সাদাসিধে কথা

এই গ্লানি কোথায় রাখি?

  মুহম্মদ জাফর ইকবাল ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এই গ্লানি কোথায় রাখি?

আমি প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর পত্রপত্রিকায় লিখি। এই সপ্তাহের জন্যও লিখতে বসেছিলাম। সবেমাত্র একটা ইলেকশন শেষ হয়েছে, মোটামুটি সবাই জানত আওয়ামী লীগের মহাজোট জিতে আসবে; কিন্তু ফলাফল দেখে আমরা সবাই কম-বেশি চমকে উঠেছি।

সত্যি সত্যি দেশের সব মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে গিয়েছে, নাকি এর মাঝে অতি উৎসাহী মানুষের অবদান আছে বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

একটা জিনিস স্পষ্ট এ দেশে এখন মানুষ মন খুলে কথা বলতে ভয় পায়, পত্রপত্রিকাও যথেষ্ট সতর্ক। সবকিছু মিলিয়ে আমি আমার নিজের মতো করে কিছু একটা লিখে প্রায় শেষ করে এনেছি, তখন হঠাৎ করে সংবাদপত্রে একটা সংবাদে চোখ আটকে গেল।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায় চার সন্তানের জননীকে ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য গণধর্ষণ করা হয়েছে (আজকাল প্রায়ই গণধর্ষণ শব্দটি চোখে পড়ে; কিন্তু এখনও আমি এটাতে অভ্যস্ত হতে পারিনি, বাংলা ভাষায় এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো শব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই)।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত বিজয়ী হওয়ার পর আমরা অনেকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছি, আমি ধরেই নিয়েছিলাম সেটি এখন অতীত। এখন এ ধরনের ঘটনা আর কখনও ঘটবে না। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হওয়ার পর এমনটি ঘটেছে, এরকম শুধু একটি ঘটনার খবরই এসেছে। কিন্তু একটি ঘটনাই কেন ঘটবে?

খুবই স্বাভাবিকভাবে সেই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো যোগাযোগ নেই। ধর্ষণের শিকার হওয়া জননী কিন্তু তা বলছেন না, তিনি রুহুল আমীন নামে সুনির্দিষ্ট একজন মানুষের নাম উল্লেখ করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার নিরক্ষর স্বামী, স্কুলপড়ুয়া মেয়েসহ সবাইকে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণ করার জন্য দশ-বারো জন মানুষ বাইরে নিয়ে গেছে। আমি কী অবলীলায় বাক্যটি লিখে ফেললাম; কিন্তু কেউ কি কল্পনা করতে পারবে এই বাক্যটিতে যে কথাগুলো বলা হয়েছে সেটি কী ভয়ংকর?

রুহুল আমীন নামক যে মানুষটির নির্দেশে এ ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধর্ষণের শিকার হওয়া জননী অভিযোগ করেছেন, তাকে বাঁচিয়ে নয়জন মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই ঘটনাটির সঙ্গে রাজনীতি বা নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই, এটি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা। আমরা কেন ধর্ষণের শিকার হওয়া জননীর কথা বিশ্বাস না করে পুলিশের কথা বিশ্বাস করব?

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের একজন নিরক্ষর স্কুটার চালকের স্ত্রী নিশ্চয়ই গুরুত্বহীন একজন মানুষ। যার নির্দেশে প্রায় এক ডজন মানুষ এই গুরুত্বহীন একজন জননীকে ধর্ষণ করে, সে নিশ্চয়ই অনেক ক্ষমতাশালী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর সে নিশ্চয়ই নিজেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করছে। কাজেই তুচ্ছ একজন মহিলাকে ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য এরকম একটি শিক্ষা দেয়া নিশ্চয়ই খুবই মামুলি ব্যাপার। এটা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হওয়াটাই হয়তো বিস্ময়কর।

কিন্তু সদ্য বিজয়ী হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য এটি একটি গ্লানি, গ্লানিটি তুচ্ছ নয়। এই গ্লানি আকাশছোঁয়া, সদ্য নির্বাচিত রাজনৈতিক দলটি সরকার গঠন করার পর সবার আগে তাদের এই গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে হবে। ধর্ষণের শিকার এই জননী, তার নিরক্ষর স্বামী, স্কুলে পড়–য়া অসহায় কয়েকটি ছেলেমেয়ে যতক্ষণ আমাদের ক্ষমা না করবে, ততক্ষণ আমরা কিছুতেই গ্লানিমুক্ত হতে পারব না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই বিচলিত এবং বিষণ্ণ, আমি কিছু লিখতে পারছি না। পাঠক আমাকে ক্ষমা করবেন।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : লেখক; অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×