জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক দল

বলা হয়, আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। তবে সেই শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ হতে পারে যে শিশু সঠিকভাবে লালিত-পালিত হয় এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ পায়। বিএনপির বর্তমান কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় এ দলের নেতাকর্মীরা এখনও শিশু পর্যায়েই রয়ে গেছে।

বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে। প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোটার এ দলটির সমর্থক। কিন্তু দীর্ঘ ৪০ বছরে সমর্থকরা কেন কর্মীতে রূপান্তরিত হল না তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অন্যদিকে জামায়াত মাত্র ৬ শতাংশ ভোটের মালিক। ভোটাররা সবাই কর্মী হওয়ায় বিএনপি এ দলটির ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শ্রেণীগত কোনো পার্থক্য না থাকলেও আওয়ামী লীগের লক্ষ্য থাকে সব জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার। তারা নির্বাচনে গিয়ে সমর্থক চিহ্নিত করে এবং পরবর্তী সময়ে সেই সমর্থককে কর্মী হিসেবে গড়ে তোলে।

কেউ কেউ বলেন, বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি না থাকায় দলটির এই দৈন্য দশা। আবার কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে বলেন, বিএনপির জন্ম ক্যান্টনমেন্টে হওয়ায় দলটি কখনও গণতান্ত্রিক দলে রূপান্তরিত হবে না। কথাগুলো সম্পূর্ণ ঠিক নয়। বিএনপির বাংলাদেশী তথা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক কিংবা নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে উত্তম।

বিএনপি মুখবন্ধে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা লিখেছে বটে; কার্যত এ দলটি এটিকে কখনোই আদর্শ হিসেবে নেয়নি। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের অধীনে সব ধর্মাবলম্বী ও সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নিরাপদে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তারা পাহাড়ি এলাকায় চরভাঙ্গা মানুষদের ঘরবাড়ি নির্মাণ করার সুযোগ করে দেয় এবং সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে রাজনীতি শুরু করে।

একটি দলের জন্ম কোথায় হয়েছে সেটি বড় কথা নয়, পরবর্তী সময়ে দলটি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি পাল্টিয়েছে কিনা সেটাই আসল কথা। আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগের ঔরশজাত হয়েও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে রাজনীতি শুরু করে।

আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি আগে দাস প্রথার পক্ষে ছিল। দলের একমাত্র নেতা আব্রাহাম লিঙ্কনই দাস প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। পরবর্তীকালে রিপাবলিকান পার্টি দাস প্রথা উচ্ছেদে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে লোকরঞ্জনবাদী দলগুলোতেও একটি কৌশল লক্ষ করা যায়- তারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের মান্য করেই রাজনীতি করছেন। ভারতের নরেন্দ্র মোদি এবং তুরস্কের এরদোগানের রাজনীতি এর উদাহরণ হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হল, বিএনপি এতকিছু জানার পরও কেন পরিবর্তিত হচ্ছে না? জন্মের সময় বিএনপিতে প্রচুর আওয়ামীবিদ্বেষী লোকের অংশগ্রহণ ঘটে। তাদের মধ্যে ভাসানী ন্যাপ, চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিসহ স্বাধীনতাবিরোধী লোকজনও ছিল। ফলে বিএনপি হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগবিরোধী বড় প্লাটফরম। শুরুতে দলটি চরম জনপ্রিয়তা পায়। এখানে বলে রাখা ভালো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু না হলে এবং আওয়ামী লীগের শাসন দীর্ঘায়িত হলে হয়তো পরবর্তীকালে জাসদই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতো।

জাসদের লক্ষ্য সঠিক না হলেও জাসদ মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেনি। অনেকে মনে করেন, জাসদের রোপণকৃত ফসল কেটে গোলায় তোলে বিএনপি। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দলের বিরোধিতা কখনও আরেকটি দলের একমাত্র আদর্শ হতে পারে না।

বিএনপির ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে চীনপন্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততাও। তারা আগে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ভোটবিরোধী ছিলেন। তাদের চরমপন্থী রাজনীতির প্রতি এদেশের মানুষ কখনও সমর্থন দেয়নি। আওয়ামী লীগের প্রতি রয়েছে তাদের প্রচণ্ড ক্ষোভ-আক্রোশ। তারা বিএনপিতে যোগ দিলেও আগের চিন্তা ত্যাগ করেনি। তারা বিএনপিকে একটি গণতান্ত্রিক দলে রূপান্তরিত করতে কোনো পরামর্শ দেননি এবং কোনো কর্মসূচিও গ্রহণ করেননি।

এখানে একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক হবে। শহীদ জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো মৃত্যুবরণ করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমবেদনা জানাতে খালেদা জিয়ার বাসভবনে ছুটে যান। বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সহকারী শিমুল বিশ্বাস তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। মনীষীরা বহু আগেই বলেছেন, গণতন্ত্র মুখে প্রচারের বিষয় নয়, এটি বুকে ধারণ করার এবং সর্বক্ষেত্রে চর্চার বিষয়।

জনৈক চীনপন্থী বুদ্ধিজীবী এক টক্শোতে বলেছে, ‘বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয়েছে দ্বাদশ শতাব্দীতে এদেশে মুসলমান শাসকদের আগমনের পর থেকে। সেজন্য আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট ঘোচাতে হলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ইসলামী জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ ঘটাতে হবে।’

এখানে ভুলে গেলে চলবে না, শুধু বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গেও যদি ইসলামী জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ ঘটে, তাহলে আখেরে ইসলামী জাতীয়তাবাদীরাই লাভবান হবেন। বিএনপির তরুণ জনগোষ্ঠী ধর্মকে সংস্কৃতি হিসেবে নিতে পছন্দ করে; কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সংস্কৃতিকে মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আমেরিকা ইচ্ছা করলেই যেমন ইসরাইলপ্রীতি ত্যাগ করতে পারে না, তেমনি বিএনপি ইচ্ছা করলেই জামায়াতকে ত্যাগ করতে পারবে না। কারণ আমেরিকাকে শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে ইহুদিদের ব্যাপক অবদান রয়েছে। তারা আমেরিকার বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, গবেষণাসহ প্রতিরক্ষার বিভিন্ন মূল পয়েন্টে অবস্থান করছে। তেমনি বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলেও বসে আছেন জামায়াত মানসিকতার লোকজন।

সম্প্রতি বিএনপি জামায়াত ত্যাগ করার বড় সুযোগ পেয়েছিল। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট যদি জামায়াতকে বর্জন করে প্রার্থী মনোনয়ন দিত, তাহলে ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলন অন্যদিকে মোড় নিত, যা এখন বহু রাজনীতিকই স্বীকার করা শুরু করছেন। অন্যদিকে কতিপয় আওয়ামী বুদ্ধিজীবী বলা শুরু করেছেন, নির্বাচনের পর বিএনপি বহুধাবিভক্ত হয়ে যাবে এবং অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আগে মুসলিম লীগের বিলুপ্তি ঘটায় জামায়াত লাভবান হয়েছিল।

বর্তমানে বিএনপির বিলুপ্তি হলে জামায়াতই লাভবান হবে বেশি। জামায়াত যদি ২০ শতাংশ ভোটারকে কর্মীতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়, তখন সেটা আওয়ামী লীগ কিংবা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে কি?

মোশাররফ হোসেন মুসা : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×