রাজধানীর বাসযোগ্যতা ফেরাতে যা করা দরকার

  জামাল উদ্দিন জামাল ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয

চারশ’ বছরের বেশি সময় ধরে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠেছে ঢাকা। এ মহানগরী আমাদের অতি আপন। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ নিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে প্রিয় মহানগরী ঢাকা।

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবারও একটি হতাশার কথা জানাল। খবরটি হল বসবাসের অযোগ্য পৃথিবীর নোংরা শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে ঢাকার প্রতি এক ধরনের হৃদয়ের টান অনুভব করি। আমাদের সবার প্রিয় এ মহানগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখা, বসবাসের যোগ্য ও নিরাপদ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা সিগারেটের টুকরো ফেলা তো দূরের কথা, থু থু ফেলতেও বিব্রত হই। সেদেশের জনগণ শহরটিকে একটি সাজানো বাগানের মতো করে সাজিয়েছেন। অথচ তারা কিন্তু আমাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয়। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে দিধাং নদী। নদীটিকে তারা এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছেন, যা উল্লেখ করার মতো। এ নদীর দু’পাশ শান বাঁধানো, টলটলে পানি আর নদীর উপর দিয়ে ওভার ব্রিজ- দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমরা কি সাজাতে পারি না শত শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বুড়িগঙ্গাকে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্ররা বলেছেন, জনবহুল এ ঢাকাকে এখনও সুন্দর করে সাজানো সম্ভব। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নাকি গিনেজ বুকে স্থান পেয়েছে।

পল্টন, মতিঝিল, শাহবাগসহ আরও অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে পরিচ্ছন্নতার জন্য আরও অনেক কিছুই করতে হবে। পল্টন, মতিঝিল, তোপখানা রোডসহ অনেক এলাকায় ফুটপাতের দোকানের জন্য সেখান দিয়ে হাঁটতে অসুবিধা হয়। শুধু তাই নয়, এ ফুটপাতের দোকানগুলোতে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন সংযুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ এটা দেখলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন কিছুই দেখতে পায় না। শুধু এ কারণে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য, তা কিন্তু নয়। যানজটে স্থবির জীবন। তবে এক-দুই বছর পর ঢাকায় যানজট থাকবে না, এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। মেট্রোরেলের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টির সময় পানিতে তলিয়ে যায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। শান্তিনগর, বাসাবো, মুগদাসহ বেশকিছু এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। হারিয়ে গেছে অথবা বেদখল হয়ে গেছে রাজধানীর খালগুলো। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, রাজধানীর আশপাশের নদীগুলো বর্ষা মৌসুমে খালের মতো দৃশ্যমান হয় আর শুষ্ক মৌসুমে হয়ে যায় ড্রেন। তুরাগ, বালু নদী ও শীতলক্ষ্যা নদীর করুণ অবস্থাও বহুল আলোচিত। বিভিন্ন নদীর যে অংশ টিকে আছে সেটাও শিল্প-কারখানার বর্জ্য ও কেমিক্যালে ভরে যায়। রাজধানীর ময়লা পরিষ্কার করার জন্য কেউ যে নেই, তা নয়; তারা কাজ অবশ্যই করে, তবে তা যথাসময়ে নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাস্টবিনের ময়লা কেউ দেখতে পায় না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার ডাস্টবিনগুলো থাকে উন্মুক্ত। সকালে যখন শিশু-কিশোররা স্কুলে যায়, মানুষ যখন অফিসে ছুটতে থাকে; তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীরা রাস্তা পরিষ্কার করে। ওই সময় ঝাড়ু দিয়ে রাস্তাঘাট ধুলায় অন্ধকার করে ফেলে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। রাজধানী ঢাকায় এমন বহু সমস্যা রয়েছে।

ফুটপাতের হোটেলগুলোতে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশেই খাবার পরিবেশন করা হয়। নগর পরিবহনের বাসের যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টিও বহুল আলোচিত। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল এবং যেখানে-সেখানে হাতুড়ে চিকিৎসের অপচিকিৎসায় জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে।

লক্ষ করা যায়, সিগন্যালে গাড়ি থামলেই ভিক্ষুক এসে হাজির হয়। বিশ্বের মানুষ আমাদের যতটা গরিব মনে করে, আসলে আমরা ততটা গরিব নই। উল্লিখিত ভিক্ষুকদের কারণে বিদেশিদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশে প্রচুর অর্থের মালিকও অভ্যাসের কারণে ভিক্ষা করছে। বিদেশিরা তো আর সেসব জানে না। এ অবস্থায় রাজধানীকে ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া দরকার। এ উদ্যোগ সিটি কর্পোরেশনকেই নিতে হবে।

প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যেমন- ফার্মগেট, গুলিস্তান ও বিভিন্ন শপিং সেন্টারের সামনে গাছের বাকল, জোঁকের তেল, মলম ও দাঁতের মাজনসহ হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসছে তথাকথিত কবিরাজরা। এ কবিরাজরা জাদুমন্ত্রের মতো মানুষকে মুগ্ধ করে এসব অপচিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। সবাই এসব দেখছেন কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার দরকার মনে করেন না। এ কবিরাজের ওষুধে রোগীর অবস্থার উন্নতি তো হয়ই না, বরং আরও অসুস্থ হচ্ছে। এভাবে কত মানুষ যে প্রতারিত হচ্ছে তার কোনো হিসাব পাওয়া মুশকিল।

রাজধানীর অলিগলিতে ফুটপাতে রয়েছে অনেক খাবারের দোকান। সেসব দোকানে ভাত, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে সবই পাওয়া যায়। এসব দোকানে খাবারের দাম তুলনামূলক কম, ফলে এখানে ক্রেতা সংখ্যা বেশি। মানুষ এসব খাবার খাচ্ছেন নির্দ্বিধায়। ভাত, মাছ ছাড়াও বিক্রি হয় আখের রস, লেবুর শরবত, চিংড়ির মাথা, তরমুজ, পিঁয়াজু, সিংগারা, সমুচা, আনারস, পেঁপে, ছোলা, ঝালমুড়ি, জিলাপি। খোলা আকাশের নিচে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এসব খাবার। ক্রেতারা জানেই না, এসব খাবার সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের। যারা এসব বিক্রি করছে তারা বেশিরভাগই অশিক্ষিত ও দরিদ্র। তাদের জীবিকা নির্বাহের কোনো পথ না থাকায় তারা এ কাজে নেমেছেন। তাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দিলে তারা স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করতে পারবে। সেই উদ্যোগ নেয়া উচিত। উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সমাধান একদিনে করা যাবে না। ষাট বা সত্তরের দশকের ঢাকা আর আজকের ঢাকা এক নয়। হঠাৎ করেই এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। মানুষকে সচেতন করতে হবে। এ বিষয়েও সিটি কর্পোরেশনকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীর অন্যতম সমস্যা হল অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। তবে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে। বেদখল হয়ে যাওয়া খাল, পার্ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করলে এবং অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে পারলে ঢাকার চেহারা অনেকাংশেই পাল্টে যাবে। বিশেষ করে ঢাকার বুড়িগঙ্গার নদী সংস্কার করে দু’পাশ দিয়ে গাছ লাগিয়ে দৃষ্টিনন্দন করা সম্ভব। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করা যেতে পারে।

জামাল উদ্দিন জামাল : সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×