নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ করতে হবে

  শরীফুর রহমান আদিল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সহিংসতা

বাংলাদেশে নির্বাচনের কথা বললে দুটি বিষয় আমাদের সামনে চলে আসে- একটি হল উৎসব, অন্যটি সহিংসতা।

অতীতের কথা মনে করলে নির্বাচন ঘিরে যতটা আনন্দের অনুভূতি জাগে, তার চেয়ে বেশি জাগে ভয়ের অনুভূতি। আর এ ভীতি হল নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, লুটতরাজ, ঘরবাড়ি-দোকানপাট-ভিটেমাটিতে অগ্নিসংযোগের। দেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

গত ১০টি নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার চিত্র দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি পাড়া-প্রতিবেশী, স্বজন, এমনকি নিকটাত্মীয়ও।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে কোনো রাজনৈতিক দল কখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অনেকে বলে থাকেন, ‘এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সংস্কৃতি!’ কিন্তু এ ভাষ্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই মানানসই নয়। সভ্যসমাজে সহিংস আচরণ কোনো দেশের সংস্কৃতি হতে পারে না। আর এ রকম কোনো বাস্তবতা থাকলেও তাকে সংস্কৃতি না বলে অপসংস্কৃতি বলাই যুক্তিযুক্ত। আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি স্থাপনে আমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাছাড়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনী সহিংসতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই শুধু নয়, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার জন্যও।

অতীতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় অনেকে নিহত হয়েছেন, শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেকের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছে; কিন্তু সেসব ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি, বরং রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের সহিংসতার কারণ রাজনৈতিক নয় বলে প্রচার করেছে। তারা একে সামাজিক, গোষ্ঠীগত এবং পরস্পর সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে অভিহিত করেছে। অনেক নেতা এমনও বলে থাকেন, পূর্বশত্র“তার কারণে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে নির্বাচনকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়া এ ধরনের সহিংসতার কারণ।

এসব কারণে কোনো সরকারই নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কোনো দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন অলিখিতভাবে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে বৈধ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছে!

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ক্ষয়ক্ষতির সঠিক কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রয়োজন মনে করেনি কোনো সরকার। কেবল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত আংশিক খবর আমরা জানতে পারি। আমরা প্রতিবারই দেখি জাতীয় নির্বাচনের পর বিজিত দল কর্তৃক প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের জন্য এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ কারণে অনেকে গ্রাম ছেড়ে কিংবা কেউ দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। তাই এবার নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুসহ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেন কোনোরকম হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার না হন, সেদিকে প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যারা সরকার গঠন করবেন তাদের বুঝতে হবে, তারা যখন সরকার গঠন করেন তখন সেটা রাষ্ট্রের সরকার হিসেবে বিবেচিত হয়, নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়। সুতরাং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়। তাই এ অপরাধ দমনে সরকারকে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে।

নির্বাচনী প্রচারণাকালে জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের ওপর হামলার কথা আগে খুব একটা শোনা না গেলেও এবারের নির্বাচনী প্রচারণার সময় বেশ কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আরও সহিংস ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনসভায় নেতারা যেভাবে প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সুতরাং সহিংসতা প্রতিরোধে নির্বাচিত দলকে বিজয়ী হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্দেশনা দিতে হবে। একই সঙ্গে নির্দেশনা অমান্যকারীদের ব্যাপারে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিতে হবে।

প্রশাসন নির্বাচন-পরবর্তী সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখবে, জাতি হিসেবে এটাই সবার প্রত্যাশা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্বরণ রাখতে হবে, দেশের সব মানুষের কল্যাণের জন্যই রাজনীতি এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ হল জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়ন সাধন। এই মূলনীতিটি সব সময় স্মরণে রাখতে পারলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার মনোভাব থেকে তাদের ফিরে আসা সহজ হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধে নতুন সরকারকে আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হতে হবে। শান্তিপ্রিয় মানুষকে শান্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। গণতন্ত্রের মূল চেতনা- পরাজিত দলের প্রতি সমবেদনা, সহানুভূতি ও শ্রদ্ধার বিষয়টি ধারণ করে সহিংসতা পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। এদিক থেকেও বাংলাদেশকে বিশ্বের রোল মডেল হতে হবে। বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, গার্ডিয়ান কিংবা নিউইয়র্ক টাইমস আমাদের নির্বাচনী সহিংসতার কোনো নেতিবাচক খবর প্রকাশ না করে যেন এ নির্বাচনটিকে রোল মডেল হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রচার করতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই পথই প্রশস্ত করতে হবে।

শরীফুর রহমান আদিল : শিক্ষক ও গবেষক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×