কৃষক নিয়ে মোদির পলিটিক্স

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলফ গুনভাল্ড নিলসেন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

‘মোদি সরকার মুর্দাবাদ, মুর্দাবাদ, মুর্দাবাদ’ বা মোদি সরকারের পতন হোক, পতন হোক, পতন হোক- নভেম্বর মাসের শেষ দু’দিন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাস্তায় কৃষক সমাবেশে হাজারও কৃষকের সমাবেশে প্রতিধ্বনিত অনেক স্লোগানের মধ্যে এটি একটি।

প্রতিবাদকারীরা সেখানে ভারতের গ্রামাঞ্চলে গভীর সংকটের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পদক্ষেপের দাবি জানান। ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র জেলাগুলোর একটি ঝাবুয়ার এক কৃষক একজন রিপোর্টারকে সেদিন বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। কৃষকের জন্য করা প্রতিশ্রুতিগুলোর একটিও তারা পূরণ করেননি।’

ভারতজুড়ে কৃষকদের সংগঠনগুলোর ২০০টিরও বেশি সংগঠনের নেটওয়ার্ক- অল-ইন্ডিয়া কৃষাণ সংঘ কো-অর্ডিনেশন কমিটি আয়োজিত দুই দিনের কৃষাণ মুক্তি মার্চ থেকে চাষী সম্প্রদায়ের ভোগান্তি লাঘবে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাবি ছিল- কৃষিসংক্রান্ত সংকট আলোচনার জন্য পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশন ডাকা, কৃষিপণ্যের জন্য সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা এবং কৃষকদের ঋণমুক্তি নিশ্চিত করার জন্য আইন পাস করা।

২১টি বিরোধী দলের প্রতিনিধি ওই গণকৃষক সমাবেশে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল সেখানে ঘোষণা করেন, ‘কৃষকরা ভিক্ষা চান না, তারা কেবল নিজেদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে চান’।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের পর- ভারতজুড়ে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট কৃষকদের সংঘবদ্ধ সমাবেশ- নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে এটি তৃতীয় সমাবেশ, যেখানে নয়াদিল্লির রাস্তায় কৃষকদের সংকট নিয়ে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছেন তারা। গত এক-দেড় বছরে কয়েকটি বড় ধরনের কৃষক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৭ সালের গ্রীষ্মে বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা এবং বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের ম্যানডসাউর সিটিতে প্রতিবাদ ও দাঙ্গা উগরে উঠেছিল, যেখানে সহিংস প্রতিবাদ সমাবেশের সময় পুলিশের গুলিতে ৬ জন কৃষক প্রাণ হারান।

একই বছর দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের কৃষকরা নয়াদিল্লিতে ১০০ দিনের বেশি প্রতিবাদ করেছিলেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে ঋণমুক্তি, সর্বনিু মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া এবং জমির অধিকারের দাবিতে ২৫ হাজার কৃষক নাসিক থেকে মুম্বাই পর্যন্ত শোভাযাত্রা করেছিলেন। নভেম্বরের শেষের দিকে আরেকটি শোভাযাত্রা করা হয় মহারাষ্ট্রে। এতে খরায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিপূরণের দাবিতে থানে থেকে মুম্বাই পর্যন্ত লংমার্চে অংশ নেন। ভারতজুড়ে বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় অস্থিতিশীলতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে যেগুলোর পেছনের কারণ ছিল কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা, বেকারত্ব এবং রাষ্ট্র অনুমোদিত ভূমি গ্রাস। এ পরিস্থিতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়- কেন এগুলো ঘটছে? আর আগামী বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের বিস্তৃত রাজনৈতিক দৃশ্যপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত করলে স্পষ্ট হয়, কৃষি সংক্রান্ত প্রতিবাদগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সর্বোপরি, বর্তমানে ভারতে কৃষক উত্তেজনা হল দেশটির কৃষি খাতের সংকটের উপসর্গ এবং বিশেষত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সমস্যার বর্ধিত রূপ। এ সংকটের মূলে রয়েছে দুটি বিষয়ের প্রচণ্ড প্রভাব- চাষাবাদের ব্যয় প্রবলভাবে বেড়ে যাওয়া এবং একইসঙ্গে কৃষি আয় কমে যাওয়া। এ অবস্থায় ঋণের বোঝা বাড়ছে কৃষকের। কৃষক টাকা ঋণ করে চক্রবৃদ্ধি সুদহারে, যেখানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয়, যা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতির কুফল- কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতজুড়ে অনেক বেড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ভারতে ১১ হাজার ৩০০-র বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা ছিল তিনি ‘অচ্ছে দিন বা ভালো দিন’ নিয়ে আসবেন ভারতের জনগণের জন্য; কিন্তু বাস্তবতা হল ২০১৪ সাল থেকে ভারতের কৃষকদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কারণ, উৎপাদন ব্যয় নিয়মিতই বেড়ে যাচ্ছে একইসঙ্গে কৃষি পণ্যের দাম প্রতিনিয়ত পড়তির দিকে।

কৃষকদের ঋণে ডুবে থাকার সমস্যাটিতে বর্তমান সরকার জোরালো সাড়া দেয়নি। তার ওপর নোট বাতিলের কারণে কৃষি খাতে মারাত্মক নেতিবাচকভাবে পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বিজেপি সরকার ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করে কালো টাকা ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার উদ্দেশ্যে। এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে মোদি সরকারের দাবি- ২০২০ সালের মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করা হবে। বিষয়টি কয়েক সপ্তাহ আগে দিল্লিতে প্রতিবাদকারীদের কাছে ফাঁপা আওয়াজ মনে হচ্ছে।

এমন একটি দেশ যেখানে বেশিরভাগ ভোটার এখনও গ্রামে বাস করেন এবং যেখানে কার্যকরভাবে ধনীদের চেয়ে দরিদ্ররাই নির্বাচনে বেশি অংশগ্রহণ করে থাকেন, সেখানে বড় ধরনের (কৃষি সংক্রান্ত) হতাশা ও উত্তেজনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মোদির বিজেপিকে যেকোনো দৃষ্টিতেই মনে হয়েছে- অদম্য শক্তি। ২০১৬ সালে উত্তরপ্রদেশে দলটির বড় ধরনের জয়- নির্বাচনী জগন্নাথ হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে; আর সম্প্রতি ভারতের ২৯টি রাজ্যের ২০টিতে ক্ষমতা ধরে রেখেছে বিজেপি। ২০১৭ সালের শেষ দিকে মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটের নির্বাচনে নিষ্প্রভ ফলাফলের পর থেকে মনে হচ্ছে বিজেপির নির্বাচনী ভাগ্যে টান পড়েছে।

২০১৮ সালের প্রথমার্ধে দলটি উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে সংসদীয় উপনির্বাচনে হেরেছে এবং ডিসেম্বরের শুরুতে নয়াদিল্লির কৃষক প্রতিবাদের পরপরই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে পরাজিত হয়েছে বিজেপি। বেশিরভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষক যেমনটি বলেছেন, মোদি প্রশাসনের এ ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে গ্রামীণ এলাকার হতাশ ভোটার।

এ পরিপ্রেক্ষিতে এটাই অনুমান করা যায়, যে বৈশিষ্ট্য ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদিকে ব্যাপক জয় পেতে সহায়তা করেছিল তাতে চিড় ধরেছে। যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে যে কোনো স্থানে তর্ক করেছি আমি, তা হল সাড়ে চার বছর আগে পার্লামেন্টে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কোনো ক্ষুদ্র অংশের সফল প্রচেষ্টার ফল ছিল না; বরং এটা হয়েছে শহরের বাইরে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্ণের গ্রুপে দলটির ঘাঁটির কারণে, যা হয়ে পড়েছে বিজেপির ঐতিহ্যবাহী সমর্থনের ভিত্তি। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, দলটির সাফল্য এসেছে- নিুবর্ণ এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে নিজেদের ভোটের অংশ বাড়াতে পারার কারণে- যারা ঠিক করে রেখেছিল হয় কংগ্রেস না হয় আঞ্চলিক গোত্রভিত্তিক দলগুলোকে ভোট দেবে। বস্তুত, এখন মনে হচ্ছে এ কৌশলে চিড় ধরেছে, একইসঙ্গে দেশটির বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদের সাধারণ একটি ইস্যু পেয়েছে। আর তাহল অতি গুরুত্বপূর্ণ ভারতের কৃষি খাতের সংকট- যা মোদি ও শাসক পক্ষের জন্য ভালো পূর্বলক্ষণ প্রকাশ করছে না।

যা হোক, ২০১৯ সালে ভারতের গ্রামীণ এলাকার ভোটাররা অধিক হারে ভোট দিতে পারেন, যা মোদি ঢেউ চূড়ান্তভাবে ভাঙার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারতের কৃষি-সংকট দূর করা- নয়াদিল্লি থেকে বর্তমান প্রশাসন সরানোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সংকটের জট মোদি প্রশাসনের চেয়েও বেশি গভীরে চলে গেছে, যা দুই দশক ধরে গড়ে উঠেছে নব্য উদার নীতির কারণে, যে নীতি কংগ্রেস ও বিজেপি- উভয় সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল।

ফলে যারা ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের শক্তি সম্পর্কে সমালোচনামুখর, তাদের জন্য প্রকৃত বিকল্প হবে একটি বিরতি, তা কেবল মোদি বিরতি নয়, প্রয়োজন বাজারভিত্তিক নীতির প্রশাসনেরও, যে প্রশাসন আজকের ভারতে অধিকারচ্যুতি বাড়িয়েছে এবং বৈষম্য তীব্র করেছে।

আলজাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

আলফ গুনভাল্ড নিলসেন : দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর