আইনের ধারণা ও আইনসম্মত গৃহ তল্লাশি

  রিজভী আহমেদ ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

উদ্ভবের পরপরই আহার, প্রজনন ও টিকে থাকার প্রয়োজনে মানবজাতির মধ্যে সমাজবদ্ধ হওয়ার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। মানবকুলে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রবণতা ফুটে উঠতে থাকে।

মানুষের মধ্যে ক্ষুধা নিবৃত্তির পর ভোগ ও নিরাপত্তার ভাবনা থেকে একটা সাধারণ নীতি সন্ধানের প্রচেষ্টা শুরু হয় সেই প্রাগৈতিহাসিককালে। ঠিক সেটিই আইনের উৎস বলে অনেকে মনে করেন।

সুতরাং আইন হচ্ছে সামাজিক গাঁথন (সোশ্যাল কন্সট্রাকশন); ঐতিহাসিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সমাজের সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যার উদ্ভব হয় নানা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা পরিচালিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগত বিন্যাসের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে। সুতরাং সামাজিক বিধি-বিধানের সমষ্টিই হচ্ছে আইন, যা সেই সমাজে বংশ পরম্পরায় চর্চা দ্বারা নিজে থেকেই সুগঠিত হয়। সাধারণজনের অভিমত, আইন হচ্ছে আবশ্যকীয়ভাবে একটি জবরদস্তিমূলক যন্ত্র; যেটি আইন বিজ্ঞানে নানাভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু আইনের খ্যাতনামা অধ্যাপক এইচ এল এ হার্ট এই আইন সম্পর্কিত ধারণা ভুল বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রত্যেক আইনগত পদ্ধতি কিছু ‘নর্ম’ ধারণ করে- যা জবরদস্তিমূলকভাবে বলবৎ করা যায় না (দি কনসেপ্ট অব ল’)। অনুমোদিত আইনের মূল বিষয়টি হচ্ছে, মানুষের আচরণ কী হবে, তা নির্দেশ করা।

অনুমোদিত আইনই অবধারিতভাবে মানব মনে একটি সহজাত মান্যতার প্রত্যয় তৈরি করে। কিন্তু যখন অবৈধ হস্তক্ষেপ ও লঙ্ঘনের কারণে বেআইনি কার্যকলাপই আইন হিসেবে মানতে বাধ্য করা হয়, তখন তাকে শাসন বলে না, বলে দুঃশাসন। তবে আইন সম্পর্কে আদি ধারণায় দেখা যায়, হুকুমের দ্বারা চালিত সার্বভৌম আদেশই আইন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইনের প্রচলিত ও স্বীকৃত অভিমত হচ্ছে- আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র। এখন বলা হয় আইন শুধু ঐকমত্য বা সম্মতিই নয়, এটি সেই সমাজের অভ্যন্তরে সংঘাত ও ভিন্নমতেরও সংশ্লেষণ। তবে মনে রাখতে হবে, আইনকে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করলেই তা বেআইনি রূপ পরিগ্রহ করে এবং তখন সেটি ব্যাকফায়ার করে আর তখনই শুরু হয় অরাজকতার কাল।

গায়েবি মামলা, গণগ্রেফতার, রিমান্ড ও গৃহ তল্লাশি- যা এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সর্বমহলে আলোচিত বিষয়। আমাদের আজকের প্রতিপাদ্য- আইনের আলোকে গৃহ তল্লাশি। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মামলা-হামলা-গ্রেফতারের নিপীড়ন চক্রে গৃহ তল্লাশির হিড়িক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জীবন বিপন্ন ও বিধ্বস্ত করে তুলেছে। বৈধ সংস্থা কর্তৃক গৃহ তল্লাশিতে রাজনীতিবিদদের পরিবারের সদস্যদের যে ভয়াবহ হয়রানি ও জুলুমের শিকার হতে হয়, তা প্রচলিত আইনের বিধি-বিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

গৃহ তল্লাশি সম্পর্কিত আইনি বিধি-বিধান

পুলিশ কোনো নাগরিকের গৃহ তল্লাশি করতে পারে শুধু এ দু’ভাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে- আদালত হতে ইস্যুকৃত তল্লাশি পরোয়ানা বলে অথবা কোনো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে শুধু সেই মামলার আসামি গ্রেফতার বা মালামাল উদ্ধারকল্পে। (ফৌ. কা. ধারা-৯৬, ৯৮, ৯৯ক, ১০০, ৪৭ ও ১৬৫; অস্ত্র আইন-২৫; জুয়া আইন-৫)। আর ফৌ. কা. ১০৩ ধারা মোতাবেক গৃহ তল্লাশির পদ্ধতি ও নিয়ম হল- তল্লাশি শুরু করার আগেই পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় দুই বা ততোধিক সম্মানিত অধিবাসীকে সরেজমিন উপস্থিত থেকে তাতে সাক্ষী হওয়ার জন্য প্রয়োজনে লিখিতভাবে অনুরোধ করবেন। তল্লাশিকালে গৃহকর্তা অথবা তার মনোনীত কোনো প্রতিনিধিকে অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। কাঙ্ক্ষিত কোনো মালামাল পাওয়া গেলে পুলিশ কর্মকর্তা তার একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। অতঃপর সেই তালিকায় উপস্থিত সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন। এরপর সেই তালিকার একটি অনুলিপি চাহিদা মোতাবেক গৃহকর্তা বা তার প্রতিনিধিকে এবং সাক্ষীদের প্রদান করবেন।

গৃহ তল্লাশির এ ধারাটি সম্পর্কে উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যাগুলো হল- এই ধারা-১০৩ সংযোজন করাই হয়েছে এ কারণে, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা তল্লাশি পরিচালনা করেন; তারা যাতে কোনো অসাধুতার আশ্রয় নিতে না পারে [27 Cri LJ 73]; [AIR 1931 Rang. 333]। সম্মানিত অধিবাসী বলতে তাকে বোঝাবে, যিনি নিরপেক্ষ হবেন এবং যাকে তল্লাশি স্থানের মালিক বা প্রতিনিধি বিশ্বাস করতে পারেন [15 Cri LJ 441 FB]। এ ধারার বিধানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ ব্যতিরেকে কোনো গৃহ তল্লাশি করা বা কোনো সন্দেহভাজন মালামাল জব্দ করা অবৈধ বা বেআইনি কর্ম বলে গণ্য হবে [AIR 1955 ALL 138 (DB)]।

পিআরবি : ২৮০ এবং ডিএমপি (থানা) রুলস-এর বিধি : ১০৬-এ গৃহ তল্লাশি সম্পর্কে বলা হয়েছে- তল্লাশিকারী পুলিশ কর্মকর্তা গৃহকর্তার অজ্ঞাতসারে কোনো জিনিস ঘরে নেয়া বা বের করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করবেন। গৃহকর্তা বা তার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তল্লাশি চালাতে হবে। তল্লাশির সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কোথায় কোন জিনিসটি পাওয়া গেল, তা স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে। তল্লাশিকালে যদি কোনো মালামাল পাওয়া না যায়, তাহলে জব্দকৃত কোনো মালামাল নেই মর্মে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে উপরোল্লিখিত একই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্টদের তার অনুলিপি প্রদান করতে হবে।

মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কোনো জিনিস বিশেষ কোনো ব্যক্তির দখলে আছে বলে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গতভাবে যদি জানা যায়, তবেই সেই ক্ষেত্রে কেবল বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি চালানো যেতে পারে। অন্যথায় তল্লাশি পরোয়ানা ব্যতীত তল্লাশি বেআইনি। তল্লাশিকালে প্রাপ্ত মালামাল তালিকাসহ ফৌ. কা.-১৬৫ ধারানুযায়ী যথাশিগগির সম্ভব তল্লাশিকারী পুলিশ কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রেরণ করবেন। উল্লেখ্য, কোনো গৃহের দখলদার দাগি, দুশ্চরিত্র কিংবা ফেরারি আসামি শুধু এই অজুহাতেই সেই গৃহ বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি চালানো যাবে না;

তল্লাশি শুরুর আগেই উপস্থিত সাক্ষী, গৃহকর্তা/প্রতিনিধির সামনে তল্লাশিকারী প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তা, তাদের সহকারী, সংবাদদাতা (যদি থাকে) প্রমুখের নিজ নিজ দেহ পরীক্ষা করে নিতে হবে। এমন সৌজন্যতার সঙ্গে তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন গৃহবাসী, বিশেষ করে মহিলাদের তাতে যথাসম্ভব কম অসুবিধা ঘটে। সাক্ষীরা যাতে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বা পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত না হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হন, সে বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি সম্ভব হয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সদস্য বা এলাকার প্রধান ব্যক্তিকেও তল্লাশি কর্মকাণ্ড দেখার জন্য উপস্থিত রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো সোর্স বা গুপ্তচর, অভ্যস্ত মদ্যপ বা সন্দেহভাজন চরিত্রের লোককে তল্লাশি সাক্ষী হিসেবে তলব করা যাবে না।

যখন বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কোনো গৃহ তল্লাশি চালানোর প্রয়োজন হবে, তখন অস্ত্র আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অবশ্যই পরোয়ানা সংগ্রহ করতে হবে। বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কোনো পুলিশ অফিসার নিজ উদ্যোগে গৃহ তল্লাশি করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন।

তল্লাশিকারী কর্মকর্তা এমনভাবে তল্লাশি চালাবেন, যেন উপস্থিত সাক্ষীদের মনে এরূপ সন্দেহ করার কোনো অবকাশই না থাকে যে, তল্লাশিকারী পুলিশ কর্মকর্তা বা তাদের সঙ্গীরা গৃহকর্তাকে ফাঁসানোর জন্য কোনো জিনিস আগে থেকেই গোপনে ঘরে রেখে দিয়েছে। মোটামুটি এই হল গৃহ তল্লাশি সম্পর্কিত আইনের বিধানাবলী। সুতরাং সংশ্লিষ্ট কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি এই বিধানের ব্যত্যয় করেন, তবে তা আইনবহির্ভূত বা বেআইনি কাজ বলে গণ্য হবে। সেই বেআইনি কাজটির জন্য তার দু’ধরনের শাস্তি হতে পারে- কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে, শুধু গাফিলতির কারণে যদি বিধানের ব্যত্যয় হয়; তবে তাতে তার হতে পারে প্রশাসনিক শাস্তি। যেমন- পদাবনতি, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি। কিন্তু তা যদি হয় এমন কাজ- অপরাধ করার উদ্দেশ্যে পূর্ব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ইত্যাদি সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য হবে অন্য সব সাধারণ অপরাধীর মতোই। তবে অনেকের অভিমত হচ্ছে- অন্যদের চেয়ে পুলিশের শাস্তির মাত্রা বরং বেশি হওয়া উচিত। কেননা তাদের দায়িত্বই হল অপরাধ নিবারণ আর এজন্য রাষ্ট্র ও আইন তাদের দিয়েছে বিশেষ ক্ষমতা ও মর্যাদা।

সুতরাং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে অসহায় নাগরিকদের জীবনকে বিপন্ন করার দায় পুলিশের জন্য তুলনামূলকভাবে অন্য অপরাধীদের চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশের আইনে এ ধরনের নজিরও আছে এবং এমন বেআইনি কর্মের জন্য তাদের সম্ভাব্য যেসব শাস্তি হতে পারে, তার উল্লেখ আছে দণ্ডবিধি : ১৬৬, ৪২৭, ৩৯২/৩৯৫ এবং নারী নির্যাতন আইন ধারা : ১০-এ। ক্ষেত্রভেদে এসব শাস্তির পরিমাণ হতে পারে ২ থেকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কোনো নাগরিক যদি এসব অপরাধ-অনাচার হতে কোনো বৈধ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে কোনো আশ্রয় না পান, তাহলে এমন বেআইনি ও অপরাধমূলক অপতৎপরতা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে দণ্ডবিধি-১০৪ ধারা মোতাবেক আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন; যে ধারায় বলা হয়েছে- সম্পত্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত বা প্রচেষ্টারত অপরাধ যদি সাধারণ চুরি, ক্ষতি বা গৃহে অনধিকার প্রবেশ সম্পর্কিত হয়; সে ক্ষেত্রে সম্পত্তি সংক্রান্ত আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অপরাধকারীর মৃত্যু ঘটানো ব্যতিরেকে যে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা যাবে।

রিজভী আহমেদ : রাজনীতিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×