট হলেও এর বিপক্ষে শিক্ষক নেতৃত্বের একটি অংশ রয়েছে। তারা ক্ষীণ শক্তির অধিকারী ও হীনবল। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শেখ হাসিনার সমর্থক অর্থাৎ তার হাত দিয়ে শিক্ষকদের কল্যাণে যেসব অর্জন হয়েছে তাকে স্বীকার করেন। যেমন হয়েছিল ২০০১ থেকে ২০০৮ সালে।

তখনকার একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের হাতে কয়েক হাজার শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি, শিক্ষা ও শিক্ষকপরিপন্থী ৯টি কালাকানুন জারি, লাগামহীন দুর্নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার নগ্ন দলীয়করণ, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে এমনকি ঢাকা মহানগরীতে নেতার বদলে যুবকর্মীকে মনোনয়ন প্রদান, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রত্যাশা পূরণ না করা, এমনকি বারবার সরকারপ্রধান খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার চেয়েও না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ১১টি সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম, জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্ট যে আন্দোলন গড়ে তোলে আক্ষরিক অর্থেই তা ছিল ঐতিহাসিক।

জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কো ও আইএলও শিক্ষক কর্মচারী নির্যাতনের প্রতিবিধানে সরকারের কাছে লিখিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। একপর্যায়ে ওই দুটি বিশ্ব সংগঠনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক সরকারের বিরুদ্ধ শিক্ষকদের আনীত অভিযোগগুলো শুনানির জন্য হোটেল পূর্বাণীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সম্মত হন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে শেষ মুহূর্তে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এ অবস্থায় কে কোন্ দলের অনুসারী তা ভুলে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের ব্যানারে দেশব্যাপী এমন আন্দোলনের সূচনা করে যা শুধু জাতীয় মিডিয়ার নয়, বিশ্ব মিডিয়ারও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর মধ্যে কয়েকটি কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। সরকারের কাছে দাবির পক্ষে এই প্রথম বাংলাদেশে নিজেদের রক্তে স্মারকলিপি লিখে শিক্ষকরা এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সেইসঙ্গে সাহসী ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সূচনা করলেন।

যার মধ্যে রয়েছে, নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষকদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে প্রতিশ্রুতির মুদ্রিত অংশে কালিমালেপন, সেসময় প্রচলিত ১০০ টাকা বাসা ভাড়ার প্রতিবাদে কবুতরের বাসা নিয়ে ফুটপাতে অবস্থান গ্রহণ, বছরের পর বছর বিনা বেতনে কর্মরত শিক্ষকদের পরিবার-পরিজন নিয়ে খালি বাসনসহ মিছিল, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের প্রতিরোধে কার্টুন প্রকাশ যেখানে একটি উন্মত্ত মোষ বই পুস্তক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা জানালা ভেঙেচুরে তছনছ করে দিচ্ছে।

কার্টুনিস্ট কায়দা করে মোষের মাথায় শিক্ষামন্ত্রীর মাথা বসিয়ে দেয়। ব্যতিক্রমী নানা কর্মসূচির মধ্যে আরও ছিল, শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য বঞ্চনার তথ্য বিবরণীসংবলিত পোস্টার, পুস্তিকা, ফেস্টুন প্রকাশ, অবর্ণনীয় শিক্ষক নির্যাতনের ওপর চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজন। শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ হওয়ার আরও একটি কারণ ছিল। বিরোধী দলে থাকাকালে বেগম জিয়া জাতীয়করণের দাবিতে শহীদ মিনারে অনশনকারী শিক্ষকদের এ বলে অনশন ভঙ্গ করান যে ক্ষমতায় গেলে তাদের দাবি পূরণ করবেন; কিন্তু ক্ষমতায় বসে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি।

এ পটভূমিতে ঢাকার কাছে একটি বড় জেলা যা এখন শেখ হাসিনার সুবাদে বিভাগ হয়ে গেছে, বিএনপির জেলা পর্যায়ের একজন বড় নেতা যিনি তখন একটি বড় বেসরকারি কলেজেরও শিক্ষক- এক পড়ন্ত বিকালে আমাকে টেলিফোন করেন। তার ভাষ্যটি উদ্ধৃতিযোগ্য: ‘যে দল করি না তার নেত্রীর বক্তব্যসহ ফ্রন্টের পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে লাগাচ্ছি।’ আমার প্রশ্ন ছিল, ‘পছন্দ না হলে এ কাজ করছো কেন?’ অবাক না হলেও প্রশ্নের উত্তরে আমি আশ্বস্ত হই।

কারণ পোস্টার লাগানো শিক্ষক নেতার বক্তব্য ছিল, ‘আমি রাজনীতি করলেও শিক্ষক হিসেবে পেশাজীবী। দল করেও পেশার অধিকার রক্ষা ও মর্যাদার প্রশ্নে দলের অসঙ্গত ভূমিকার বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছি।’

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনার সরকার কি শিক্ষকদের সব প্রত্যাশা পূরণ করে দিয়েছে, যে জন্য এবারের সংসদ নির্বাচনেও তারা তার প্রতি সমর্থন দেবেন? বলা বাহুল্য, শিক্ষকদের পক্ষে, শিক্ষার উন্নয়নে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পরামর্শ ও নির্দেশনায় অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সত্ত্বেও বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের অনেক দাবি এখনও পূরণ হয়নি। তারপরও মতাদর্শ নির্বিশেষে শিক্ষকরা মনে করেন, সঠিকভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেলে তিনি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্তত করেন না।

শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক সবাই এক কথায় তার কাছে নিরাপদ। শিক্ষায় মৌলিক কিছু পরিবর্তন আনতে গেলে তার বিকল্প নেই। এজন্যই আমাকে শিক্ষকদের কেউ কেউ বলে থাকেন, তারা আওয়ামী লীগ না করলেও শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেন।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা

[email protected]