তৃতীয় মত

বিজয়ী ও বিজিত দুই পক্ষের জন্যই সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০১:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজয়ী ও বিজিত দুই পক্ষের জন্যই সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
বিজয়ী ও বিজিত দুই পক্ষের জন্যই সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

আগামীকাল ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন। তাই সবাইকে নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা। এবারের নববর্ষের দিনটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে এই কারণে যে, বিদায়ী বছরের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভোট গণনার ফলাফল এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি। কিন্তু প্রাথমিক জরিপে জানা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের মহাজোট বিজয়ের পথে এগিয়ে আছে। বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ঐক্যফ্রন্ট পরাজিত হওয়ার মুখে।

আওয়ামী মহাজোট যে নির্বাচনে জয়ী হবে, এটার আভাস আগেই পাওয়া গিয়েছিল। তবে তারা ভূমিধস বিজয়ের অধিকারী হবেন, এটা আমি এখনও ধারণা করি না। তবে তারা সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন।

বিএনপি জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের মতো সদস্য সংখ্যা পাবেন। সিপিবি-বাসদ ইত্যাদি নিয়ে গঠিত বামফ্রন্ট যদি টেনে টুনে দু’একটা আসন পায় তাহলে বিস্মিত হব না।

এবারের সাধারণ নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্য, সব পক্ষের অংশগ্রহণে মোটামুটি শান্ত পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। এই লেখাটি লেখার সময় পর্যন্ত পটিয়া ও নোয়াখালীর দুটি নির্বাচন কেন্দ্রে সংঘর্ষ ও খুনোখুনির খবর পেয়েছি।

২৯ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত দেশে নির্বাচনী হাঙ্গামার বড় কোনো খবর পাইনি। রাজধানী ঢাকার অবস্থাও মোটামুটি শান্ত। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের গোলমালের আশঙ্কা অনেকেই করেছিলেন।

আমার ধারণা, বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলেও বড় ধরনের কোনো হাঙ্গামা হবে না। সেনাবাহিনী এবার নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব সম্পাদনের ব্যাপারে নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা দেখিয়েছে এবং দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দলও এই নির্বাচনে অনেক বেশি সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।

তাতে আশা হয়, এবারের ইংরেজি নববর্ষ বাংলাদেশে এক শান্তিপূর্ণ যুগের সূচনা ঘটাবে। তাতে গণতন্ত্রের শত্রুরা নির্বাচন-পরবর্তী কয়েকদিন নির্বাচন স্বচ্ছ ও অবাধ হয়নি বলে চেঁচামেচি করলেও দেশের মানুষ এই নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে আরও পাঁচ বছর আওয়ামী লীগকে দেশ শাসনের সুযোগ দেবে।

সত্য কথা বলতে কী, আমি এখন নির্বাচনের রেজাল্ট জানার জন্য অপেক্ষা করছি। যা লিখছি তা অনুমানভিত্তিক। পঞ্চাশ বছর ধরে দেশের রাজনীতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। তার ভিত্তিতে অনুমান করছি যে, দেশের ভাগ্য নির্ধারণে কখনও দেশের মানুষ ভুল করেনি।

আওয়ামী লীগকে বিজয় মাল্য দিলেও বিএনপিকে তারা প্রত্যাখ্যান করেনি। একাদশ সংসদে বিএনপি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং সংসদ বর্জন ও সন্ত্রাসী রাজনীতির পথ না ধরলে দেশে শক্তিশালী দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে পারবে।

চাইকি আগামী ৫ বছর পরের নির্বাচনে হয়তো ক্ষমতায় ফিরে আসতেও পারবেন। কিন্তু তার জন্য বিএনপির নীতি ও নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন দরকার।

এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য- ধারণা করা হয়েছিল বিরোধী পক্ষ, তথাকথিত সুশীল সমাজের টানা বিরোধিতা, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও প্রোপাগান্ডার মোকাবেলায় হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনটি হয়তো আদৌ অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে না।

পেলেও তা হবে ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন। যা গতবার বিশ্বস্বীকৃতি পেলেও এবারে পাবে না। ফলে বাংলাদেশে যে ভয়ানক রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে, তাতে গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে এবং দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচন বন্ধ করা যায়নি। হাসিনা সরকারের অধীনেই সব দলের অংশগ্রহণে তা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের উচিত হবে না এই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে অন্যান্যবারের মতো হইচই করে নিজেদের শক্তিক্ষয় করা। বরং সংসদে যোগ দিয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র ও নিজেদেরও মঙ্গল সাধন করতে পারবেন তারা।

তাতে বিএনপি বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উঠে আসতে পারবে। এই ব্যাপারে বিএনপি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলের সাধারণ নির্বাচন খালেদা জিয়া বর্জন করে ‘আপসহীন নেত্রী’ আখ্যা পান। ওই পর্যন্তই। এই বর্জননীতি তাকে কোনো বেনিফিট দেয়নি। এরশাদ আমলের সেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তিনি শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দেন সংসদ বর্জনের জন্য। সেই নির্বাচনে তিনি নিজেও জয়ী হতে পারেননি।

শেখ হাসিনা তার পরামর্শ অগ্রাহ্য করে সংসদে যোগ দিয়ে বিরোধী দলের নেত্রী হন। এরশাদ সংসদে এবং সংসদের বাইরে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের সম্মুখীন হন। তখন থেকেই শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. কামালের মনোমালিন্য শুরু।

ড. কামালের পরামর্শ না শুনে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ দেশের প্রবহমান রাজনীতিতে অবস্থান টিকিয়ে রাখায় গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে তারা উঠে আসেন। ড. কামাল দেশের রাজনীতিতে ‘মার্জিনালাইজড’ হয়ে যান।

ওই অবস্থান থেকে আর উঠে আসতে পারেননি। এবারের নির্বাচনে তিনি আম এবং ছালা দুই-ই হারিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিবিরের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে সাধারণ মানুষের মনে যে শ্রদ্ধা ছিল, তা তিনি হারিয়েছেন এবং দেশের রাজনীতিতেও আবার হারাধনের একটি ছেলে হয়ে গেছেন।

ঐক্যফ্রন্ট যদি তার ঐক্য বজায় রেখে একাদশ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করতে পারে, তাহলে সংসদীয় দলে ড. কামালের নেতৃত্ব না থাকলেও ফ্রন্ট সংসদে দায়িত্বপূর্ণ বিরোধী দলের শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে।

চাইকি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাও নিশ্চিত করে তুলতে পারে। দেশের মানুষ দেশে আর সংঘাত-সংঘর্ষ দেখতে চায় না। তারা চায় বাংলাদেশ যে লক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই লক্ষ্য তথা একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন। আমার আশঙ্কা ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সেই কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার যাত্রা আরও বাধামুক্ত হবে।

এবারের নির্বাচনে জয়ী এবং পরাজিত দুই পক্ষের সামনে যেমন সম্ভাবনার বিরাট দরজা খুলে গেছে; তেমনি বিরাট চ্যালেঞ্জ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ঐক্যফ্রন্টের সামনে চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে তাদের ঐক্য বজায় রাখার।

বিভিন্ন দলছুট নেতা ও বিপরীত মত নিয়ে ফ্রন্ট গঠিত। নির্বাচনে জয়ী না হলে, ক্ষমতায় যেতে না পারলে আ স ম আবদুর রব এবং এই ধরনের বিপরীত মতের নেতারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে বেশিদিন ঘর করবেন কিনা সন্দেহ। শেষ পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিতে হবে বিএনপিকেই।

তাদের মধ্য থেকেও সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচনে বিরোধ দেখা দিতে পারে। লন্ডনে বসে তারেক রহমান কাকে সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে চাইবেন, তা আমার জানা নেই। তিনি যাকে চান তিনি নির্বাচিত হয়ে আসতে না পারলে বিএনপির জন্য সমস্যা সংকটে পরিণত হবে।

এই সংকট সমাধানে ড. কামাল হোসেনের কোনো ভূমিকা থাকবে না। তাকে ঘরের ছেলের মতো ঘরে ফিরে যেতে হবে। তাকে যেজন্য বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ডেকে কাজ হয়েছিল তার সেই ভূমিকা শেষ। তার নিজস্ব দল গণফোরামের কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হবেন কি?

আর নির্বাচিত হলেও বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কতদিন একসঙ্গে বসতে পারবেন? সুতরাং নির্বাচনের পরেও ঐক্যফ্রন্টের ঘর সামলাতে বেশ কিছুদিন লাগবে। অনেক ভাঙাগড়া হয়ে বিএনপিকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

আওয়ামী জোট এবারের নির্বাচেন জয়ী হয়ে আরও বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। তা হবে একটি সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার গঠন এবং তাদের তৃতীয় দফা শাসনকালে দেশকে সুশাসন উপহার দেয়া।

যে কোনো কারণেই হোক আওয়ামী লীগ দশম সংসদের একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী দলীয় সংসদ সদস্যকে আর মনোনয়ন দেবে না বলে যে সিদ্ধান্ত দেশের মানুষকে জানিয়েছিল, তা তারা রাখতে পারেনি।

তাদের নতুন সংসদীয় দলে নতুন রক্তের সঞ্চালনও তেমন হয়নি। পুরনো এবং অতীতে অভিযুক্ত যেসব এমপি আবার নৌকার জোয়ারে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের চরিত্র ও অভ্যাস কতটা সংশোধিত হবে অথবা সংশোধন করা যাবে কিনা তা বলা মুশকিল।

যদি শেখ হাসিনা কঠোর হন এবং তাদের চরিত্র শোধরাতে পারেন, ভালো কথা, নইলে দেশবাসীর প্রত্যাশায় বারবার আঘাত পাওয়ার পর যে জনঅসন্তোষ দেখা দেবে তাতে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ শেষ করা আওয়ামী লীগের জন্য খুবই কষ্টকর হবে। বিজয়ের উৎসবে আপ্লুত লীগ নেতাদের এই আগাম সতর্ক বাণীটি জানিয়ে রাখলাম।

লন্ডন, ৩০ ডিসেম্বর, রোববার, ২০১৮

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×